পুজো পাঠ : নতুন প্রজন্মের সামনে একটি নতুন পথের সন্ধান

মায়া আর্ট স্পেস-এর আলোচনায় দুর্গাপুজো নিয়ে নতুন সম্ভাবনার কথা

শিল্পশিক্ষা গ্রহণের পরে সেই শিক্ষার চিন্তাশীল প্রয়োগিক দিকগুলি নিয়ে আজও সমাজ নানা কারণে চিন্তিত থাকে। যাঁরা ডাক্তার হতে চান বা ইঞ্জিনিয়র, তাঁদের একটা পেশা প্রয়োগের রাস্তা নির্ধারিত থাকে। কিন্তু যে প্রজন্ম ছবি আঁকছে, বা ভাস্কর্য গড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই বিষয়গুলি নিয়ে শিক্ষিত হওয়ার জন্য তাদের সামনে এরকম কোনও নির্ধারিত পথ তৈরি করা নেই। ফলে জীবন জীবিকার প্রশ্নে তাঁদের চোখে অনেক স্বপ্ন থাকলেও নির্ধারিত পথের সন্ধান থাকে না।

এরকম অবস্থায় বারে বারেই দেখা গিয়েছে শিল্পীকে তাঁর নিজের রাস্তা নিজেকেই কাটতে হয়। অনেকে অবশ্য মনে করতে পারেন যে শিল্প তাঁর কাছে পেশা নয়, শিল্প তাঁর কাছে নিজের কথা প্রকাশের ভাষা। এবং সে নিজেকে সেইভাবেই নিয়োগ করে থাকেন। কিন্তু আজ যখন অজস্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘শিল্পী’ নামক একটা জাতি নির্মিত হয়ে বিশেষ দক্ষতায় বেরিয়ে আসছে, তখন তাঁদের সবাই আবেগ প্রকাশের ভাষা হিসেবে কেবলমাত্র তাঁদের এই প্রশিক্ষণকে দেখবেন এমনটা নয়। তাঁরা এই অর্জিত শিক্ষার প্রয়োগের দিকগুলি অবশ্যই অনুসন্ধান করবেন।

আজ যখন এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে সকলেই বুঝতে পারেন হাতের সামনে টিম টিম করে আছে মাত্র দুয়েকটি উপায়, তাও সেখানে প্রতিযোগীর শেষ নাই, সেরকম একটা সময় কলকাতার দুর্গাপুজো একটা নতুন সম্ভাবনার কথা আমাদের সামনে নিয়ে আসছে। এই নিয়ে আসার দিকগুলি সুচিন্তিত ভাবে স্পষ্ট হল জুন মাসের ১২ তারিখ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত মায়া আর্ট স্পেস-এ আয়োজিত বক্তৃতা মালায়। ওঁরা জানাচ্ছেন এই আলোচনার একাধিক অভিমুখের কথা।

একটা অস্থায়ী স্থাপত্যের (চলতি কথায় প্যান্ডেল) যে গভীর দাগ কেটে যাওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে মানব মনের ওপরে, সেই প্রসঙ্গে ও তারও আরও নানা দিক নিয়ে কথা বলেন স্থপতি অবিন চৌধুরী। তপতী গুহ ঠাকুরতা অত্যন্ত প্রসঙ্গিক ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন দুর্গাপুজো পাবলিক এডুকেশনের একটা বিরাট ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে যে ক্ষেত্র আজ ‘এক্সপ্লোর’ করার সময় এসেছে।

প্রথমত ‘Durga Puja Appreciation’, দ্বিতীয়ত ‘Art of Durga Puja’, তৃতীয়ত ‘Concept and Making’. অর্থাৎ গোটা পর্বটাই দাঁড়িয়ে রয়েছে চারটি প্রধান স্তম্ভ যথা ART, CONCEPT, MAKING এবং APPRECIATION -এর ওপরে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে দুর্গাপুজো একটা making of art with an aesthetic concept -এর কথা বলছে। এই পর্বের আরেকটি ইঙ্গিত হল একথা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না যে দুর্গাপুজোর সঙ্গে একটা Corporate Economy যুক্ত, শুধু তাই নয় এই পুজো এখন বিশ্ব বাজারের আঙিনায় একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। কারণ কর্পোরেট এরিনায় এটা একটা প্রোডাক্ট গছিয়ে দেওয়ার ব্যাপার নয়। এখানে এমন একটা ‘Aesthetic concept’ বিক্রি করার কথা আসছে যা দেশের অর্থনীতিকে একাধিক কারণে পুষ্ট করে। এই যে ‘Art and Market Economy-র মধ্যে Positive Conversation’ Point তৈরি হয়েছে, এটাই একটা প্রজন্মের কাছে বিরাট সম্ভাবনার কথা বলে।

এরকম সময় দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের সামনে মায়া আর্ট স্পেস-এ অমর সরকার, পূর্ণেন্দু দে, সনাতন দিন্দা, তরুণ দে, প্রদীপ দাস, তন্ময় চক্রবর্তী, অনির্বাণ দাস, ভবতোষ সুতার, পার্থ দাশগুপ্ত এবং সুশান্ত পালের মতো পুজো মাঠের নক্ষত্র প্রতিম শিল্পীরা কীভাবে কাজ করেন, একটা শূন্য জমিতে সেকথার নানা দিক তুলে ধরলেন।

এই তুলে ধরা কেবল মাত্র নিজেদের পুজোশিল্প ভাবনাকে তুলে ধরলেন এমনটা নয়, একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট শিল্প-শিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে এসে আজ তাঁরা নিজেদের ভাবনা প্রয়োগের দিক কীভাবে উন্মোচন করেছেন। কিভাবে পুজো চর্চাকে সামনে রেখে তার নির্দিষ্ট সংস্কারগুলিকে অপরিবর্তিত রেখে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শিল্পমুখী করে তোলা যায়,  সেকথারই ইঙ্গিত স্পষ্ট করলেন এই শিল্পীরা। ১৯ তারিখ এই ভাবনার সঙ্গে জড়িত আরও কিছু শিল্পী ও শিক্ষাবিদ আলোচনায় ও প্রশ্নোত্তর পর্বে যোগ দিয়েছিলেন। আমি নিজে ছিলাম, ছিলেন ভাস্কর বিমল কুণ্ডু, ছিলেন ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজের অধ্যাপক শমীন্দ্রনাথ মজুমদার, ছিলেন স্থপতি অবিন চৌধুরী ও প্রখ্যাত শিল্পতাত্ত্বিক তপতী গুহ ঠাকুরতা।

এই আলোচনা পর্ব থেকে চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। একটা অস্থায়ী স্থাপত্যের (চলতি কথায় প্যান্ডেল) যে গভীর দাগ কেটে যাওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে মানব মনের ওপরে, সেই প্রসঙ্গে ও তারও আরও নানা দিক নিয়ে কথা বলেন স্থপতি অবিন চৌধুরী। তপতী গুহ ঠাকুরতা অত্যন্ত প্রসঙ্গিক ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন দুর্গাপুজো পাবলিক এডুকেশনের একটা বিরাট ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে যে ক্ষেত্র আজ ‘এক্সপ্লোর’ করার সময় এসেছে। বিমল কুণ্ডু উদাহরণ দিয়ে বললেন অন্যান্য শিল্প পেশার সঙ্গে যুক্ত গুণীজনেরা পুজো শিল্পকে কীভাবে গ্রহণ করেছেন। শমীন্দ্রনাথ মজুমদার স্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন শিল্প চর্চার আঙিনায় আগামী দিনে পুজোশিল্প একটি আবশ্যিক চর্চার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ফেলেছে।

বলছেন দেবদত্ত গুপ্ত, পাশে অন্যান্য বক্তারা

আর আমার নিজের বক্তব্য ছিল, নতুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা যারা শিল্পশিক্ষায় নিয়োজিত তাঁদের এই পুজোশিল্প ক্ষেত্রটি একটি নতুন পথ দেখাতে পারে। কিন্তু তার জন্যে নিজেকে এখন থেকেই ‘রিসোর্স পার্সন’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ এখানে কাজ করার ক্ষেত্র অবাধ কিন্তু এখানে ভিনি ভিডি ভিসি-র কোনও জায়গা নেই। এরকম সদর্থক দিক ও সম্ভাবনাকে নতুন প্রজন্মের সামনে দিনের আলোর মতো এই ভাবে তুলে ধরার জন্যে মায়া আর্ট স্পেস ও স্পেসের কর্ণধার মধুছন্দা সেনের কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।

Developed by DXDasia