রাজবল্লভী মন্দির এবং হাট থেকেই কি আজকের রাজবলহাট?

ষোড়শ শতকে ভুরশুটের রাজা রুদ্রনারায়ণ রায় এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন

(গত পর্বের পর)

দামোদর আর রণ নদী বেষ্টিত গ্রাম রাজবলহাট। ত্রয়োদশ শতকে সদানন্দ রায় এই নদী বিধৌত জঙ্গলাকীর্ণ এলাকার বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে রাজপুত্রের উত্থান ঘটান এবং গড়ে তোলেন এক বিশাল হাট। তিনি রাজবল্লভীর স্বপ্নাদেশে মন্দির তৈরি করেন। এই রাজবল্লভীর নাম এবং হাটের নাম যুক্ত হয়ে হয় রাজবল্লভী হাট, পরে তা হয়ে ওঠে রাজবলহাট। ‘রাজবলহাট’ নামটি এসেছে রাজবল্লভী দেবীর নামানুসারে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে রাজবল্লভী দেবীর মন্দিরটি বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে এবং এই মন্দিরে প্রাচীনত্বের কোনো নির্দশন বতর্মানে নেই। মন্দিরের পাশেই একটি নাটমন্দির আছে। ষোড়শ শতকে ভুরশুটের রাজা রুদ্রনারায়ণ রায় এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। 

রাজবল্লভী দেবীর মূর্তি অদ্ভূত এবং মাটির মূর্তি। গঙ্গা মাটি দিয়ে তৈরি এই মূর্তি। প্রায় ছয় ফুট উচ্চতায় রাজবল্লভী দেবীর মূর্তিটি সাদা রঙের। বাম পায়ে বসে বিরুপাক্ষ শিবের উপর এবং ডান পা বিশ্রাম মহাকাল ভৈরবের বুকে। বাম হাতের তালুতে আছে একটি সিঁদুরের পাত্র আর ডান হাতে দেখা যাচ্ছে ছুরিকা। কোমরে ছোটো ছোটো কাটা হাতের মালা। গলায় ঘণ্টার মালা। বিভিন্ন শহর ও গ্রাম থেকে আসা ভক্তরা দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজবলহাটে মিলিত হয়। সকাল সাতটায় মন্দিরের দরজা খোলে। এগারোটায় পুজো শুরু হয়ে দুপুর দুটোয় ভোগ নিবেদন করা হয়। সাতটায় হয় সন্ধ্যারতি। 

মন্দির থেকে কিছু দূরে রাজবল্লভী মাতার বিরাট দীঘি বা পুকুর আছে। নাম ‘রাজবল্লভী দীঘি’। ভুরশুটের রাজা সদানন্দ রায় এই দীঘি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুধীরকুমার মিত্র তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন – “১৩৪০ সালের ১১ ই আষাঢ় শ্রীফকিরচন্দ্র, মন্মথনাথ ও জহরলাল ভড় মন্দির ভেঙে যাওয়ার পর বহু টাকায় মন্দিরের আমূল সংস্কার করে দেন। ১৩৪৬ সালে তারা পুনরায় মন্দিরের কাছে বিরাট নাটমন্দির নির্মাণ এবং নহবতখানা, গড়, মায়ের পুকুরের ঘাট, মন্দির সংলগ্ন চারটি শিবমন্দির তৈরি করে দেন। দেবী রাজবল্লভী চণ্ডীরই রূপান্তর বলে মনে হয়। ‘পীঠনির্ণয়’ গ্রন্থে রাজবলহাটকে শাক্তপীঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং পিঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম ‘চণ্ডী’ বলে উক্ত হয়েছে। চণ্ডী প্রাচীনকালে অনার্য দেবী ছিলেন, পরে আর্য ও অনার্যের দীর্ঘ সংঘাতের ফলে তিনি লোকসমাজের পূজা হয়েছেন”। ‘রাজবল্লভী মাহাত্ম্য’ নামে পুস্তকে দেবীর যে বর্ণনা আছে, তা হল :

“মন্দিরে শোভিছে মাতা শ্রীরাজবল্লভী
শরৎ জোৎস্না প্রভা বিশালা ভৈরবী।
বিল্বমালা গলেছুরি ধরে ডান হাতে
প্রসারিত বাম হস্তে পাত্র শোভে তাতে।
রণরঙ্গিনীর মূতি-ভীমা সুনয়না
বরাভয় প্রদায়িনী, প্রসন্ন আননা।
উজ্জ্বল মুকুট শিরে ত্রিলোক জননী।”

কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে রাজবল্লভী সম্বন্ধে লিখেছেন :
“রাজবোল বন্দি রাজবল্লভীর চরণ।
ইলিপুরে রঙ্গিনী বন্দো হয়ে একমন।।”

রাজবলহাট গ্রামে একটি বিখ্যাত প্রাচীন প্রবাদ আছে। প্রবাদটি হল – “চার চক, চৌদ্দ পাড়া, তিন ঘাট, এই নিয়ে হয় রাজবলহাট”। কথাটির অর্থ হল, চার চক বলতে দফর চক, সুখর চক, বৃন্দাবন চক আর বদুর চক অর্থাৎ চারটি ক্রসিং ; চৌদ্দ পাড়া বলতে নন্দী পাড়া, দে পাড়া, মনসাতলা, শীলবাটি, ভড়পাড়া, উত্তরপাড়া, দিঘিরঘাট, কুমোর পাড়া, বাড়ুজ্যে পাড়া, দাস পাড়া, কুঁড় পাড়া, নস্করডাঙ্গা, সানা পাড়া ও পান পাড়া অর্থাৎ চৌদ্দটি স্থানীয় অঞ্চল ; তিন ঘাট বলতে দিঘির ঘাট, মায়ের ঘাট ও বাবুর ঘাট অর্থাৎ তিনটি স্নানের অঞ্চল।
(চলবে…) 

Developed by DXDasia