নামে ‘দোল’ থাকলেও কৃষ্ণনগরের ‘বারোদোল’-এর ইতিহাসটা খানিক অন্যরকম

উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২০৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলা

কৃষ্ণনগর মানেই হল রাধাকৃষ্ণের চারণভূমি‌। তাই এখানের অলিগলিতে শোনা যায় হরি নামের ধ্বনি। সময়ের বাঁকবদলের সঙ্গে আজও এখানে জমে আছে ইতিহাসের গন্ধ। সেই ইতিহাস আমাদের একঝটকাতে নিয়ে গিয়ে ফেলে শৈশবের কাছে, আবার কখনও ঐতিহ্যের দোড়গোরাতে। জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্ম লগ্ন থেকেই ইতিহাস আর ঐতিহ্যের বসতভূমি হয়ে রয়েছে কৃষ্ণনগর (Krishnanagar)। বাংলায় বিক্রমাদিত্যের হাত ধরে শুরু এই পুজো, এবং তার ইতিহাসের গল্প কম বেশি সকলেই জানি। জানি কৃষ্ণচন্দ্রের (Krishna Chandra) সমৃদ্ধময় রাজসভার কাহিনি, আদরের গোপাল ভাঁড়কেও অনেকেই জানি। এই জায়গাটিকে বাংলার অন্যতম পূণ্যভূমিতে রূপান্তরিত করেছেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। তাঁর হাত ধরে যে কত মেলা, মন্দিরের পত্তন ঘটেছে কৃষ্ণনগরে, হিসেব করা দায়। নানা জানা – অজানা ইতিহাসের সাক্ষী এ শহর। আজ তেমনই ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এক মেলার কথা বলতে চলেছি। বলবো দোল উৎসবের কথা, তবে যেমন তেমন দোল নয় – বারোদোলের (Baro Dol) কথা! যার ইতিহাস বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের অংশই বলা যায়। তবে নামে দোলের উল্লেখ থাকলেও পরিচিত রঙের উৎসবের সঙ্গে এর মিল নেই, মিল নেই ফাল্গুন মাসের আবহের সঙ্গেও।

রাধামাধবের বিগ্রহ দর্শনের জন্য রাজা গিরীশচন্দ্রের রাজমহিষী বারো জায়গা থেকে বিগ্রহ এনে এই মেলার আয়োজন করেন।

না আছে সেই রাজা, আর না আছে তাঁর রাজ্যপাট!  তবে ইতিহাসের রহস্যময় গন্ধ আজও লেগে রয়েছে কৃষ্ণনগর শহরের আনাচে কানাচে। জৌলুস অনেকটা কমে গেলেও ঘাটতি পড়েনি আবেগ, উচ্ছ্বাসে। আজও দূরদূরান্ত থেকে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ ভিড় করে আসেন প্রায় ২০৩ বছরের পুরোনো এই মেলাতে। দোলপূর্ণিমার পরের দ্বিতীয় একাদশীতে মেলা বসে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মাঠে। কথিত আছে আগেকার সময়ে বাড়ির মেয়েরা দোলের সময় বাইরে বের হতেন না। তাই তাঁদেরকে রাধামাধবের বিগ্রহ দর্শনের জন্য রাজা গিরীশচন্দ্রের রাজমহিষী বারো জায়গা থেকে বিগ্রহ এনে মেলার আয়োজন করেন। তখন থেকেই একই আড়ম্বরে চলছে সেই মেলা।

চৈত্রমাসের একেবারে শেষের দিকে, যখন বাংলার মানুষ দিন গুনছে নতুন বছরের, ঠিক তখনই বসে মেলা। শুক্লা একাদশীতে বিষ্ণুমহলের ১১ টা কক্ষে ১২ টা রাধাকৃষ্ণ ও গোপালের বিগ্রহ পূর্ব দিকে মুখ করে দোলায় বসিয়ে তিনদিন পুজো করলে বিশেষ ফল পাওয়া যায়। তিনদিনের পুজোয় প্রথমদিন রাজবেশ, দ্বিতীয় দিন ফুলবেশ এবং তৃতীয় দিন রাখালবেশে সাজিয়ে পুজোর প্রচলন করা হয়। পুজোকে ঘিরে কিছু রোজগারের আশায় রাজবাড়ির মাঠে আয়োজিত হয় মেলা। বারোটি বিগ্রহ দোলায় বসিয়ে পুজো করার রীতিকে ঘিরেই এই মেলার নাম ‘বারোদোল’ ।

বহু টানাপোড়েনের পর এই বছর ২৮শে চৈত্র, ইংরেজির ১২ই এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে বারোদোল মেলা। প্রথম দিন রাজবেশ, ১৩ তারিখ ছিল ফুলবেশ এবং ১৪ তারিখ রাখালবেশে সাজানো হয়েছিল বিগ্রহদের।

কৃষ্ণনগরের প্রবীণ বাসিন্দা শিবানী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে আসে এই উৎসবের ইতিহাসের খোঁজ।  তিনি জানান,  “বারোদোলে বর্তমানে ১৩টি বিগ্রহ বসানো হয়। তবে আগে ১২টি বিগ্রহই থাকত। বহুবছর আগে তেহট্টের কৃষ্ণরায়ের বিগ্রহের ক্ষতি হওয়ার কারণে সেটি আর আনা হয় না রাজবাড়িতে। কয়েকবছর আগে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকেও দেওয়া বন্ধ করে দেন অগ্রদ্বীপ মন্দির কর্তৃপক্ষ। তারপর থেকে তাঁর ছবি রেখেই পুজো করা হয়।এখন বাকি সব বিগ্রহের বেশিরভাগটাই থাকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ঠাকুরঘরে।”

১ 

২ 

জানা যায়, বর্তমানে বারোদোলে আসা বিগ্রহগুলির নাম হল: সর্বশ্রী শ্রী বলরাম, নাড়ুগোপাল, নদের গোপাল, গড়ের গোপাল, গোপীনাথ, বড়ো নারায়ণচন্দ্র, ছোট নারায়ণচন্দ্র, গোষ্ঠবিহার, মদনগোপাল, গোবিন্দদেব ও গোপীমোহন, কৃষ্ণচন্দ্র ও রাধাকান্ত। আজও অনেকে আবীর তুলে রাখেন বারোদোলের বিগ্রহদের পায়ে দেওয়ার জন্য। আবার অনেকে নিজের বাড়ির ফলও দান করে এখানে ।

৩ 

৪ 

৫

বহু বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী বারোদোলের মেলা। যার আভিজাত্যের ঝলক এখনও দেখা দেয় মাটির পুতুলের শহরে। গত দুই বছর করোনার কারণে হয়নি মেলা, ফাঁকা ছিল রাজার মাঠ, নাটমন্দির! বহু টানাপোড়েনের পর এই বছর ২৮শে চৈত্র, ইংরেজির ১২ই এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে বারোদোল মেলা। পাক্কা একমাস চলবে মেলা। প্রথম দিন রাজবেশ, ১৩ তারিখ ছিল ফুলবেশ এবং ১৪ তারিখ রাখালবেশে সাজানো হয়েছিল বিগ্রহদের। এই তিনদিন সকল দর্শনার্থীদের নাটমন্দির ও বিগ্রহ দর্শনের জন্য সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা ছিল রাজবাড়ির সিংহ দুয়ার।

এ তো গেল পুজোর খুঁটিনাটি বৃত্তান্ত। কিন্তু কথায় বলে, “খাজনার থেকে বাজনা বেশি”, এখানেও তার অন্যথা হয়নি। পুজোকে ঘিরে বসা এক মাসের মেলাকে ঘিরেই যত উন্মাদনা। আর সেই মেলাটাই বন্ধ ছিল দু’বছর। ফলতঃ, এবছর যে উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে সেকথা আলাদা করে বলে দিতে হয়না। কৃষ্ণনগরের কলেজ পড়ুয়া সায়নী সেনের কথায় ছিল সেই আনন্দের রেশ, “গত দুই বছর পর আবার বারোদোল, আবার বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে নাগরদোলাতে চাপা হবে ভেবেই আনন্দ হচ্ছে। শহরটা আবার সেজে উঠেছে, এত মানুষ আসছে দেখে মনটা ভরে গেছে”।

Developed by DXDasia