কম্পিউটার-ক্যামেরা থেকে দোলনা-ডিজেবক্স – বাতিল জিনিসের সম্ভার মথুরাপুরের ‘ভাঙা মেলায়’

দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই গ্রামে পৌষ সংক্রান্তিতে শুরু হয় এমনই সব পুরোনো জিনিসপত্রের মেলা

শীতের পড়ন্ত রোদ গায়ে পড়তেই নাকি চোখ লেগে গিয়েছিল তারেক শেখের। সামনেই তাঁর পসরা। পসরা বলতে মিক্সার গ্রাইন্ডার, স্যান্ডুইচ মেকার, ইলেকট্রিক কেটলি, হোম থিয়েটার, টেবিল ফ্যান ইত্যাদি ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র। এসবই সেকেন্ড হ্যান্ড, ভাঙাচোরা, বাতিল। ভাববেন না বড়সড়ো শোরুম তাঁর। ওপরে ত্রিপল আর নিচে শতরঞ্জি বিছিয়ে মেলায় বসে পড়েছেন। তাঁর মতো অনেকেই খোলা আকাশের নিচে এমন বাতিল, ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন। পেটাই পরোটা ঘুগনি, জিলিপি, গজা, আচার, ঝালমুড়ি, ফুচকার গন্ধে ভরা মেলায় এগুলোই বিক্রিবাটা হচ্ছে।

‘কুইকার’, ‘ওএলএক্স’-এর হাত ধরে ‘হাফ প্রাইস’-এ পুরোনো (তথাকথিত টার্মে ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’) জিনিস কেনার অভ্যেস বাঙালির চালু হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের দক্ষিণ বিষ্ণুপুর গ্রামে পৌষ সংক্রান্তিতে শুরু হয় এমনই সব পুরোনো জিনিসপত্রের মেলা, সবাই বলে ভাঙা মেলা। আদতে এই মেলা পৌষ সংক্রান্তির মেলা, যা চলে প্রায় এক মাস ধরে। সঙ্গে চলে মথুরাপুর গ্রামীণ বইমেলাও। সেটা দেখে নিতে ভুলবেন না যেন।

ভাঙা জিনিসের এই মেলা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। অনেকের মতে, গঙ্গাসাগরের পরে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এটিই সবচেয়ে বড়ো মেলা। হয়তো দক্ষিণ ২৪ পরগনার সবচেয়ে পুরোনা মেলাও এটি। বহু বছর ধরেই ওই গ্রামে হয়ে আসছে এমন বিচিত্র মেলা। লোকমুখে এই মেলা মথুরাপুর মেলা, বিষ্ণুপুর মেলা, পৌষ মেলা নাম হয়ে গিয়েছে। ভিড় করেন আশেপাশের গ্রাম থেকে পুরোনো জিনিসে আগ্রহী মানুষজন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় জিনিস, তার সবই আছে। তবে কোনওটাই নতুন নয়, সবই সেকেন্ড হ্যান্ড গোত্রের।

কথিত আছে, নবদ্বীপ থেকে শ্রীচৈতন্য ওড়িশা রওনা দেওয়ার কালে মকর সংক্রান্তির দিনই এই স্থানে রাত্রিবাস করেছিলেন। তখন এখান দিয়ে গঙ্গা বইত। আজ গঙ্গা এখানে না থাকলেও রয়ে গিয়েছে ইতিহাস। তাই পৌষ সংক্রান্তির পূণ্যদিনে এখানকার মহাশ্মশান সংলগ্ন পবিত্র পুকুরটিতে চলে পুণ্যার্থীদের স্নান পর্ব। সেই উপলক্ষ্যেই এই মেলার আয়োজন।

কিন্তু কালচক্রে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ভাঙাচোরা পুরোনো জিনিসপত্রের মেলায় পরিণত হয়েছে এই সংক্রান্তির মেলা। এখানে দেখা মিলবে— বাতিল আস্ত কম্পিউটার, তার কি-বোর্ড, মনিটর, এমনকি টেবিলও! পুরোনো ক্যালকুলেটর, রেফ্রিজারেটর, মাইক্রোওয়েভ, ইনভার্টার, ওয়াশিং মেশিন, টোস্টার, ডিজেবক্স, এমননি ভ্যাকুয়াম ক্লিনারও! বই, ইলেকট্রনিক গুডস থেকে কাঠের আসবাব কী না নেই!

জামাকাপড়, ফেলে দেওয়া তক্তোপোশ, বাতিল কার্পেট, শয্যার খাট থেকে বহু ব্যবহারে জীর্ণ বাচ্চাদের কাঠের দোলনাও মজুত এই মেলাতে। আছে হাতলভাঙা প্যারামবুলেটর, রং চটা স্যুইচবোর্ড, কাচে দাগওয়ালা রিচার্জেবল টর্চও। সংগ্রহগুলো খুঁটিয়ে দেখলে প্রশংসা করতেই হয়! গেরস্থালির জিনিসে পাবেন কড়াই-খুন্তি, গ্যাস ওভেন, লাইটার, ফুলদানি, ধূপদানি, আয়না থেকে বঁটি বা কাঁচি ছুরিও। বোঝাই যায়, বিক্রেতারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসব সংগ্রহ করেছেন। তাই জিনিসের কোনো গ্যারান্টিও নেই, উচ্চমূল্যের চোখ রাঙানিও নেই।

তারেক শেখের পাশের দোকানে রাখা গেরস্থালির জিনিসপত্রের ডাঁই থেকে অনেকেই নিজেদের পছন্দমতো জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কত সস্তা! তারেক শেখের নিজের বাড়ি রায়দিঘি। তিনি বললেন, “অন্যদিন দম ফেলার ফুরসত পাওয়া যায় না। আজ একটু ফাঁকা ছিল। তাই চোখ লেগে গিয়েছিল।” 

তারেক বেশ হাসিখুশি। বেশ ভালো কথা বলেন। খদ্দের নেই দেখে ভাব জমালাম। মেলাতলার গরম গরম জিলিপি খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই হোম থিয়েটার, বায়নোকুলার, ক্যামেরা কেউ কেনেন?” তারেক হাসেন, “গরিব মানুষ বলে কি দুটো শখ আহ্লাদ থাকতে নেই? যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। দামের জন্য যারা দোকান থেকে কিনতে পারেন না, তারা এখান থেকে শখের বস্তু কেনেন।” শখের বস্তু? তারেক বলেন, “জীবন একটাই। তায় শখ রাখতে নেই বাকি। ক্যামেরা, ওয়াটার পিউরিফায়ার, হোম থিয়েটার, ল্যাপটপ গরিবের শখের বস্তু। পাঁচ-ছ হাজার টাকার হোম থিয়েটার আমার কাছে দেড় হাজার টাকায়।” 

সত্যিই সারা মেলা জুড়ে পুতুল থেকে শুরু করে বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যাওয়া রেকর্ড প্লেয়ার, ঝাড় লন্ঠনের রমরমা। সেসব কিনতেও মগরাহাট, কুলতলি, জয়নগর, মথুরাপুর, রায়দিঘি, ঢোলাহাট, কুলপি থেকে দলবেঁধে মানুষ আসেন।

মনে আছে, এমপিথ্রি নামের বস্তুটি বাজারে এসে যাওয়ায় সব বাড়িতেই বাতিলের তালিকায় চলে গিয়েছে একসময়ের শখের টেপ রেকর্ডার। সেই স্মৃতিটাই আরেকবার ঝালিয়ে নিলাম মেলায় সেকেলে দামি দামি রেকর্ড প্লেয়ার আর টেপ রেকর্ডারগুলো দেখে দেখে। সে সব দেখে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্মৃতির ফ্ল্যাশব্যাক মোডে চলে গেলাম। এখন তো ইউটিউব! এমপিথ্রিও আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে! শৈশবে আরব্য উপন্যাসে পড়া পিতলের গড়গড়া দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে গেল। আহা! কী কারুকাজ। হ্যাঁ, এমন অনেক কিছুই আমাদের সভ্যতা বা জীবন থেকে দূর হয়ে গেছে। সোনি কোম্পানির ওয়াকম্যান, টাইপ রাইটার, পাঁচ সেলের টর্চ, ইমারজেন্সি চার্জার লাইট থেকে সেই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট মোবাইল ফোন বিদিশার নিশার মতো জন্মান্তরের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। বুঝলাম, এরই নাম শখের বস্তু!

জাতি ধর্ম বয়স লিঙ্গভেদে মানুষের শখ থাকেই। তাই তালিকা শেষ হওয়ার নয়। মেলা ঘুরে দেখতে দেখতে সন্ধের আলো জ্বলে উঠল। শখের হাতছানিতে দলে দলে ভিড় জমিয়েছেন নারী পুরুষ, প্রবীণ নবীন। তারেক সুর করে খদ্দের ডাকতে শুরু করে দিয়েছেন ততক্ষণে, “শখপূরণ করে নাও জীবনের। জীবন কদিনের….।”

পথনির্দেশঃ শিয়ালদহ থেকে ১৫ টাকা খরচ করে টিকিট কাটুন মথুরাপুর রোডের। ব্যাস, স্টেশন থেকে ১০ মিনিট হেঁটে পৌঁছে যান পুরোনো এই মেলায়। মেলা চলবে আরও কয়েকদিন।

Developed by DXDasia