রিপন কলেজের শৌচাগার নিজের হাতে সাফ করলেন গান্ধিজি

আজ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির ১৫১তম জন্মবার্ষিকী

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি কলকাতায় এসেছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতে। সেটা ১৯০১ সাল। ততদিনে গান্ধিজি দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ আন্দোলনের নায়ক। যদিও ভারতের মূল ভূখণ্ডের রাজনীতিতে তখনও তিনি সক্রিয়ভাবে যোগদান করেননি। সেবারই প্রথম কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি অংশ নিলেন। তখন কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন দিনশা এদুলজি।

গান্ধিজি-সহ আরো কয়েকজন প্রতিনিধির থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল রিপন কলেজে। সেখানে বাল গঙ্গাধর তিলকও ছিলেন। রিপন কলেজে কংগ্রেসের ক্যাম্পে অস্পৃশ্যতা মানা হয়েছিল খুব কঠোরভাবে, যেটা গান্ধিজির একেবারেই পছন্দ হয়নি। কংগ্রেস অধিবেশনে প্রতিনিধিদের যদি এরকম অস্পৃশ্যতার শুচিবাই থাকে, তাহলে সেই প্রতিনিধিদের যাঁরা পাঠিয়েছেন তাঁদের শুচিবাই কতদূর – এইসব ভেবে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতেন তিনি। 

অন্যদিকে, ক্যাম্পের অবস্থা ছিল চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর। চারদিকে জল থৈথৈ করছে। পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই। যে ক’টি আছে, তাতে প্রবল দুর্গন্ধ। গান্ধিজি তা স্বেচ্ছাসেবকদের বলতে তারা জানাল, শৌচাগার পরিষ্কার করা তাদের কাজ নয়, সেটা মেথরের কাজ। তখন উপায়ান্তর না দেখে গান্ধিজি তাদের কাছে একটা ঝাঁটা চাইলেন। এত বেশি নোংরা ছিল যে, পুরোটা সাফ করা একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের যতটুকু প্রয়োজন, ততটা সাফ করে নিলেন গান্ধিজি। এই নিয়ে বাকি প্রতিনিধিদের কোনো হেলদোল দেখা যায়নি। কেউ কেউ রাত্রিবেলা বারান্দাতেই শৌচকর্ম করে যেত। সেগুলো পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিত না কোনো স্বেচ্ছাসেবক। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে গান্ধিজি একাই সেগুলো সাফ করতেন।

অধিবেশন শুরু হতে তখনো কয়েকদিন বাকি। গান্ধিজি ঠিক করেছিলেন, কংগ্রেসের কলকাতা অফিসে যাবেন, কোনো কাজ যদি সেখানে পাওয়া যায়, কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হবে তাতে। যেদিন তিনি কলকাতা এলেন, সেদিনই স্নান খাওয়া সেরে হাজির হলেন কংগ্রেস অফিসে। তখন সম্পাদক ছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ বসু এবং জানকীনাথ ঘোষাল। গান্ধিজি ভূপেন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে কংগ্রেসের অফিসে কাজ করতে চাইলেন। ভূপেন্দ্রনাথ তাঁকে যেতে বললেন জানকীনাথ ঘোষালের কাছে। 

জানকীনাথ ছিলেন কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম যুগের একজন সক্রিয় সদস্য। নদিয়া জেলার এক জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। বিয়ে করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীকে।

কংগ্রেসের অফিসে জানকীনাথ গান্ধিজিকে বললেন, তাঁর কাছে শুধু কেরানির কাজ রয়েছে। গান্ধিজি সেটাই করতে রাজি হলেন। বললেন, আমার সাধ্যমতো যে কোনো কাজ দেবেন, আমি সেটাই করব। সেইজন্যই তো আপনার কাছে এসেছি। এই কথায় খুশি হলেন জানকীনাথ। পাশে যে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদেরকে বললেন, ইনি কী বললেন, তোমরা শুনলে?

জানকীনাথের কাছে প্রচুর চিঠি আসত। সেগুলোর মধ্যে যে ক’টার উত্তর দেওয়া দরকার, সেগুলোকে আলাদা করে নিয়ে জবাব লিখতে হবে, সেই কাজটি গান্ধিজিকে করতে দেওয়া হল। গান্ধিজি খুশি মনে তা করতে লাগলেন। প্রথম একগোছা চিঠির উত্তর খুব তাড়াতাড়াই লিখে দিলেন। গান্ধিজির প্রতি জানকীনাথের মুগ্ধতা বেড়ে গেল। এর আগে তিনি গান্ধিজির পরিচয় জানতেন না। কথাবার্তায় জানতে পারলেন, ইনিই দক্ষিণ আফ্রিকায় সাড়া ফেলে দেওয়া ব্যারিস্টার। তাঁকে কেরানির কাজ দেওয়া জন্য খানিকটা লজ্জিত হলেন জানকীনাথ। তখন গান্ধিজি তাঁকে নিশ্চিন্ত করে বললেন, আমি কে? আর আপনি কে? আপনি কংগ্রেসের পুরোনো সেবক, আমার গুরুজনের সমান। আমি তো অনভিজ্ঞ যুবক মাত্র। কাজ দিয়ে তো আপনি আমার উপকারই করেছেন। আমি কংগ্রেসের কাজ করতে চাই। আপনি তো আমাকে কাজ শেখার অমূল্য সুযোগ করে দিয়েছেন।

এইভাবে গান্ধিজি জানকীনাথের অত্যন্ত স্নেহের পাত্র হয়ে উঠলেন। দুপুরে খাওয়ার সময় গান্ধিজিকে সঙ্গে নিতেন জানকীনাথ। গান্ধিজি লক্ষ করতেন, জানকীনাথ নিজের জামায় নিজে বোতাম লাগান না, একজন বেয়ারা লাগিয়ে দেয়। গান্ধিজি সেই বোতাম লাগানোর কাজটি নিয়ে নিলেন। গুরুজনদের সেবা করে তৃপ্তি পেতেন গান্ধিজি। সেটা বুঝতে পেরে জানকীনাথ তাঁর ব্যক্তিগত ছোটোখাটো কাজ গান্ধিজিকে করতে দিতেন। গান্ধিজিও খুশি মনে করতেন সেগুলো। একদিন জানকীনাথ মজা করে বললেন, দেখো না, কংগ্রেস সেক্রেটারির বোতাম লাগানোরও সময় নেই। সব সময়েই তাঁকে কাজ করতে হয়। এই কথা শুনে গান্ধিজি হেসে ফেললেন।

অল্প দিনেই গান্ধিজি জাতীয় কংগ্রেস পরিচালনার ব্যাপারটি বুঝতে পারলেন। অনেক নেতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হল। কংগ্রেসের বেশ কিছু কাজই তাঁর পছন্দ হত না, তবে শ্রদ্ধার সঙ্গেই তিনি মনে মনে কাজগুলোর মূল্যায়ন করতেন।

ঋণ – The Story of My Experiments with Truth, written by Mohandas Karamchand Gandhi
 

Developed by DXDasia