
‘NEP 2020’ কেবল নতুন নয়, অভিনবও বটে
আজও বুঝে উঠতে পারিনি ‘NEP 2020’ –র N শব্দটির অর্থ। কেউ বলছেন N= New বা নয়া। সত্যি! তা, অনেক খুঁজেও যে নতুন কিছু প্রায় পেলাম না তাতে? নয়ানীতিতে যা বলা হয়েছে তার প্রায় সবই আছে পুরোনো কমিটি/কমিশনের রিপোর্টে। যেমন ‘ত্রিভাষা সূত্র’, কারিগরি বিদ্যার জন্য একাধিক নিষ্ক্রমণ পথ ইত্যাদি। কিছু বিকৃতিও আছে। যেমন, এত নিষ্ক্রমণ পথ কেন? সেকি স্কুলছুট হিসেবে জল মেশাতে? বিকৃতি আছে গুচ্ছ(Cluster) নীতিতেই। আগেও এমন কথা বলা হয়েছে বটে, কিন্তু তাতে বিদ্যায়তনগুলো জুড়তে বলা হয়েছিল প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে। আর এবার সে নীতি যেন বিদ্যায়তনগুলোর সংখ্যা কমাতে। ভাবুন, সুন্দরবনের শিশুরা বিদ্যার্জনের জন্য এক দ্বীপ ছেড়ে চলেছে অন্য দ্বীপে। এরপরও ‘সকলের জন্য শিক্ষা’ কর্মসূচি বেঁচে থাকবে তো?
একেবারে কিছু পাইনি তা বলব না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে অতীতের কোনও কমিটি বা কমিশনের রিপোর্টে কোনও কথা বলা হয়নি। কেমন করে বলবেন? অতীতে যারা নানা রিপোর্ট বানিয়েছেন তাঁরা সকলেই ছিলেন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। কেউ তো জ্যোতিষী ছিলেন না। এবার যারা শিক্ষানীতি নির্মাণে যুক্ত তাঁরা অনেকে অবশ্য শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত নন, এমনকি যে কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে এই শিক্ষানীতি গড়া সেই কমিটির প্রধান কস্তুরিরঙ্গনও শিক্ষাবিদ নন, একজন বিশিষ্ট মহাকাশবিজ্ঞানী। প্রকৃত অর্থে এই শিক্ষানীতি কেবল নতুন নয়, এ অভিনব। এই যে করোনার তাণ্ডব চলেছে তার কথা বা কে জানত? কে বা ভেবেছিল এমন শিশুদমন ‘অনলাইন’ লেখাপড়ার কথা, কর্তারাও বুঝি জানতেন না, জানলে কিছুটা হলেও বদলাত তাঁদের সুপারিশ। তাঁরা হয়তো বলতেন, এতো শিক্ষকের প্রয়োজনই নেই, সব্বাইকে অনলাইনে শিখিয়ে দেব যা শেখানোর। শিশু শিক্ষার্থীদের কান্নায় কান দেওয়া বা শিক্ষক-অসন্তোষ নিয়ে ভাবার কোনও প্রয়োজনই নেই। কোনও প্রয়োজন নেই অভিভাবকদের দৈন্যদশা বিবেচনা করার বা তাদের সকলের স্মার্টফোন আছে কি নেই তা দেখার। দেখো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফসল ইন্টারনেট সর্বত্র পৌঁছোছে কিনা। বাজার তুষ্ট কিনা? দেখো সরস্বতী বিদ্যামন্দিরগুলো প্রভাব ছড়াতে পারল কিনা।
আরও পড়ুন: সমকামিতা ও প্রকৃতি : কতটা বিজ্ঞানমনস্ক আপনি?
তা বাজারপ্রেমী শিক্ষানীতির এই রূপকাররা এগুলি দেখবেন বইকি, নতুন শিক্ষক না নিয়েই তারা দেখিয়ে দেবেন শিক্ষানীতি রূপায়নের কৌশল।
আরও একটি নতুন দিক পেয়েছি। এই শিক্ষানীতি শিক্ষা কাঠামোর বদল চায়। এই চাওয়াটা নতুন নয়, শিক্ষানীতির একটা জরুরি দিক হল শিক্ষা কাঠামো। নীতি রূপায়নে কাঠামোর গুরুত্ব অনেক। কস্তুরিরঙ্গন কমিটি দেশের ঐতিহ্য ইত্যাদি বিবেচনা করে শিক্ষার আয়োজনে পরিবর্তন চেয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থার বদলে তাঁরা চান ৫+৩+৪+৪ ব্যবস্থা। নিশ্চয় তা নতুন, তবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যের সম্পর্ক কী, তা বোঝা গেল না। প্রাচীন ভারতে এমন ব্যবস্থা ছিল নাকি?
তবে কী N মানে National, জাতীয়? নিশ্চয় তাই। কিন্তু তাও কী মানা যায় নাকি? এ কী জাতীয় পাখি নাকি যে সর্বত্র দৃশ্যমান না হলেও চলবে? এই শিক্ষনীতির যে অংশ ভাষানীতি তা যে দক্ষিণের রাজ্যগুলি অতীতেও মানেনি ভবিষ্যতেও মানবে না তা স্পষ্ট! তবে কি তাদের ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করা হবে? নাকি, ভোটের লোভে তাদের ছাড় দেওয়া হবে? যদি তা জাতীয় নীতিই হবে তো তাতে নেই কেন জাতীয় বিজ্ঞাননীতির কোনও প্রতিফলন? এই দেশের সংসদ একদা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল (Science policy resolution, 1958) যে “The dominating feature of the contemporary world is the intense cultivation of Science on a large scale, and its application to meet a country’s requirements…, what is of still deeper significance, it has provided new tools of thought and has extended man’s mental horizon”। সে প্রস্তাবের কথা কার বা মনে আছে! অন্তত নীতিপ্রণেতাদের মনে নেই, তবু একে জাতীয় নীতি বলব? কে তাদের বোঝাবে যে কেবল অঙ্ক শিখলেই বিজ্ঞান শেখা যায় না বা, কারিগরিবিদ্যা বা প্রযুক্তিই বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নয়?
আর শিক্ষার মান? জাতীয় স্তরে শিক্ষার মান নিম্নগামী। তা রোধ করার কোন দিশা নেই এই শিক্ষানীতিতে, আছে শিশু ও মায়েদের পুষ্টিদায়ী ICDS ঘেঁটে দেবার চেষ্টা।
আরও পড়ুন: ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি গোপীকান্ত গোঁসাই
অঙ্গনবাড়ি কর্মীরা শিশুদের বিদ্যালয়-শিক্ষার যোগ্য করে তুলবেন, কিন্তু সেই কর্মীদের শিক্ষাদানের যোগ্য করে তোলার যে উদ্যোগ নেই, তাঁরা পারবেন?
এমন বহু প্রশ্নের জবাব নেই তবু স্ংসদ এড়িয়ে সরকার এই শিক্ষানীতি জাতির ঘাড়ে চাপাতে ব্যস্ত – কার স্বার্থে? কোনও সাংবাদিক ভেকধারীর প্রশ্ন নয়, এই প্রশ্ন জাতির। এমন সব প্রশ্নের জবাব না মেলা পর্যন্ত কী করে এমন জাতীয় নীতি মেনে নিতে পারে একটি জাতি?
তবে কি – ‘এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই’ হবে জাতীয় নীতি? সেদিকেই যেন এগোচ্ছে কর্তারা, শিক্ষানীতি তারই একটা অংশমাত্র !

