পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির শারদোৎসব : ব্যতিক্রমী দুর্গাপুজোর উপচারে সংগীত-নৃত্য

আয়োজনের কাণ্ডারি সৌরজা ঠাকুর

শহরের বুকে এক ব্যতিক্রমী দুর্গাপুজোর আয়োজন, সেখানে ফুল নেই, ভোগ নেই, পুরোহিত নেই, মন্ত্রোচ্চারণ নেই। উমার কাছে নিবেদন করা হয় শিল্প-সংস্কৃতি। তৃতীয়বর্ষে পদার্পণ করছে ঠাকুরবাড়ির শারদোৎসব। প্রসঙ্গত, ১৭৮০ সাল নাগাদ পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়িতে গোপীমোহন ঠাকুর প্রথম শারদোৎসবের আয়োজন করেন। সুদীর্ঘকাল তা নিরবিচ্ছিন্নভাবে চললেও, ২০০৮ থেকে ছেদ ঘটে। চোদ্দ বছর পর, ২০২২ সালে ফের ১৩-বি প্রসন্নকুমার টেগোর স্ট্রিটের টেগোর প্যালেসে শুরু হয় শারদোৎসব। ঠাকুরবাড়ির সদস্যা সৌরজা ঠাকুর আয়োজনের কাণ্ডারি। আনন্দমেলা, আনন্দ উৎসব ও আনন্দ যাত্রা; তিনটি পর্বে আয়োজিত হতে চলেছে সৌরজা ঠাকুর নিবেদিত ‘ঠাকুরবাড়ির শারদোৎসব ২০২৪’।

পাথুরিয়াঘাটার টেগর প্যালেস

ঠাকুরবাড়ির শারদোৎসবে প্রচলিত ঢঙে পুজোর কোনও আয়োজন থাকে না। দেবী প্রতিমাকে শিল্পের অঞ্জলি দেওয়াই ঠাকুরবাড়ির শারদোৎসবের রেওয়াজ। সৌরজা ঠাকুর জানাচ্ছিলেন, মহালয়ার দিনে তাঁরা আনন্দমেলার আয়োজন করেন। বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী, খাবারের স্টল ইত্যাদি থাকে সেখানে। মূলত বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখেই এদিনের অনুষ্ঠান সাজানো হয়। একেবারে ছোট, খুদে শিল্পীরা অনুষ্ঠান করে। এ বছর ২ অক্টোবর আনন্দমেলা আয়োজিত হবে। এ বছর পুতুল নাচের আয়োজন করা হয়েছে। ধূমকেতু পাপেট থিয়েটার আনন্দমেলায় পুতুল নাচ দেখাবে, এবারের উপস্থাপনা ‘সেলফিশ জায়েন্ট’। 

আনন্দমেলা, আনন্দ উৎসব ও আনন্দ যাত্রা; তিনটি পর্বে আয়োজিত হতে চলেছে সৌরজা ঠাকুর নিবেদিত ‘ঠাকুরবাড়ির শারদোৎসব ২০২৪’।

পুজোর তিনদিন ঠাকুরবাড়ি শারদোৎসবের মূল অনুষ্ঠান চলে, যা আনন্দ উৎসব নামে পরিচিত। ১০, ১১ এবং ১২ অক্টোবর তিনদিনজুড়ে অনুষ্ঠিতব্য এবারের ‘আনন্দ উৎসব’-এ নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে বলেও জানালেন সৌরজা। প্রথমদিন থাকবে বাল্মীকি প্রতিভা, দ্বিতীয়দিনের আয়োজনে থাকছে দুর্গাপুজো বিষয়ক কুইজ শারদসন্ধান, রুদ্রবীণা ও বাউল গান। তৃতীয় দিনে রয়েছে রবীন্দ্রসংগীত, বাঁশি এবং নৃত্য প্রযোজনা নবমী নিশি। ১৩ অক্টোবর ঠাকুরবাড়ির আনন্দ যাত্রা। ওই দিন রবীন্দ্রনাথের গান রাঙিয়ে দিয়ে যাও শ্রীখোলের মাধ্যমে শোভাযাত্রা আয়োজিত হবে। আনন্দ যাত্রায় নাচের মাধ্যমে মাকে বরণ করে নেওয়া হয়, আলাদা করে কোনও উপাচার থাকে না। সৌরজা জানালেন, এ বছরই প্রথম প্রতিমা বিসর্জন হবে। বিগত দু’বছর তাঁরা দূষণ এড়ানোর ভাবনা থেকে বিসর্জন দেননি। কিন্তু মাটির মূর্তি হওয়ায় তিন বছরের বেশি রাখা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, ঠাকুরবাড়িতে যে মূর্তিতে দুর্গাপুজো হত, শারদোৎসবে একই আদলের মূর্তিই রাখা হয় আজও। উমা চিরাচরিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপেই শিল্পাঞ্জলি পান। ফি বছর কলেবর করানো হয়। সপ্তমীর দিন চণ্ডীশ্লোক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দেবী প্রতিমাকে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসা হয়।

পাথুরিয়াঘাটার প্রতিমা ও সৌরজা ঠাকুর

সৌরজা বলছিলেন, “ঠাকুরের কাছে আমাদের নিবেদন বলতে, সম্পূর্ণভাবে আমাদের অনুষ্ঠান। দালানে উনি (দুর্গা প্রতিমা) বসেন। দর্শকেরা তাঁর পিছনে বসেন। উনি সবার আগে অনুষ্ঠান দেখেন। আমাদের মায়ের দিকে মুখ করে মঞ্চ করা হয়, মা যাতে দেখতে পান।”

পুজোর তিনদিন ঠাকুরবাড়ি শারদোৎসবের মূল অনুষ্ঠান চলে, যা আনন্দ উৎসব নামে পরিচিত। ১০, ১১ এবং ১২ অক্টোবর তিনদিনজুড়ে অনুষ্ঠিতব্য এবারের ‘আনন্দ উৎসব’-এ নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে বলেও জানালেন সৌরজা।

এ অভিনব উপায়ে দুর্গা আরাধনার কারণ প্রসঙ্গে, সৌরজা জানাচ্ছেন, “আমি গান, বাজনা ভালোবাসি। শারদোৎসব করারকথাযখন প্রথম মাথায় এসেছিল, তখন আমি অনুষ্ঠান করতেই চেয়েছিলাম, পুজোর সময় মানুষের জন্য যাতে সুস্থ সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকে। কারণ, পুজোর সময় চারপাশে যা হয়; সব সময় সেটা বাংলাকেন্দ্রিক হয় না। যেহেতু অনুষ্ঠানগুলো দুর্গাপুজোর সময় হয়, তাই মাকেও সামিল করি।”

 

আরও বলছিলেন, “এখানে মায়ের চক্ষুদান, প্রাণ প্রতিষ্ঠান হয় না। কিন্তু মা, তাঁর স্থানে বসার পর মঞ্চে উঠলে শিল্পীরা যেন আলাদা শক্তি অনুভব করেন। যা অন্য সময়ের অনুষ্ঠানে পাওয়া যায় না। এটা কেবল আমার অভিজ্ঞতা নয়, অনুষ্ঠান করতে আসা অনেক শিল্পীই একথা আমায় জানিয়েছেন। মনে শ্রদ্ধা থাকলে, মায়ের কাছে পৌঁছতে পুরোহিত, মন্ত্রপাঠের দরকার হয় না। এখানে সকলের আমন্ত্রণ। ছোটো ছেলেমেয়েদের এখানে সামিল করার চেষ্টা করি। যাতে পুজো, ফুচকা খাওয়া, নাগরদোলনা চড়া বা ফুল ছুঁড়ে অঞ্জলি দেওয়ার সংস্কৃতিপৌঁছতেপারে। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে ওরা প্রতিদিন ‘রিহার্সাল’করে, রেওয়াজ করে, নতুন নাচ শেখে। ক’টা জামা হল তার বদলে ওরা ভাবে ক’টা নতুন নাচ শিখলাম। চার মাস ধরে প্রস্তুতি চলে। ভাবনা, পরিকল্পনা, সাজানো, শিল্পীরা অনুশীলন করেন। কোনও একটা উপলক্ষ্যের মধ্যে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।”

চলছে প্রস্তুতি

দুর্গাপুজোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদা পুজোর সময় রাজা, মহারাজা, জমিদারের বাড়িতে কবিগান, যাত্রাপালার আসর বসত। বনেদি বাড়ির সদস্য-সদস্যারা গ্ৰুপ থিয়েটার করতেন। নাচ, গান, অভিনয় বাঙালির যাপনের অঙ্গ, আটপৌরে বাঙালিয়ানার পরিচায়ক। কালের নিয়মে আজ সে’সবে বহির্বঙ্গীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে। সেখানে দাঁড়িয়ে সুস্থ সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার নৈবেদ্যর মাধ্যমে ঠাকুরবাড়ির শারদোৎসব আশার আলো হয়ে দেখা দিচ্ছে।
 

Developed by DXDasia