‘তাসের ঘর’-এ সুজাতার সংসার এবং লকডাউনে মেয়েদের ভূমিকা

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় অভিনীত ছবি ‘তাসের ঘর’

সুজাতা৷ রঙিন ছটফটে একটা মেয়ে। কখনও গৃহবধূ। কখনও প্রেমিকা। কখনও গায়িকা। কখনও উদ্ভট। সুজাতার প্রেম রান্নাঘর জুড়ে৷ বাগানের গাছগুলোর ছায়ায়। ছাদে মেলতে দেওয়া জামাদের ভাঁজে। ছবিগুলো এক লাগছে? ভাবছেন, সব মেয়েরা তো এসবই করে। মেয়েদের এসব কাজ “করতে হয়”। কিন্তু সুজাতা একটু আলাদা। কারণ ওর অভিধানে “করতে হয়” নামক কোনো কথা নেই।

আটপৌরে গৃহবধূ হয়েও সুজাতা ভেঙে চুরমার করে দেয় সেই ইমেজ

খুব আনন্দ হলে সুজাতা রান্নাঘরের ইঁদুর তাড়ায়, মনখারাপে ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভেজে। সে আলাদা এখানেই। সে চোখে চোখ দিয়ে কথা বলতে পারে। রাগে গর্জনে ফেটে পড়তে পারে। কলকাতা শহরের ইন্দ্রানী পার্কে থাকে সে৷ দীর্ঘদিন ধরে গৃহ নির্যাতনের শিকার। কিন্তু সেই আক্ষেপ বা কষ্টের কথা সে বলে না। বলে চূড়ান্তভাবে বেঁচে থাকার কথা। ইচ্ছার কথা। যাপনের কথা। আটপৌরে গৃহবধূ হয়েও ভেঙে চুরমার করে দেয় সেই ইমেজ। সে কথা বলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, দর্শককে উদ্দেশ্য করে। যেন তার নিজের গল্প শোনাচ্ছে সবাইকে।

সে কথা বলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, দর্শককে উদ্দেশ্য করে

সম্প্রতি হইচই প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে সুদীপ্ত রায়ের দীর্ঘছবি “তাসের ঘর”। উপস্থিত চরিত্র বলতে তিনটি— সুজাতা, তার স্বামী এবং শয্যাশায়ী শাশুড়ি। অনুপস্থিত চরিত্রও তিনটি— সুজাতার স্বামীর বান্ধবী, তার স্বামী এবং পাশের বাড়ির বাচাল মেয়েটি। সমান্তরালভাবে ছবির ন্যারেটিভ এগোয়। এতকিছুর পরেও এই ছবিটি একমাত্র সুজাতার (অভিনয়েঃ স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়)।

গাছেরাও সুজাতার বন্ধু

নিজের জীবনের গল্প শোনানোর জন্য সুজাতা বেছে নিয়েছে এই বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে। যারা ভিতর ভিতর ভীষণ একা হয়েও নিজেদের মতোন আলাদা জগৎ তৈরি করে নিয়েছে। তাই সংসারের কাজকর্মকে আর জাঁতাকল বলে মনে হয় না। দৈনন্দিন কাজ হয়ে ওঠে একমাত্র বন্ধু। সুজাতার গন্ধ ভালো লাগে। যেকোনো গন্ধ তার নাকে এলে বুঝে নেয়, তা কি উচ্ছ্বাসের নাকি মনখারাপের! সে নিজেই বলছে, “রান্নার প্রতি আমার একটা অন্যরকম টান আছে। সেই ছোট্টবেলা থেকে। রান্নাবান্না ছাড়া, আমার একটা জিনিস খুব টানে— গন্ধ। সবকিছুর মধ্যে গন্ধ পাই আমি। বাড়িতে যখন একা একা থাকি, এ ঘর ও ঘর করি, গান গাই, তখন আমি সবকিছুর মধ্যে একাকিত্বের গন্ধ পাই।”…

আরেকটা জিনিস সুজাতাকে খুব টানে — গন্ধ 

২০২০-তে দাঁড়িয়ে এমন গল্প বলার কারণ খুঁজলে বেরিয়ে আসবে বেশ কয়েকটা তথ্য। এই যেমন লকডাউনে ঘরে ঘরে বেড়েছে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স। মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে হাজার হাজার মেয়ে। এই সমাজ যাদের 'মেয়েমানুষ' কিংবা 'মেয়েছেলে' বানিয়ে রেখেছে, তাদের লড়াইটা আসলে এই ঘরের সঙ্গে বাইরের দ্বন্দ্ব। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সুবিস্তৃত একটা আকাশ। প্রাণের আরাম ওখানেই৷ সবাই সেই আরাম খুঁজে পায় না। হয়তো খুঁজে পাওয়ার অবকাশ থাকে না। এই ছবি পরোক্ষে লকডাউনে মেয়েদের (বলা ভালো গৃহবধূদের) কথা বলে। আরও একটি প্রসঙ্গ এখানে টানা যেতে পারে। “তাসের ঘর” ছবির পোস্টার এবং ট্রেলার রিলিজের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচই শুরু হয়, ছবিতে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের পোশাক নিয়ে। যেখানে দেখা যায়, চরিত্রটির অন্তর্বাস। কেন বাঙালি গৃহবধূর অন্তর্বাস এইভাবে দেখানো হবে, তা নিয়ে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলে। এখন প্রশ্ন হল, আমরা যদি সাম্যবাদের কথাই বলি, তাহলে ছেলেদের সুঠাম জিম করা খালি শরীর দেখালে এই সমাজ বলবে, “কী সুন্দর তাগড়াই শরীর! কী দারুণ ফিটনেস!” আর মেয়েদের জন্য তোলা থাকবে, “ইশ! মাগো! ছিঃ! দুশ্চরিত্রা” জাতীয় কয়েকটি শব্দ। বাবুমশাইরা, কোথায় আপনাদের গলা ফাটানো সাম্যবাদ! সেই তো কেন্দ্রে বারবার চলে আসছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। আসলে এই বিভাজনের রাজনীতি দীর্ঘদিনের। মানুষের ভিতর থেকে শিকড় উপড়াতে গেলে যে মানসিকতার প্রয়োজন, তা ২০২০ সালেও খুব একটা বদলায়নি।

‘তাসের ঘর’-ছবির ট্রেলার 

এই ছবি গোটা বিষয়টিকে পাত্তা না দিয়ে সুজাতাকে উন্মুক্ত করেছে এই সমাজের প্রেক্ষিতে৷ সরাসরি দর্শককে উদ্দেশ্য করে সে বলে আরও কিছু কথা, “গাছ আমার বড়ো প্রিয় জানেন? কারণ ওরা কথা বলতে পারে না। কথা কি, আওয়াজই করে না। আমি ভাবি মাঝে মাঝে, ওদের কি ইচ্ছে করে না, একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে? একে অপরকে বুঝতে? সারাক্ষণ চুপটি করে নিজেদের মধ্যে কী করে কে জানে! আমিও একাই থাকি বাড়িতে বেশিরভাগ সময়। একা মানে, একদম একা।…”

“সরি না, একদম একা নয়। ওই পাশের বাড়ির মেয়েটা আসে মাঝে মাঝে গল্প করতে। কত কথা ওর, বাবা! যারা এত কথা বলে তাদের আমার মোটে পছন্দ হয় না। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওকে একেবারে চুপ করিয়ে দেই। কতবার কতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, ওর সাথে আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না, গল্প করতে ইচ্ছে করছে না, মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছি, কথার উত্তর দিইনি, মুখ ভেঙেওছি, বোঝেই না।…”

“আমি বাবা আমার রান্নাবান্না নিয়ে থাকি। রান্নাবান্না বলতে মনে পড়লো। একদিন একটু সাজুগুজু করতে ইচ্ছে করেছিল বলে নেলপলিশ পরেছিলাম। তারপর আমাদের মেয়েদের যা হয়, একটা হাত হলুদ হয়ে গেল।”

সুজাতা চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়

“আরো একটা কথা, রান্নাঘরে যা ইঁদুর হয়েছে না, ভাবতে পারবেন না। সংসার পেতে বসেছে ওরা।”

“আমার হাসবেন্ডের অবশ্য এসব ভালো লাগে না। ওর যে কী ভাল লাগে, কে জানে? আমাকে যে ভালো লাগে না, এইটুকু জানি। আমার সাথে কথা বলে না। সে একদিক থেকে ভালোই হয়েছে বরং, বেশি কথা বললে আমি আবার বিরক্ত হই। তার চেয়ে এটাই ভালো না? যে যার নিজের মতো থাকি। একই বাড়িতে, এক ছাদের তলায়, কাছে, তা-ও কত দূরে। আমিও কথা বাড়াই না। ও ওর মতোন থাকে, আমি আমার মতোন।”…

ছবির পোস্টার 

সুজাতা চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। স্বস্তিকা প্রসঙ্গে বারবার একটি কথাই চলে আসে, একঘেয়ে চরিত্র। ডিপ্রেশন, মনখারাপ এসবের মধ্যেই তাঁকে ঘুরতে দেখা যায়। আর তাতে তিনি যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় রাখেন। এই চরিত্রটিও ব্যতিক্রম নয়। পরিচালক সুদীপ্ত রায়, এর আগে “কিয়া অ্যান্ড কসমস” নামের একটি ছবি বানিয়েছিলেন। “তাসের ঘরেও” তাঁর স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন। খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছবির চিত্রগ্রহণ। ক্যামেরার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল সুজাতার অভিব্যক্তিকে ধরতে সক্ষম হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর হইচই প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে “তাসের ঘর”।

সুজাতা বলছে, “আমার গাছেরা যেমন থাকে, একা একা, কেউ কারো সাথে কথা বলে না, কেউ কারো ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। তাই না, বলুন?”

এই এত এত কথা কি শুধুমাত্র সুজাতার? আপনাদের মনের কথা নয়? ভাবলে জানাবেন…

Developed by DXDasia