
বাঘের হামলায় মৃতের স্ত্রী সমাজে ‘বাঘ-বিধবা’ নামে পরিচিত হন
সুন্দরবন সুন্দর না ভয়ঙ্কর? বিতর্ক হতেই পারে! আপাতত সুন্দরবন বিধ্বস্ত, হতাশ ও দারিদ্র্যে পীড়িত। লকডাউন এবং একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা। অনেক বাড়িতেই তৈরি হয়েছে রোজগারের টানাপোড়েন। তবে বিপর্যয়ের এই ঘনঘটায় অন্তত বাঘ বিধবাদের জীবনে আর বাঘের ভয়ে সন্ধে হয় না। প্রান্তিক জীবনের এক নিরন্তর লড়াইয়ের নামই বাঘ বিধবা। গত দেড় বছর ধরে সুন্দরবনের গ্রামে গ্রামে বাঘ বিধবাদের সংখ্যা বাড়ছে। সুন্দরবনের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের বঞ্চনা আর বুকফাটা হাহাকার নিয়ে বাঘ বিধবাদের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে যুগ যুগ ধরে।
সুন্দরবন-এর কুলতলির অঞ্জলি বৈদ্য এমনই একজন অল্পবয়সী বাঘ বিধবা। দুই সন্তান আর স্বামী নিয়ে তাঁর সংসার চলে যেত একরকম। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর স্বামীকে বাঘে নিয়ে যায়। তারপর থেকে শুরু হয়েছে বাঘ বিধবা অঞ্জলির নিরন্তর সংগ্রাম। অতি অল্প বয়সেই অঞ্জলি বাঘ-বিধবা হয়েছেন। এখন বয়স মাত্র ২৫। দায়িত্ব রয়েছে দুই সন্তানকে বড়ো করে তোলা। কোনও উপার্জন নেই। তাঁর মতো অনেকে জঙ্গলে যান মীন বা কাঁকড়া ধরতে। যে জঙ্গল অঞ্জলির স্বামীকে কেড়েছিল, সেই জঙ্গলে কি অঞ্জলি ফিরে যাবে জীবিকার তাগিদে? জীবনের এই দুর্ভেদ্য প্রহেলিকা একা অঞ্জলির নয়, তার মতো আরও অনেকের। তার উত্তর পেতে গিয়েছিলাম বাঘ-বিধবা অঞ্জলির কাছে।
সুন্দরবনের একটা বড়ো অংশের মানুষ অরণ্যের ওপর নির্ভর করেন। মধু, কাঁকড়া আর মাছ ইত্যাদি সংগ্ৰহ করতে করতে তারা বাঘের ডেরা পর্যন্ত পৌঁছে যান। দীর্ঘদিন ধরে এ অভ্যাস চলে আসছে মূলত জীবিকার তাগিদেই। একদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাঘের খাদ্য ঘাটতি হচ্ছে যেমন, তেমনিই বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে স্থানীয় বাসিন্দারা বিপদে পড়েছেন। মাছ, কাঁকড়া, মধু সংগ্রহ করতে জঙ্গলে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তাতেই বেড়েছে বিপর্যয়। ইদানীং সেই সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে। গত দেড় বছরে বাঘের হানা হয়েছে প্রায় ৩৭ বার। ফলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাঘের আক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা। বাঘের হামলায় মৃতের স্ত্রী সমাজে ‘বাঘ-বিধবা’ নামে পরিচিত হন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন বাঘ-বিধবাদের জন্য। এগিয়ে এসেছে পথের সাথীর মতো আরও বেশকিছু বেসরকারি সংগঠনও।
যদিও এখনও অনেক মহিলা তাঁদের স্বামীর ভিটে আগলেই দারিদ্র, রোগ-ব্যাধি আর অনাহারকে সম্বল করে বেঁচে থাকতে চান। নারী পাচারের আতঙ্ক সর্বদা এই স্বামীহারাদের মনে।
বাঘ বিধবাদের পাশে ‘পথের সাথী’
এই বাঘ বিধবাদের পাশে রয়েছেন বেথুন কলেজের অধ্যাপিকা সুমিতা মুখোপাধ্যায়। গত বছরের ২৪ মে তিনি গড়ে তোলেন ‘পথের সাথী কলকাতা’। এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করে। একইসঙ্গে অসহায় মহিলাদের পাশে দাঁড়ায়। দেড় বছরের মধ্যে আমফান দুর্যোগে বিধ্বস্ত মানুষের পাশে ত্রাণ নিয়ে পৌঁছেছে সংস্থাটি। একাধিক কমিউনিটি কিচেন চালানোর অভিজ্ঞতাও তাঁদের ঝুলিতে। সদস্যরা ছুটে গিয়েছেন সুন্দরবনের হিঙ্গলগঞ্জ, মৌসুনি দ্বীপ, বাগবাগান রাঙাবেলিয়া, রাজাপুর, রানিপুরের মতো প্রান্তিক এলাকায়।
এই পরিস্থিতিতে অঞ্জলিই প্রথম বাঘ-বিধবা যিনি কলকাতায় এসে নতুনভাবে বাঁচতে চেয়েছেন। ভবিষ্যতে অঞ্জলিকে দেখে আরও অনেকে হয়তো সুস্থ ও স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে চাইবেন। অঞ্জলি অনাহার, অশিক্ষা আর রোগভোগের জীবনকে পরিহার করতে চেয়েছেন। পাশে পেয়েছেন অধ্যাপিকা সুমিতা মুখোপাধ্যায়ের মর্মস্পর্শী হাত। সঙ্গে সঙ্গে আঁকড়ে ধরেছেন অঞ্জলি। স্বামীর মৃত্যুর পর কীভাবে সংসার চালিয়েছেন তিনি? ধানকাটা, ধান রোয়ার কাজ করতেন। দুই সন্তান নিয়ে জীবনধারণের কষ্ট ছিল ভয়ঙ্কর। পাঁচ কাঠা চাষের জমি বন্ধক পড়ে আছে। বাড়িঘর পরপর বিধ্বংসী ঝড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সুমিতা মুখোপাধ্যায় বঙ্গদর্শনকে বলেন, “বাঘ-বিধবাদের অনেকেই স্বামীর মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ পান না। অঞ্জলিও পাননি ক্ষতিপূরণ। লকডাউন আর ইয়াসের জন্য চাষের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এদের জীবনের সমস্যার শেষ নেই। অনেকে স্বামীর মৃত্যুর পর মীন, কাঁকড়া ধরতে ফের জঙ্গলে বাঘের ডেরায় যেতে বাধ্য হন।”
এই পরিস্থিতিতে শহরে আসাই অঞ্জলির পক্ষে সঠিক মনে হয়েছে। পথের সাথী কলকাতার তরফে অঞ্জলি বৈদ্যর পুরো পরিবারকে পুনর্বাসন দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে অঞ্জলির ছেলে অপূর্ব বৈদ্যকে রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেলে রাখা হয়েছে। মেয়ে অনন্যা বৈদ্যকেও একটি বোর্ডিংয়ে রাখার তোড়জোড় চলছে। অঞ্জলি বলেন, “সুন্দরবনে আমার দুই সন্তান নিয়ে একাকী লড়াই করার উপায় ছিল না। তাই শহরে আসার কথা ভাবি। এখন যে কোনও কাজ শিখে নিজে স্বাবলম্বী হতে চাই।” আপাতত অঞ্জলি তাঁর মেয়েকে নিয়ে অধ্যাপিকার বাড়িতেই রয়েছেন। আমফানে ক্ষতি হওয়া বাড়িঘর মেরামত করা তাঁর স্বপ্নে। ছেলেমেয়েকে মানুষ করে তুলতে চান তিনি। এই দুটো লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে দরকার স্বনির্ভরতা। আপাতত বিউটিশিয়ান কোর্স বা হোম ডেলিভারি– কোনও না কোনও ভাবে স্বনির্ভর হওয়াটাই তাঁর লক্ষ্য। পাশে রয়েছে পথের সাথী কলকাতা।

