
১
‘কটা জামা হল?’
এই এক লাইনের প্রশ্নটা কানে এলেই খুশি খুশি ভাব। মনের মধ্যে পুজোর কড়ানাড়া। বয়স যতই বাড়ুক গাঁট গুণে গুণে উত্তর দিতে ভাল্লাগে বেশ। ষষ্ঠীর দিন একটা, সপ্তমীর একটা… পুজোর মেজাজের সঙ্গে মন মিলিয়ে চলে জামার গুণতি।
কিন্তু বুড়ুয়াকে যখন কেউ এই কথা শুধায় তখন সে শুধু পালিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজে। ইস্কুল গেলে আরও বেশি করে। পুজোর ছুটির আগে আগে বেঞ্চে বন্ধুদের সঙ্গে বসে গপ্পো করতেও আর মন লাগে না। মনে হয় এই বুঝি জিজ্ঞাসা করবে কেউ ‘বুড়ুয়া কটা জামা হল তোর’?
পুজো বলে কিছু মনে হয় না বুড়ুয়ার। বরং যেন পুজোটা পার হলে বাঁচে। তখন আর কেউ জিজ্ঞাসা করবে না ‘নতুন জামা কই’?
বুড়ুয়া বাবাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারে না। ঠাকুরানীর ধারে নেশা ভাং করে বসে থাকে বাবা। কাছে গেলে মারে। মাও মারে। মার খেয়ে গায়ে ব্যথা হলে নদীর আড়ায় বসে থাকে। চিল্লেচিল্লে কাঁদে। কেউ খুব একটা পাত্তা দেয় না।
ভরপেট যেদিন খেতে পায় সেদিন ভুলে যায় এসব মার—ধোলাইয়ের কথা। তাদের মাঠে দুগগা ঠাকুর হয়। গাঙ্গের জলে কোনওদিন মেঘের ছায়া পাতলা হয় না। আলপথে মাঝে মাঝে বড়ো বেড়ালের পায়ের ছাপ সে দেখেছে। তাদের জমি ডুবে গেছে নোনা জলে। সেই যেবার খুব ঝড় হল। তারপর থেকে তার আর নতুন জামা নেই। দুগগা পুজোর ঢাক বাজলে মা টিনের বাক্স থেকে অনেক আগের তোলা জামাটা বের করে দেয়। সেই পরে পুজো দেখতে যায়। বুড়ুয়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে অন্যদের। নতুন নতুন গন্ধটা সে চেনে। কিন্তু জানে সে গন্ধে তার অধিকার নয়। মা বলেছে মা দুগগা দিন দিলে বুড়ুয়াও জিনের প্যান্টুলন পরবে। বেলুন কিনবে। লাল রঙের সানগ্লাস চাই তার।
এখন শুধু রাগী মুখের ঠাকরানীর কাছে মনে-মনে বলে তার বাবা আর তাদের নোনা জমি ভাল করে দাও ঠাকুর…।

২
বাঁশঝাড়ের পাশে সেই কোন সকাল থেকে এসে বসে আছে মায়ারানী। রোদ থেকে বাঁচতে হাতের লাঠিটায় মুখ জড়িয়ে উবু হয়ে বসে আছে নাওয়া খাওয়া নেই। কাল রাতে ছেলেগুলো বলে গেছে নাটমন্দির চত্বরে চলে আসতে। কারা নাকি আসবে। পুজোর জামা দেবে। শাড়ি-ধুতিও দেবে। নাম লিখে নিয়ে গেছে লিস্টিতে।
রাতে ঘুম ধরেনি মায়ারানীর চোখে। সক্কাল সক্কাল না গেলে যদি ফুরিয়ে যায়! বাদ পড়ে যায় সে! মোটে দুটো তার থান। সারা বছর সেই দিয়ে চলে। একটা কাচে, একটা পরে। লাল হয়ে যাওয়া কাপড়গুলো তারই মতো। তার আসল বয়স আন্দাজ করা যায় না। ফেঁসে ফেঁসে গেলে সূচ-সুতো দিয়ে নেয়। তার আর মনে নেই কতবার এমন সূচ সুতো দিয়ে রিফু করেছিল সে কাপড়খানা। শুধু মনে হয় লোকের চোখে না পড়লেই হল।
রোদ মাথায় চড়লে ডাক আসে মায়ারানীর। নাম মেলায়, বয়স মেলায়। তারপর হাতে আসে কাপড়খানা। চোখটা আনন্দে চকচক করে ওঠে তার। কতদিন পর এমন মাড় দেওয়া নতুন কাপড়। রংহীন সাদা থান। একটু সরু পাড়ও আছে। কাঁপা কাঁপা হাতের ভিতর একখানা আসল নতুন কাপড়! মা দুর্গার দান…কাপড়খানা মাথায় ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে থাকে…গরিবকে কাপড় দিলে! বেঁচে থাকো বাছারা…
শরৎ আসে। পুজোর আনন্দে বদলে যায় চারপাশে। ম্লান মুখে হাসি ফোটে। মা দুর্গা নাকি সকলকে দিতে দিতে আসেন। কী দেন তিনি আনন্দ আর আনন্দের পাথেয়। কানাকড়ি আর অঙ্কের হিসেবে যারা দড় তারা সারা বছরের মুনাফার খোঁজ পায় উৎসবেই। মন্ডপ, আলো, উচ্ছ্বাস, ভাল খাবো-ভাল পরবোর কোলহল চারপাশে। সেসব থেকে অনেক দূরে টিমটিমে আলোয় আড়ালে থাকে বুড়ুয়া আর মায়ারানীদের মুখ। শহর কলকাতা তাদের চেনে না। কিংবা হয়ত বা চেনে। যখন ভাত আর ভবিষ্যতের দায়ে ছিন্নমূল হয়ে শহরের ফুটপাতে জায়গা করে নেয় ওরা। ক্লান্ত, ঘুম জড়ানো শরীরের পাশ দিয়ে বয়ে চায় উৎসবের জনতা।
তখন কে আর ওদের জিজ্ঞাসা করে,
‘কটা জামা হল’…

৩
বুড়ুয়া আর মায়ারানী কেউ মিথ্যে নয়। বুড়ুয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সুন্দরবনের শ্রীধরপুরে। মায়ারানীর বাস দক্ষিণে লক্ষ্মীকান্তপুর পেরিয়ে আরও দক্ষিণে। এমন এক মহালয়ার সকালে। বন্ধুরা মিলে প্রতিবার নতুন জামা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা থাকে এই সব মানুষগুলোর কাছে। সেই তাগিদেই কখনও সুন্দরবন, কখনও পুরুলিয়া, কখনও মুর্শিদাবাদ বা অন্য কোথাও পৌঁছে যাওয়া।
স্থান বদলায়, ভূ-খন্ড বদলায়, মুখ বদলায়, শুধু বদলায় না মানুষের চোখের ভাষা। নুন ভাত আর মোটা কাপড়ের জীবন চাই, কী অনাবিল আর কাতর চোখে সেই জীবনের সন্ধান করেন এই প্রান্তিক মানুষরা। বান আসে, ঘর ভেসে যায়, ঝড় আসে, নিয়তির মার আসে, হার মানতে নারাজ। পেট ভরা শাক-ভাতের আহ্লাদে ঘরের মেয়েকে ঘরে আনেন ওঁরা। উৎসবকে জয় করে নেন। সহস্র ঝাড়বাতির চকমকে ঝলকানি নেই সেখানে শুধু অবারিত হৃদয়টুকু সম্বল।
