
সরকার বাড়ির সদর বাড়িতে প্রথম বিদ্যালয় তৈরি করা হয়
(গত পর্বের পর)
রাজবল্লভী মন্দির দর্শন করার পর এবার পৌঁছালাম শীল পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত শীলদের শ্রীধর দামোদর মন্দির ও ঘটকতলায় ঘটক পরিবারের প্রতিষ্ঠিত রাধাকান্তদেব জিউ মন্দিরে। ১৭২৪ সালে শ্রীধর দামোদর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শীল বংশের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী লম্বোদর শীল এই টেরাকোটা মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরটি আটচালা রীতিতে তৈরি, তবে এই আটচালা নির্মাণ রীতির বিশেষত্বের দাবি না রাখলেও এই মন্দিরের অলংকরণগুলি বিশেষত্বের দাবি রাখে। মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। মন্দিরের প্যানেলগুলিতে রামায়ণের যুদ্ধলীলা, জাহাজ-নৌকা, ফুল, লতা-পাতা এবং বিভিন্ন দেবদেবীর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। ‘শ্রীধর দামোদর মন্দির ১৬৪৬ শকাব্দে অর্থাৎ ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত’ বলে একটি ফলকে লেখা আছে। হুগলি ডিস্ট্রিক্ট গেজেটারে বলা হয়েছে – “The Damodar temple of the Silpara locality constructed in 1724 also contains terracotta embellishment”। অতীতে এই মন্দিরটি কালো শ্যাওলা অক্ষত অবস্থায় ছিল, বর্তমানে এর লাল রং পরিবর্তন করা হয়েছে। ‘শ্রীধর দামোদর মন্দিরের মধ্যে শ্রীধর ও দামোদরের শালগ্রাম শিলা আছে। এইগুলি সুন্দর একটি সিংহাসনের মধ্যে রক্ষিত। সিংহাসনের তলায় লেখা আছে:
“গোবিন্দ শীল ঐ কন্যা
ক্ষিরোদমোহিণী দাসী।”
ঘটকতলায় ঘটক পরিবারের রাধাকান্ত মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল ১৭৩৩ সালে। এটিকে জিউ মাতার মন্দির বলা হয়। মন্দিরটি ত্রিখিলানবিশিষ্ট এবং উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট। আটচালা রীতিতে তৈরি এই মন্দিরটি সামনের দিকে দেওয়ালে প্রচুর টেরাকোটার চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। ফলকগুলির মধ্যে আছে দেবতা, রামায়ণের কাহিনি, পশু ও উদ্ভিজ্জধর্মী অলংকরণ বিদ্যমান। এছাড়া বেশ কিছু সামাজিক ছবি চোখে পড়ে, যেমন – জাহাজ-নৌকা, রাজকীয় রথ এবং মিছিলের চিত্র ইত্যাদি। মন্দিরের প্রাঙ্গণে আরও অনেকগুলি দেব-দেউল ছিল, সেগুলো এখন বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর ‘হুগলী জেলার পুরাকীর্তি’ গ্রন্থে লিখেছেন- “দত্ত পরিবারের দামোদর মন্দিরটি ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। এটি পঞ্চরত্ন, সামান্য টেরাকোটা অলংকরণযুক্ত। চক্রবর্তী পরিবার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আটচালা সীতারাম মন্দিরটি ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার ও বহির্ভাগে ‘টেরাকোটা’র কারুকার্য বিশিষ্ট। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কুণ্ডুদের প্রতিষ্ঠিত নারায়ণ মন্দিরটি একরত্ন এবং বহির্ভাগে সামান্য টেরাকোটা অলঙ্করণযুক্ত। এছাড়া সানা পাড়ার শিবমন্দির অষ্টাদশ শতকের নির্মিত। রাজবল্লভী ট্রাস্টের দ্বারা রক্ষিত আরও চারটি আটচালা শিবমন্দির উনিশ শতকের মধ্যভাগে নির্মিত”।

উত্তরপাড়ায় ঘটকতলাতে রাধাকান্ত মন্দির রথ যাত্রার জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। সেখানে ঘটক উপাধিকারী এক ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল এবং তারা খুব বিত্তশালী ছিলেন। এই রথটি তাদেরই পরিবারের ছিল। যেখানে রথের মেলা বসে সেখানে বিদ্যালয় এবং বিদ্যালয়ের মাঠ, সমস্ত জায়গাটি ঘটক বংশীয় পরিবারের ছিল। পরবর্তীকালে তাদের বংশ লোপ পেলে ব্যানার্জী পাড়ায় মণীন্দ্র ব্যানার্জী ওই বাড়ির ভাগ্নে ছিলেন। রথ, বিদ্যালয়ের জায়গা এবং রাধাকান্ত মন্দিরটির উত্তরাধিকারী হন। ব্যানার্জী পরিবার প্রতিদিন রাধাকান্ত মন্দিরে পুজো করেন। গ্রামে বিদ্যালয়ের প্রয়োজন হলে গ্রামবাসীর অনুরোধে মণীন্দ্র ব্যানার্জী জায়গাটি বিদ্যালয়কে দান করেন। খেলার মাঠ দান করেন এবং তিনি রথটিকেও বিদ্যালয়কে দান করে দেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতা থেকে মেদিনীপুর বাড়ি যাবার পথে রাজবলহাট চটিতে (সরাইখানা) এক রাত্রি থাকতেন| তিনি যে অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করতেন সেই অঞ্চলের শিক্ষার উন্নতির কথা ভাবতেন। গ্রামের মানুষদের করুণ অবস্থা দেখে তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সরকার বাড়ির সদর বাড়িতে প্রথম বিদ্যালয় তৈরি হয়। পড়ানোর পাশাপাশি ছাত্র ভর্তি করানো ছিল শিক্ষক মহাশয়দের কাজ। আস্তে আস্তে ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকলো। গ্রামবাসীদের আর্থিক সহযোগিতায় ছিটে বেড়ার প্রাচীর ও বিচালির ছাউনি দিয়ে তৈরি হল নতুন ঘর। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মহেন্দ্র সিংহ রায়। তিনি রাজবলহাট পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টারের কাজ করতেন। বর্তমানে যে গার্লস স্কুলটি আছে, সেটি ছিল নন্দলাল চট্টোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি। এই বাড়িটিতে ক্লাস অষ্টম পর্যন্ত পড়ানো শুরু হল। উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে তৈরি হল উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় তৈরির জন্য ১১ জনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাঁরা হলেন – হরিপ্রসন্ন সরকার, ভূপতি মোহন চ্ক্রবর্তী, অর্জুন ভড়, নারায়ণ চন্দ্র শীল, মন্মথনাথ ভড়, ধুজু ভড়, অষ্টবিহারী দাস, তোফেল আলী, কালীপদ সাহা চৌধুরী, দাসরধী সুর এবং হরেন্দ্রনাথ বটবাল ইত্যাদি।
বিদ্যালয়ের বিল্ডিং তৈরির কাজে ভূপতিমোহন চক্রবর্তী মহাশয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। উনি যে অফিসে চাকরি করতেন, সেখান থেকে ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে এসে বিদ্যালয়ের নকশা তৈরি করেন ইউ প্যাটার্নের। তখনকার দিনে দামোদর নদীতে প্রতি বছর বন্যা হত। তাই বিদ্যালয়ের বারান্দা তৈরি হয় উঁচু করে, যাতে বন্যার জল উপরে উঠতে না পারে। বড়ো বড়ো অশ্বত্থ গাছ শ্রমিকেরা কাটতে ভয় পেল, তখন মন্মথনাথ ভড় মহাশয় একটি রূপার কুঠার তৈরি করে প্রতি গাছে একটি করে চোট দেন তারপর শ্রমিকেরা গাছগুলি কেটে পরিষ্কার করেন। তখনকার দিনে একটি ইটের দাম ছিল ২৫ পয়সা, রাজমিস্ত্রির পারিশ্রমিক ছিল ৩ টাকা। ১৯১৯ সালে বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন রাজবলহাটের রূপকার, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কার ও স্বাধীনতা সংগ্রামী ভূদেব ভট্টাচার্য। স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত থাকার জন্য ভূদেববাবুর বিচার করেন একজন ইংরেজ বিচারক এবং তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন।
রাজবলহাটে বিখ্যাত কবি ছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘বৃত্রসংহার’। বাংলার ১৩৮০ সালে কবির একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করা হয় এই গুলটিয়া গ্রামে। যেটির আবরণ উন্মোচন করেন তৎকালীন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর রমা চৌধুরী। প্রতি বছর কবির জন্মদিন পালন করা হয়। রাজবলহাট গ্রামের উপর দিয়ে যে মূল সড়কটি গেছে, সেই সড়কটি কবির নাম অনুসারে ‘হেমচন্দ্র রোড’ রাখা হয়।
রাজবলহাট গ্রামে একটি বিখ্যাত মিউজিয়াম আছে। ‘অমূল্য প্রত্নশালা’। প্রত্নতত্ত্ববিদ অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের নামানুসারে ‘অমূল্য প্রত্নশালা’ বিদ্যমান। ১৩৪৮ সালে এটি স্থাপিত হয়। শ্রীফকিরচন্দ্র ভড় ও শ্রীজহরলাল ভড় কর্তৃক নির্মিত এই মিউজিয়ামটি তৈরি হয়। ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার এই প্রত্নশালার সম্পাদক ছিলেন। বিচারপতি মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায় এই প্রত্নশালাটি উদ্বোধন করেছিলেন। এই প্রত্নশালাতে প্রাচীনকালের ঐতিহাসিক পুরাবস্তুর জিনিসপত্র রাখা আছে।
হুগলির রাজবলহাটের নাম অনেকেই হয়তো জানেন না। কিন্তু গোটা গ্রাম জুড়ে যে ইতিহাস রচিত হয়ে আছে, তা আজও অমলিন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকতা এসে মিশেছে। কিন্তু ইতিহাসের গা ছমছমে রহস্য আর বিস্তর প্রাণ জুড়নো গল্প আজও আরাম দেয় গ্রামবাসীদের। আর তা বাংলার গর্ব।
(সমাপ্ত)
তথ্যসূত্র-
১। ‘রাজবল্লভী মাহাত্ম্য’ পুস্তক থেকে সংগৃহীত।
২। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, চন্ডীমঙ্গল কাব্য থেকে সংগৃহীত।
৩। হুগলী ডিস্ট্রিক্ট গেজেটার, উৎস সুধীরকুমার মিত্র দ্বিতীয় খণ্ড।
৪। সুধীরকুমার মিত্র, হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ, দ্বিতীয় খন্ড, কলকাতা, পৃষ্ঠা – ৯১৬।
৫। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, হুগলী জেলার পুরাকীর্তি, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, পৃষ্ঠা – ১১৯।
৬। সুধীরকুমার মিত্র, হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ, দ্বিতীয় খন্ড, কলকাতা, পৃষ্ঠা – ৯১৯।
৭। তারাপদ সাঁতরা, পশ্চিমবাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যে মন্দির ও মসজিদ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি, কলকাতা।
৮। কমল চৌধুরী, হুগলী জেলার সেকাল ও একাল, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
৯। কৌশিক পাল চৌধুরী, হুগলী জেলার লৌকিক দেবতা।
১০। প্রণব রায়, বাংলার মন্দির চর্চা, বিবেকানন্দ বুক সেন্টার, কলকাতা।
তথ্যদাতা –
১। সুশীল কুমার ভড় (প্রাক্তন শিক্ষক), গ্রাম + পোস্ট – রাজবলহাট, ব্লক – জাঙ্গীপাড়া, জেলা – হুগলী, পিন – ৭১২৪০৮।
২। সন্টু দে (সাংস্কৃতিক সম্পাদক), গুলটিয়া হেমচন্দ্র স্পোটিং ক্লাব, গ্রাম + পোস্ট – রাজবলহাট, ব্লক – জাঙ্গীপাড়া, জেলা – হুগলী, পিন – ৭১২৪০৮।
৩। নিমাই সাহা চৌধুরী (প্রাক্তন শিক্ষক), গ্রাম+পোস্ট – রাজবলহাট, ব্লক – জাঙ্গীপাড়া, জেলা – হুগলী, পিন – ৭১২৪০৮।
৪। নিশীথ কুমার দে (প্রাক্তন শিক্ষক), গ্রাম+পোস্ট – রাজবলহাট, ব্লক – জাঙ্গীপাড়া, জেলা – হুগলী, পিন – ৭১২৪০৮।
