
কলকাতার দুর্গাপুজো, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও নগর সভ্যতা
কলকাতার দুর্গাপুজোকে ইউনেস্কো (UNESCO) ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি’–এর তকমাভুক্ত করেছে। কিন্তু দুর্গাপুজোই যখন, তখন শুধু কেন কলকাতার নাম জড়ালো? কথা হলো, দুর্গাপুজো (Durgapuja) কি বাংলার আর অন্য কোথাও হয় না? বা প্রাচীনত্বের বিচারেও তো কলকাতার দুর্গাপুজো বাংলার জেলা, মফসস্ল ও গ্রাম থেকে পিছিয়ে, তবে কলকাতাকেই শুধু এই তকমা কেন?
ঐতিহ্যের বিচারে সমগ্র বাংলার দুর্গাপুজোর গুরুত্ব কম কিছু নয়। এ কথা ভীষণ খাঁটি যে সারা বাংলাতেও কলকাতার সমান উদ্দীপনা নিয়েই দুর্গোৎসব উদযাপন করা হয়। যে জায়গা থেকে কলকাতা (Kolkata) নজর কেড়েছে তা হল কলকাতার আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্থানিক বৈশিষ্ট্য (Spatial- Locational Importance)। এই স্থানিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু শুধুমাত্র অঞ্চল হিসেবে কলকাতার ভৌগলিক অবস্থানের নিরিখে নয়, যেমন কলকাতা শহর হুগলি নদীর বামতীরে অবস্থিত বা এর অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ বা এর জলবায়ুগত অবস্থান ইত্যাদির বিচারে নয়। বরং কলকাতা সুবিধে পেয়েছে এর ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের পথে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার বিকাশে পূর্বভারতের অন্যতম ধারক ও বাহক হিসেবে।

কতগুলি ক্ষেত্রে আধুনিক নগরের প্রায় একই রকমের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আছে, তাদের প্রায় সমধর্মী বিবর্তনের ধারা। সেই একই ধারা অনুসরণ করার পরেও কলকাতার দুর্গোৎসব যে তার সাংস্কৃতিক মহিমা এখনও বজায় রাখতে পেরেছে, তার নাগরিকদের মুগ্ধ রাখতে পেরেছে তাতেই সফল কলকাতার অনন্য নগর বৈশিষ্ট্য। কলকাতা মানে কিন্তু কলকাতার নাগরিকরা (Kolkata’s Citizen), এর মফস্বলের নিত্যকার জনস্রোত, ঘটনাপ্রবাহ একত্রে। কলকাতার নাগরিকদের এই একত্র কল্পমূর্তি ও তার যে চৈতন্য তা কিন্তু বৃহত্তর বাংলার সাংস্কৃতিক বিভাবেরই সমগোত্রীয়।
দেখতে পাবেন বহু লোকের হাতে কানাকড়ি না থাকলেও শহরের দুর্গোৎসবের বিপুল আয়োজনের জন্য তার মধ্যে একটা ‘ফিল গুড’ ব্যাপার কাজ করছে, এটা লোকজনের উপর যে কোনো বড়ো অনুষ্ঠানের একটা মানসিক প্রভাব।
এই বিভাবকে মাথায় রেখেই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, কলকাতার বিশেষ কিছু অঞ্চলে দুর্গাপুজো ও তাকে ঘিরে যে ধরণের বাস্তব বা কায়িক দৈশিক (Physical space) নির্মাণ আরম্ভ হয়, তা প্রতক্ষ্যকরণের মাধ্যমে সামগ্রিক ভাবে একটি গোষ্ঠী দেশ (Urban community space) নির্মিত হল, যার উৎসব সম্পর্কে নিজের মতো এক উপলব্ধি আছে। এই দৈশিক অবস্থান অনন্য প্রকৃতির কারণ এতে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার অংশ হিসেবে শুধুই বাঙালিরা বা হিন্দু ধর্মের লোকেরা উপস্থিত থাকে না, থাকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর লোক। এটি কিন্তু একমাত্র সম্ভব হয়েছে কলকাতার কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন চরিত্রের জন্য, মেট্রো শহর হিসেবে কলকাতার যে বৈশিষ্ট্য তাতে কলকাতার নাগরিকদের সামাজিক যোগাযোগের বিন্যাস দূরের মফসস্ল ও গ্রামবাংলার থেকে আলাদা। শুধু তাই নয় সমগ্র ভারত তথা বিশ্বের অন্যান্য বড়ো শহরের তুলনায় কলকাতার পিছিয়ে থাকা অর্থনৈতিক চরিত্র এর বাঙালি (Bengali) জাতিসত্তাকে প্রান্তিক করতে পারেনি। তাই সারা বাংলায় দুর্গাপুজোর যে ভাব তার যোগ এতে এখনও আছে।
কলকাতার একেবারে কাছের মফস্বল নয়, যাকে আমরা শহরতলী বলি (Immediate Suburb), কিন্তু দূরের গ্রাম্য শহর বা শহুরে গ্রাম (Rurban) ইত্যাদি জায়গায় অর্থনৈতিক বিকাশ যতই হোক, সামাজিক দিক থেকে বিপুল যোগাযোগের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক বিস্তার (Cultural diffusion) হবার দরকার ছিল, তা ততটা হয়নি। আর গ্রামবাংলার কথা তো বাদই দিলাম, সেখানে দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক আচারের পৃথকীকরণ আরও স্পষ্ট। এই উক্তির মাধ্যমে কিন্তু এটা বলা হচ্ছে না যে গ্রামবাংলার লোকজন কলকাতার মতো নিজ সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও বিশ্বজনীন নন, বরং এটি বলা হচ্ছে যে গ্রামবাংলা কলকাতার মতো বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার উপযুক্ত সমারোহ পায়নি।

দুর্গাপুজো নিয়ে গ্রাম, মফস্বল, ছোট শহর, কলকাতা সকলের আবেগ একই। শুধু যে স্থানিক বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক বিবর্তন ও দৈশিক বিস্তারের কথা কিছু পূর্বে উল্লিখিত হল সেই সুযোগ কলকাতা পেয়েছে। তাই ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি যত না দুর্গাপুজোর তার থেকে অনেক বেশি স্থানকেন্দ্রিক দুর্গাপুজোর সমারোহের, এতে অবশ্য আপত্তি বা আশঙ্কার কিছুই নেই। এই বিশেষ সমারোহ ও তার ধরণও সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক বিবর্তন, মেট্রো শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর একত্র আত্তীকরণের ফসল।
এটা তো ভীষণ খাঁটি কথা যে উৎসব করার জন্য, সমারোহ করার জন্য অর্থের দরকার হয়। এমন সমারোহ, এমন আয়োজন যা মানুষজনকে দূরদূরান্ত থেকে টেনে আনতে পারে। সর্বহারাকেও সাময়িক সময়ের জন্য আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে কিছুক্ষণের মানসিক শান্তি দিতে পারে, তা একার্থে সম্পদের সাম্যবণ্টনের ক্ষেত্রে যতই প্রতারণামূলক হোক না কেন । তবু বৈষম্য ইত্যাদির প্রসঙ্গ না হয় এই মুহূর্তে বাদ থাকল। দেখতে পাবেন বহু লোকের হাতে কানাকড়ি না থাকলেও শহরের দুর্গোৎসবের বিপুল আয়োজনের জন্য তার মধ্যে একটা ‘ফিল গুড’ ব্যাপার কাজ করছে, এটা লোকজনের উপর যে কোনো বড়ো অনুষ্ঠানের একটা মানসিক প্রভাব। অন্তত ওইটুকু সময়ের জন্য সে ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া, লাভক্ষতি, ক্ষোভ – অসন্তোষ ভুলে গেছে। না চাইতেও এই যে জোর করে যে ভাললাগার একটা ভাব মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া বা অজান্তেই জনআবেগের বন্যায় ভেসে যাওয়া, তা কিন্তু এই মেট্রো শহরের কলকলানির জন্যই সম্ভব হয়েছে। শহরের ঘিঞ্জি অবস্থানে ব্যক্তি জোর করলেও নিজেকে উৎসব থেকে আলাদা করতে পারে না। এ যেন নিজেকে ক্ষণিক ভুলে থাকা। আনন্দ ও উৎসবের অস্থির চরিত্র কিন্তু কলকাতার দুর্গোৎসব ছাড়া বাংলার অন্য কোনো দুর্গোৎসবে দেখা যায় না।
উৎসবের অস্থির চরিত্র বললাম এই কারণেই যে এই সময়ে ব্যক্তির চারপাশে এত কিছু ঘটে চলে যে সাময়িক ভাবে সে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, তা আনন্দ হলেও। এরপর আরও বেশি ঘটনা অভিজ্ঞতা ব্যক্তির মনে শুধুই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একটা উচ্ছ্বাস আনে কিন্তু তাকে থিতু করে না, মনের পেয়ালা উপচে পানীয় বাইরে পড়ে যায়। যেন ব্যক্তি সবকিছুই দেখছে কিন্তু কিছুই গ্রহণ করছে না। গাদা ট্রাফিকের মধ্যে হতভম্ব হয়ে পড়া যেন, এই যে হতভম্ব জনিত স্থিরতা তা কিন্তু পূর্বের মারাত্মক অস্থির অবস্থার জন্য মনের ‘শাট ডাউন’। এই হলো কলকাতার দুর্গোৎসবের অস্থির চরিত্র, যা গ্রাম বাংলায় পাওয়া যায় না। আর লোকজন যেন এই অস্থির বিষয়ের প্রতিই মুগ্ধ হয়ে পড়েছে, অবাক হয়েছে, হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ঠিক অনেকটা এমন অস্থিরতার আকর্ষণেই বহু লোকজন শহরে থাকতে ভালবাসে, ‘Urban man’ হয়ে ওঠার বাসনা তার বুকে। বিশেষত যুবকেরা, তারা একটা প্রবহমান সময়-ঘটনার দৈশিক (Time-space) অবস্থানে থাকতে চায়। এটা উন্মত্ত হবার একটা নেশার মতো । সাধারণ সময়েই কলকাতার সমারোহের শেষ নেই, আর দুর্গোৎসব নামে পুজো হলে কী হবে! এই সময়ে কলকাতার জনগণ আসলে সামগ্রিক ভাবে যে রকমের আচরণ করতে শুরু করে তাতে কলকাতার বিভিন্ন জায়গাকে হয় কোনো উঠতি গায়কের কনসার্ট স্থল বা আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকার ম্যাচ বা কখনো ব্যাঙ্কক পাটায়ার ট্যুরিস্ট স্পটের মতো মনে হয়, মানে সমারোহ এতটাই উন্মত্ত, একটা গণ হিস্টিরিয়া মতো। এর সাথে কলকাতার প্রতিমা, মন্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা ইত্যাদিকে ঘিরে যে শিল্পরসের জন্ম হয় সেসব তো কারোরই অজানা নয়, সেগুলো একটা আলাদা মাত্রা যোগ করে, লোকে আরো মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আর এসবের সঙ্গে রয়েছে লোকজনের একাত্ম হবার বাসনা, নিজেকে এই উৎসবের অন্তর্গত করা। সাধারণ মানুষের প্রাক্ষোভিক দৈশিক (Emotional space) অবস্থান বদলে যায়, এত সহজে একটা এমন ফুটবল ম্যাচ, ট্যুরিস্ট স্পট বা কনসার্টের অংশ হবার বাসনা কেউই হারাতে চায় না। দুর্গোৎসব তাই বাঙালির কাছে, বলা ভালো কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নাগরিকদের কাছে শুধুই পুজো নয়। ধর্ম, চারুকলা, রসনা, কুটির শিল্প, পর্যটন ও সর্বোপরি মানুষে মানুষে যোগাযোগের এক আধুনিক সংস্করণ।

এই সমারোহ শুধুই শিল্পরসের উত্তেজনা নয়, থিম কেন্দ্রিক কলকাতার পুজো মন্ডপগুলোতে লোকজন এই সমারোহের মধ্যে একটা কল্পলোকের উপাদান পায়। এই কল্পলোকের সঙ্গে নাগরিক দর্শনার্থীরা কখনো সচেতন আবার কখনো অবচেতনে নিজেদের অস্তিত্বকে উপস্থাপিত করে, নিজের সত্তার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। বিপুল আয়োজন, স্বল্প পরিসর স্থানের একাধিক ঘটনাপ্রবাহে দৈশিক অবস্থানের অধিক্রমণ ঘটে যায় (Spatial overlapping of experiences )। একটা হেটরোটোপিয়া (Heterotopia, Foucault 1967), একটি প্রায় অতিরঞ্জিত জায়গা, বি-কল্পলোক (বসু, 2019)। কিন্তু এই হেটরোটোপিয়া যত না বাস্তবিক তার থেকে অনেক বেশি ‘Urban Man’-এর অভিজ্ঞতা নির্ভর, অর্থাৎ সে পুরো ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখছে, সাবজেকটিভ। মানে একটা গ্রামীণ অঞ্চলে অতিরঞ্জিত স্থান তৈরি হলেই এই বিশেষ ধরণের সমারোহ তৈরি হবে না, নগর কেন্দ্রিক মানুষের যোগাযোগের ভাষা এতে অনুপস্থিত রয়ে যাবে। যে ভাষা একজন শহুরে মানুষ শহরের পরিসরে নিত্যদিন বাস করতে গিয়ে তৈরি করেছে, তৈরি করেছে তার বিশেষ রকমের দেখার দৃষ্টি। এখন এই পরিস্থিতি একাধিক মানসিক চিত্রকল্পের সম্মিলিত অবস্থান, যেখানে মানুষ অনুভূতিশীল শুধু কিন্তু তার অনুভূতির বেশিরভাগ কারণই তার অজানা, অধরা, অদৃশ্য, কারণ ওই অবস্থায় সে কারণের উপর দৃষ্টি দেয় না, শুধুই এক অনিয়ন্ত্রিত প্রবহমান ঘটনা ও আবেগের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়। এই আলোড়িত অনুভূতিকে ‘কার্নিভ্যাল স্পিরিট’ বলা যায়, কিন্তু প্রায় সকলের কাছেই এই আবেগ শুধুই দুর্গামূর্তি ও পুজোর নানারকম আচার কেন্দ্রিক নয়, এর পেছনে রয়েছে মনের একাধিক জটিল অবস্থান, আনন্দ ও আবেগের অনুভূতি। আর রয়েছে এই অবস্থায় চারপাশের স্থান ও দৈশিক অবস্থানকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করে তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষেত্রে নগরকেন্দ্রিক মানুষের বিশেষ রকমের ক্ষমতা।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
সূত্র –
Space and Place: The perspective of experience, Tuan, 1977.
The Human Experience of Space and Place, ed. Buttimer and Seamon , 1980
Urban Social Geography, Konx and Pinch , 2010
মিশেল ফুকো : শেষ পর্যায়ের তত্ত্বভাবনা, বসু, 2019
