কোনো একটি নির্দিষ্ট জিনের ক্রিয়ার ফলে কেউ সমকামী হন না – পর্ব ১
কয়েকমাস আগে ‘বঙ্গদর্শন’-এ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটে চলা একটি সমস্যা নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে সমকামিতা ও রূপান্তরকামিতার কথা এসেছিল। সেই লেখার কমেন্টে একজন পাঠক জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালের একটি রিপোর্টের লিংক শেয়ার করেন, যার শিরোনাম : No ‘gay gene’। তাঁর মন্তব্য (‘ঘৃণাবচন অবশ্যই নিন্দার্হ, কিন্তু বিজ্ঞান তো মানি’) এবং এই লিংক শেয়ার করার মাধ্যমে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে সমকামিতার সঙ্গে জিনের কোনো সম্পর্ক নেই, অর্থাৎ এটি জৈবিক নয়। তিনি এটিকে সাংস্কৃতিক বলতে চেয়েছেন কিনা স্পষ্ট নয়। হয়তো সময়াভাবে শিরোনাম বাদে পুরো রিপোর্টটি পড়েননি। সেখানে লেখা ছিল, গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে (আপাতত) যে সমকামিতার জন্য কোনো জিন নির্দিষ্টভাবে দায়ী নয়, অর্থাৎ কোনো একটি নির্দিষ্ট জিনের ক্রিয়ার ফলে কেউ সমকামী হন না।
কোয়ান্টিটেটিভ জেনেটিক বিশ্লেষণের দুটি ধারা রয়েছে। এক দলের প্রতিপাদ্য হচ্ছে একটিমাত্র জিন-ই মানুষে বিদ্যমান একটি চারিত্রিকতার জন্য প্রয়োজনীয় তো বটেই, যথেষ্টও। গবেষণার এই ধারাকে বলা হয় One Gene One Disorder। আর একদলের দৃষ্টিকোণ এর বিপরীত; তারা মনে করেন, প্রতিটি চারিত্রিকতার পিছনে একটি মাত্র জিন আলাদা করে না’ও থাকতে পারে, বা একটি জিনের প্রভাব একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য নির্দিষ্ট এবং যথেষ্ট না’ও হতে পারে। এই ধারাকে বলা হয়, কোয়ান্টিটেটিভ ট্রেইট লোকাই (QTL)। এখানে ওঁরা চারিত্রিকতার বদলে ‘disorder’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন রোগ কেন্দ্রিক এই আলোচনার সর্বজনীনতা বোঝাতে। এই কোয়ান্টিটেটিভ জেনেটিক বিশ্লেষণের ধারায় বিশেষ সহায়তা করেছে বিগত কিছু দশকে আবিষ্কৃত জিন ও মানুষের চরিত্রাবলীর নিরিখে জিনের কৃতিত্ব বিষয়ক কিছু জ্ঞান। যেমন, জিনের প্রভাব ব্যক্তির বিভিন্ন বয়সসীমায় বিভিন্ন হতে পারে। বা, কিছু চারিত্রিক গুণাবলী তাদের জিনগত স্তরে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে। ফলে, একের ওপর অন্যের প্রভাবও বিদ্যমান। যেমন মানুষের পাণ্ডিত্য তার অন্যান্য জ্ঞানবিষয়ক সক্ষমতার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত ইত্যাদি।
এইক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মানুষের চারিত্রিকতার কতটা জিনগত আর কতটাই বা পরিবেশগত? অর্থাৎ যে পরিবেশে একজন বড়ো হয়ে উঠছে তার প্রভাব তার চারিত্রিকতায় কতটা। সমকামিতাও পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের বাহ্যিক চারিত্রিকতা হিসাবেই প্রতিভাত হয়। অতএব, প্রশ্ন জাগে, সমকামিতা জিনগত নাকি পরিবেশগত (বা সাংস্কৃতিক)? এই লেখায় সেটাই একটু ঘুরে দেখা যাক।
জৈবিক অভিযোজনীয় তত্ত্বের আধারে সমকামিতা একটি সমস্যা। কারণ, ধ্রুপদী অভিযোজনীয় তত্ত্ব বলে, কোনো প্রজাতি বংশবৃদ্ধি করে শুধুমাত্র সন্তানোৎপাদনের জন্য নয়, বরং অভিযোজনে নিজেদের স্থান সুনিশ্চিত করার জন্য। কোনো প্রজাতি তা করতে সক্ষম হলে ধরে নেওয়া হয়, তারা আপাতত সেই অভিযোজনীয় স্তরে যোগ্যতম। কিন্তু, সমকামীরা তো সেই অর্থে সন্তান উৎপাদন করেন না (বিষমকামীদের তুলনায় একের পাঁচ ভাগ), তাও তারা প্রকৃতিতে টিকে গেলেন কী করে? এই প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। বলে নেওয়া প্রয়োজন, ধ্রুপদী অভিযোজনীয় তত্ত্ব এতটাই সুনিপুণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, গবেষকরা চেষ্টা করেন এটাকে না ঘাঁটতে। বরং তাদের চেষ্টা থাকে কীভাবে এই তত্ত্বের মধ্যেই সমকামিতাকে স্থান দেওয়া যায়। বিভিন্নভাবে সেই পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে। তাদের কিছু কিছু নিচে আলোচনা করা হল। আমরা মূলত পুরুষ সমকামীদের সমকামিতা নিয়েই আলোচনা করব।
সমকামীদের পারিবারিক যৌনতার ওপর গবেষণা করে গবেষকরা কতগুলি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্তগুলি সঠিক বা চূড়ান্ত নয়। এই বিষয়টি এখনও অজানা ও গবেষণাধীন। তাই বিভিন্ন হাইপোথিসিসের মাধ্যমে তারা এই বিষয়ক একটা ধারণা লাভের চেষ্টা করছেন। সিদ্ধান্তগুলো কিছুটা এইরকমঃ
(ক) সমকামী পুরুষদেরই সমকামী ভাই থাকার প্রবণতা বেশি।
(খ) একজন দম্পতির যদি বহু পুত্র সন্তান হয়, তবে পরেরদিকের সন্তানদের সমকামী হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় (প্রতি আগের পুত্র সন্তান পিছু পরবর্তী পুত্র সন্তানের সমকামী হওয়ার প্রবণতা ৩৩% বৃদ্ধি পায়)।
(গ) ব্যক্তির সমকামিতা তার পূর্বজ দাদাদের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে কিন্তু দিদিদের সংখ্যার ওপর নয়, কিংবা তাদের পরিবারে পালিত দাদাদের (দত্তক কিংবা সৎ) সংখ্যার ওপরও তা নির্ভর করে না।
(ঘ) মায়ের পরিবারের দিক থেকেই সমকামিতার জিনগত প্রভাব আসার সম্ভাবনা বেশি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমকামিতার প্রজননগত আপাত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, সমকামিতার অভিযোজনীয় গুরুত্ব আছে বলেই সে পূর্ববর্তী অভিযোজনীয় স্তরগুলি থেকে পরবর্তী স্তরে উদ্বর্তিত হয়েছে। কিন্তু সেই গুরুত্বটা কী? উপরিক্ত সিদ্ধান্তগুলি থেকে তারা একটি গুরুত্বর কথা আন্দাজ করছেন। ওপরের সিদ্ধান্তগুলি আদতে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত খানিকটা এভাবেঃ সমকামী পুরুষেরা সমকামী হওয়ার মাধ্যমেই তার পূর্বজ বিষমকামী দাদাদের সঙ্গী পছন্দের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে না। তারাও যদি বিষমকামী হত তাহলে সঙ্গী নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় তারাও অংশীদার হত, ফলে প্রতিযোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ার ফলে, ব্যক্তি হিসাবে তাদের প্রত্যেকের শ্রেষ্ঠ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনাও কমে যেত। প্রশ্ন জাগে এটা কী করে সম্ভব হয়? আগে কতজন দাদা আছে তা বর্তমান সন্তান বুঝবে কী করে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, পুরুষভ্রুণ মাতৃজঠরের পক্ষে ক্ষতিকারক, ফলে মায়ের জঠরকে ও মা’কে রক্ষা করতে পুরুষভ্রুণ সাপেক্ষে মায়ের গর্ভে একধরণের রাসায়নিক তৈরি হয়, যাকে অ্যান্টিজেন বলে। এই অ্যান্টিজেন তৈরি হওয়ার মাধ্যমেই মাতৃজঠর হয়তো কোনোভাবে মনে রাখে যে তার গর্ভে আগে ক’বার পুত্রসন্তান এসেছে! সেই অনুযায়ী বর্তমান ভ্রুণের জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া সংগঠিত হয়। এই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়াই আগের সিদ্ধান্তে বর্ণিত সিদ্ধান্ত নিতে, অর্থাৎ বর্তমান পুরুষ ভ্রুণ বিষমকামী হবে নাকি সমকামী/উভকামী হবে, তা নির্ধারণে সাহায্য করে। মাতৃজঠরে স্ত্রী ভ্রুণের ফলে কোনো অ্যান্টিজেন তৈরি হয় না, ফলে মায়ের গর্ভে আগের স্ত্রী ভ্রুণের উপস্থিতির ওপর বর্তমান পুরুষ ভ্রুণের সমকামিতা নির্ভর করে না, এবং মাতৃজঠর ব্যতীত বাহ্যিক কিছুর ওপরও তা নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ, ব্যক্তির সমকামিতা তার সৎ দাদাদের সংখ্যার ওপরও নির্ভর করে না।
সিদ্ধান্ত (ঘ) একটু জটিল। জটিল বৈজ্ঞানিকভাবেও, সামাজিকভাবেও। সামাজিকভাবে জটিল কারণ এর থেকে সহজেই প্রতিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায় মায়েরাই কি তবে তার ছেলেদের ‘গে’ হওয়ার জয় দায়ী? উওর ‘না’। এর আগেও আমরা দেখেছি কন্যা সন্তান হওয়ার জন্যেও মায়েদের দোষারোপ করা হত। মানুষ জানত না (এখনও অনেকেই জানে না) সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা নির্ভর করে বাবার সেক্স ক্রোমোজোমের ওপর, মায়ের নয়। এখানেও তাই একই ধরনের ভুল হওয়ার অবকাশ রয়েছে।
এবার এর বৈজ্ঞানিক দিকটা দেখা যাক। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমকামী ছেলেদের মায়েদের গর্ভ বেশি উৎপাদনশীল। কারণ সমকামিতা নির্ভর করে তার মা আগে কতগুলি পুত্র সন্তান ধারণ করেছে তার ওপর। একটি গবেষণায় দেখে গেছে যাদের মায়ের গর্ভে ৪ বা তার বেশি পুত্র সন্তান হয়েছে, ৭১% ক্ষেত্রে তার পরের পুত্র সন্তান সমকামী বা উভকামী হয়েছেন। সমকামী পুরুষদের মায়েরাই একা নয়, তার মায়ের পরিবারের দিকের প্রতি মেয়েই উর্বর গর্ভের ধাত্রী। সেহেতু, অনেকের মতে, মায়ের উর্বরতা বাড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমকামিতার অভিযোজনীয় গুরুত্ব। কিন্তু এরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন, যে মায়ের প্রথম সন্তানই সমকামী সে উর্বর গর্ভের অধিকারী হলেও তা সিন্ধান্ত (ক) এবং (খ)-কে প্রতিপাদ্য করে না। বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই বিষয়ে ধন্ধ আছে যে, মায়ের দিকের পরিবারের থেকেই সমকামিতার জিনগত ভিত্তি আসে কেন। তারা এখনও এর উপযুক্ত বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না।
সমকামী-যমজ ভাইদের মধ্যে পরীক্ষা করেও দেখা গেছে যে যারা মোনোজাইগোটিক অর্থাৎ যারা ইডেন্টিকাল টুইন্স্ তাদের একজন সমকামী হলে আরেকজনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমকামী বা উভকামী হবে (৫৬% ক্ষেত্রে)। অন্যদিকে ডাইজাইগোটিক যারা অর্থাৎ নন-ইডেন্টিকাল টুইন্স, তাদের মধ্যে সেই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না (২২% ক্ষেত্রে তাদের একজন সমকামী হলে আরেকজনও সমকামী/উভকামী)। এই জাতীয় গবেষণার DNA-লিংকেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তারা সমকামী ব্যক্তিদের এক্স-ক্রোমোজোমের ওপর Xq28 নামে একটি স্থান নির্দিষ্ট করেছে, যাকে সমকামিতার বাহক হিসাবে ভাবা হচ্ছে। কিন্তু, এই তত্ত্বও সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেকক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে মোনোজাইগোটিক টুইন্সের একজন সমকামী, আরেকজন নয়। এখান থেকে অনেকেই এই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, তাহলে সমকামিতা পরিবেশগত অর্থাৎ যে পরিবেশে তারা বড়ো হয়ে উঠেছেন, তাদের ওপর তার প্রভাবের ফলেই তাদের ভিন্ন যৌনাভিমুখিতা নির্দেশিত হয়েছে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়ঃ যদি দু’জন ভাই ইডেন্টিকাল টুইন্স হয়, আর তারা একই পরিবেশে বেড়ে ওঠে, আর সমকামিতা যদি পরিবেশগতই হয়, তাহলে একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা দু’জন ইডেন্টিকাল টুইন্স-র দুরকম যৌন অভিমুখ হল কেন?
(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল শনিবার)
বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ কৌস্তভ চক্রবর্তী
বিঃ দ্রঃ সহজ এবং বোধগম্য করে লেখার জন্য অনেকাংশে গবেষকদের বিশ্লেষণকে সরলীকরণ করা হয়েছে। পাঠকরা এই বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে এই ভেবে গ্রন্থপঞ্জীটি দেওয়া হলঃ
https://drive.google.com/file/d/1iCPnf-rUW_fWqnDxC79YKuEgFm6WCAOD/view?usp=drivesdk
