বাংলা ভাষা থেকে আরবি-পারসি শব্দ বাদ দিতে চেয়েছিলেন বিদ্যাসাগরের শিক্ষক

এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি একটি অভিধান সম্পাদনা করেছিলেন

অতীত সব সময় সুখের একথা বলা চলে না। আজকের পশ্চিমবাংলায় রাজনৈতিক হিন্দুত্বের লাইন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি রকমের কদাচার, তাকেও একেবারে নিরালম্ব বায়ুভূত বলে মনে করার কারণ নেই। উনিশ শতকের নবজাগরণ নিয়ে আমাদের যে গরিমার বোধ, তার অনেকটাই সঠিক কিন্তু পুরোটা নয়। সেই ঊষাকালে নতুন আলো যেমন বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক উঠোনে গান করে উঠেছিল – পাশাপাশি ছিল সেই আলোকশিখাকে নির্বাপিত করার সংগঠিত প্রয়াস। যদিও, বাংলার সংস্কৃতির অভ্যন্তরীণ গতি ছিল অগ্রগতির পক্ষেই, সেই আলোকবর্তিকা তাই নিভে তো যায়ইনি, বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রামমোহনের ‘সতীদাহ প্রথা’ রদ করার পেছনে যতটা মহতী সমর্থন, তার থেকে অনেক বেশি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের তীব্র প্রতিবাদ, ব্যক্তি আক্রমণ, স্থিতাবস্থা বজায় রাখবার দুর্মর প্রয়াস। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও এর ব্যতিক্রম নন। বিধবা বিবাহ প্রচলনের প্রস্তাবে কূপমণ্ডূক সমাজপতিরা রে রে করে উঠেছিলেন, তাঁর দিকে ধেয়ে এসেছিল অশীল আক্রমণ, কুৎসা, তাঁকে নিয়ে বাঁধা হয়েছিল বিদ্রুপের গান। এই সবই নাকি হিন্দু ধর্মের শুদ্ধতার স্বার্থে, যা নিয়ে কোনও প্রশ্নের নাকি অধিকার ছিল না। এই সব সমাজপতিরা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছেন, বাংলা মাথায় করে রেখেছে রামমোহন-বিদ্যাসাগরের শিক্ষা।

জয়গোপাল তর্কালঙ্কার ছিলেন এই সময়েরই এক বিদ্বজ্জন। সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিত, ঈশ্বরচন্দ্রের থেকে বয়সে প্রবীণ (১৭৭৫-১৮৪৬) –  বিদ্যাসাগরের শিক্ষক। তাঁর পান্ডিত্য নিয়ে কোনও সংশয়ের অবকাশ নেই, পারিবারিক ভাবেও তিনি এক সুশিক্ষিত বংশের সন্তান – তাঁর বাবা কেবল রামতর্ক পঞ্চাননও ছিলেন সংস্কৃতের দিকপাল পণ্ডিত ; তিনি নিজেই ছিলেন তাঁর পুত্রের প্রথম শিক্ষক। এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু সমস্যা হল , প্রবীণ বয়সে জয়গোপালের মাথায় ঢুকল এক আজব চিন্তা। ষাট বছর পেরিয়ে এসে তাঁর মনে হল, দীর্ঘ ইসলামিক শাসনের ফলে বাংলা ভাষায় প্রচুর আরবি ও পারসি ভাষার শব্দ ঢুকে পড়েছে আর এই বাড়তি শব্দের ভাণ্ডার নাকি বাংলা ভাষার মান ও শুদ্ধতার পক্ষে অন্তরায়! সুতরাং তিনি মেতে উঠলেন এক বিচিত্র কাজে। বাংলা ভাষার প্রচলিত শব্দভাণ্ডার থেকে বেছে বেছে আরবি ও পারসি শব্দ খুঁজে বের করে তিনি সম্পাদনা করতে শুরু করলেন এক অভিধান – ‘পারসীক অভিধান’ । ১৮৩৮-এ শ্রীরামপুর প্রেস থেকে ছেপে বেরোল সেই বই, যাতে স্থান পেল আড়াই হাজারেরও বেশি শব্দ। এই অভিধানের উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট –  ওইসব শব্দগুলিকে ইসলাম প্রভুত্বের ইশারাবহ হিসেবে চিহ্নিত করে আসলে তা বর্জনের আবেদন। আর সেই কথা ঘোষণাও হল। অভিধানের ভূমিকায় জয়গোপাল লিখলেন, “এই ভারতবর্ষে প্রায় নয়শত বৎসর হইল যবনসঞ্চার হওয়াতে তৎসমভিব্যাহারে যাবনিক ভাষা অর্থাৎ পারসি ও আরবি ভাষা এই পুণ্যভূমিতে অধিষ্ঠান করিয়াছে। অনন্তরক্রমে যেমন যবনদের ভারতবর্ষাধিপত্য বৃদ্ধি হইতে লাগিল তেমন রাজকীয় ভাষা বোধে সর্বত্র সমাদর হওয়াতে যাবনিক ভাষার উত্তরোত্তর এমন শ্রীবৃদ্ধি  হইল যে অন্যসকল ভাষাকে পরাস্ত করিয়া আপনি বর্ধিষ্ণু হইল”।  আর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন বলেই তিনি তাঁর উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে জানিয়েও দিলেন ,  তিনি লিখছেন, “………আমি বহু পরিশ্রমে ক্রমে ক্রমে শব্দ সংকলন করিয়া সেই বিদেশীয় ভাষা স্থলে স্বদেশীয় সাধুভাষা পুনঃসংস্থাপন করিবার কারণ এই পারসীক অভিধান সংগ্রহ করিলাম”।

কথাটা হল, এই ঘটনার ঐতিহাসিকতা ও অভিধান সংগ্রাহকের পাণ্ডিত্যকে মেনে নিলেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার নয়। একটা ভাষাকে তার উৎপত্তির নিরিখে দেশি বা বিদেশি বলে চিহ্নিত করাই যায়, কিন্তু যেসব শব্দ সামাজিক রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক কারণে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় ঢুকে পড়ে তার ব্যবহারিক কাঠামোয় জায়গা করে নেয় তাদের উৎসস্থল যাই হোক না কেন,  শপথ নিয়ে কি সেগুলোকে শব্দভাণ্ডার থেকে বাতিল করা যায় ? এটা কি  আদৌ কোনো সুবিবেচনার কাজ ? বস্তুত জয়গোপাল এই কাজটাই করতে চেয়েছিলেন খুব সংগঠিতভাবে। আরো দেখার ব্যাপার, এই বর্জনের দাবিকে সামনে রেখে ভাষার সঙ্গে একটা ধর্মীয়তার যোগ তিনি স্থাপন করে ফেলেছেন সচেতন ভাবেই। কারণ তিনি তাঁর অভিধানের ভূমিকায় এই কথা লিখছেন, “……. ইহাতে মহাশয়েরা বিশেষরূপে জানিতে পারিবেন যে স্বকীয় ভাষার মধ্যে কত বিদেশীয় ভাষা লুক্কায়িত হইয়া চিরকাল বিহার করিতেছে এবং তাঁহারা আর বিদেশীয় ভাষার অপেক্ষা না করিয়াই কেবল স্বদেশীয় ভাষা দ্বারা লিখন পঠন ও কথোপকথনাদি ব্যবহার করিয়া আপ্যায়িত হইবেন এবং স্বকী’য় বস্তু সত্ত্বেও পরকীয় বস্তু ব্যবহার করাতে যে লজ্জা ও গ্লানি তাহা হইতে মুক্ত হইতে পারিবেন।

খেয়াল করা দরকার এই লজ্জা ও গ্লানির প্রসঙ্গ সামনে এনে তিনি একধরনের ধর্মীয় জাত্যাভিমানকে উস্কে দিলেন। বাঙালি সমাজ জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের এই কাজ মেনে নেয়নি,  তাঁর আগ্রাসী চিন্তাভাবনাকে নিক্ষেপ করেছে বাতিলের তালিকায়।

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান বলে, যে ভাষার শব্দভাণ্ডার যত বিচিত্র, সেই ভাষার সমৃদ্ধি তত বেশি। আর এইটাও সত্যি যে, দেশে দেশে কালে কালে শাসকের ভাষা সেই দেশের অন্য ভাষার শব্দভাণ্ডারকে প্রভাবিত করে। ইসলামি শাসকের ভাষা বাংলাকে প্রভাবিত করেছে বলেই ‘কলম’ বা ‘দোকান’ এর মতো শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হয়। পরে ইংরেজ শাসনের ফলশ্রুতিতে ‘অফিস’, ‘স্কুল’ বা ‘স্টেশন’, ‘চেয়ার’, ‘গ্লাস’ এইসব শব্দ ব্যবহারিক বাংলায় প্রয়োগ হয়। একইভাবে পর্তুগিজ শব্দ ‘আলমারি’ ‘আনারস’  আজ বাংলা ভাষারই অঙ্গ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ‘কলম’ এর বদলে ‘লেখনী’ বা ‘দোকান’ এর বদলে ‘বিপণি’ লিখলে ভাষার গ্লানিমুক্তি ঘটবে কিংবা হিন্দু অতীতের পুনর্নির্মাণ ঘটে যাবে । আমরা তো বাংলায় ‘দোকান’ কথাটাই বেশি ব্যবহার করি, আবার ‘বিপণি’ কথাটাও ফেলে দিইনি ; ‘কলম’ এর বদলে ‘পেন’ শব্দটাই ব্যবহার হয় বেশি – তার মানে এই নয় যে আমরা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে কথা বলছি !

তবে,  উচ্চবর্গীয়  হিন্দুভাষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত সংস্কৃত ভাষার উত্তরাধিকারী হিসেবে বাংলাভাষাকে দেখার যে একটা সুদীর্ঘ অভিসন্ধিময় ইতিহাস আছে জয়গোপালের দৃষ্টিভঙ্গি তার সঙ্গেই যায়। গবেষণা প্রমাণ করেছে, এই ধারনা সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত। সংস্কৃত ভাষা মূলত একটি সাহিত্যের ভাষা, তার অপভ্রংশ প্রাকৃত থেকে আজকের বাংলাভাষার উদ্ভব। আর সদা সচল বাংলাভাষা তার ভাঁড়ারে ভরে নিয়েছে নানান ভাষার শব্দ, তাতে ভাষার কোনও মানহানি হয়নি। ভাষাকে তুলনা করা হয় নদীর স্রোতের সঙ্গে, দুপাড়ের পলি সংগ্রহ করতে করতে সে এগিয়ে চলে, ভাষা হিসেবে বাংলা তার ব্যতিক্রম নয়। আর বাংলা কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভাষা কোনও কালে ছিল না।

'পারসীক অভিধান'-এর প্রথম পৃষ্ঠা 

নিজের শিক্ষকের এই কাজকে বিদ্যাসাগর মশাই কখনো ভালো চোখে দেখেননি। তার সবথেকে বড়ো উদাহরণ, নিজের গদ্য ভাষায় তিনি যে শৈলী ব্যবহার করেছেন তাতে কোনো ভাষার শব্দগত গোঁড়ামির এতটুকু ছাপ নেই। তার ভাবনা ছিল বাংলা গদ্য কে এক পোক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো, তার জন্য সমস্ত শব্দ ভাণ্ডারের প্রতিই তিনি মুক্ত মনে হাত পেতেছেন। বাংলা ভাষা তার কাছে ছিল ভাব প্রকাশের এক স্বচ্ছতোয়া নদী, কোনো গোঁড়ামির বদ্ধ জলা নয়।

কিন্তু এমন কেউ কেউ থাকেন, যারা ভাষার সঙ্গে ধর্মের যোগ নিয়ে এমন বিপজ্জনকভাবে মুখর হয়ে ওঠেন, তাদের মেধা ও মনন তখন ধাবিত ভুল বিচারের চোরাবালিতে। প্রাচীন ভারত আর তার তথাকথিত হিন্দুত্বের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয় কোনো ভাষাকে –  সম্পূর্ণ ভুলভাবে বিকৃত ব্যাখ্যায়। আর সেই একমুখী সঙ্কীর্ণ ইতিহাসের ধারা কখনও নিভে যায়নি, শতাব্দী পেরিয়ে তা এগিয়ে এসেছে এই একবিংশ শতকেও। ভুলে যাচ্ছি না, আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মর্যাদা পাওয়ার আগে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী একইভাবে বাংলা শব্দভাণ্ডার থেকে সংস্কৃত উৎসের তৎসম শব্দ বাতিল করে আরবি উর্দু ফারসি শব্দ প্রচলনের এক আজগুবি প্রয়াসে মনোনিবেশ করেছিলেন। সেই সময় কাজী নজরুলের কবিতায় ‘আমরা গড়িব মহা শ্মশান’ বাতিল করে লেখা হয়েছিল ‘আমরা গড়িব গোরস্থান’ ! আবার, বাংলা এই সংকীর্ণতাকে বারবার প্রতিহত করেছে। এটাও ইতিহাসেরই শিক্ষা। 
 

Developed by DXDasia