নিজে হাতে বাজার না করলে কবিতা লিখবার তাগিদ পেতেন না নীরেন্দ্রনাথ

মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে বাজার

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি নিজে হাতে রোজ বাজার করেন আর ওইভাবে ছুঁয়ে ছেনে বাজার না করলে তিনি কবিতা লিখবার তাগিদ পান না। আপাতভাবে কবিতা লেখার সঙ্গে বাজার করার এই যোগাযোগের মধ্যে সাধারণ পাঠক কোনও ভাবনার উপাদান খুঁজে পাবেন কি না জানি না। কিন্তু, এই কথার একটা অন্য অর্থ আছে। 

সেই গূঢ় অর্থের নাগাল পেতে গেলে বাজার কথাটাকে একটু অন্য ভাবে দেখতে হবে। গত বিশ পঁচিশ বছরে আমাদের দৈনন্দিনের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শৌখিন পোশাক-আশাক হয়ে ফিল্ম দেখা অবধি সব ক্ষেত্রেই বৃহদাকার বাজার একটা ফেনোমেনন। অন্তত, একটা সম্পন্ন শ্রেণির হাতে বেশ কিছুটা অর্থ আসায় তাঁরা পাঁচফোড়ন কেনার জন্য শপিং মলে ছুটে বেড়ান কিংবা একজোড়া হাওয়াই চটি কিংবা অন্তর্বাস কিনতে হলেও অনলাইন শপিং অ্যাপের শরণাপন্ন হন। আর যেহেতু পাড়ায় পাড়ায় সিনেমা হলগুলির পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটে গেছে বিগত কয়েক দশকে, ফলে, ইদানীং পছন্দের ফিল্ম দেখতে গেলেও ঝাঁ-চকচকে মাল্টিপ্লেক্সের আসন বিনে গতি নেই। সেখানে টিকিটের দাম চড়া, চলচ্চিত্র দেখার অনুষঙ্গ মহার্ঘ্য মুচমুচে আলু ভাজা কিংবা সাদা জুঁইফুলের মতো পপকর্ন যে দামে বিকোয়, অসংগঠিত শ্রম ক্ষেত্রে অনেকের দৈনিক মজুরি তার থেকে কম। গোদা কথায় একটা প্রকাণ্ড অসাম্য, একটা ব্যবধানের দিকে আমাদের চোখ ফিরিয়ে তাকার উপায় নেই।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নিজে হাতে রোজ বাজার করেন আর ওইভাবে ছুঁয়ে ছেনে বাজার না করলে তিনি কবিতা লিখবার তাগিদ পান না। আপাতভাবে কবিতা লেখার সঙ্গে বাজার করার এই যোগাযোগের মধ্যে সাধারণ পাঠক কোনও ভাবনার উপাদান খুঁজে পাবেন কি না জানি না।

সেইসব বাজারে যারা আমরা কেনাকাটা করতে যাই এবং যারা এগিয়ে এসে সেইসব কেনাকাটায় সহায়তা করে থাকেন, যারা সেখানকার কর্মী বা সহায়ক তাদের মধ্যেও এক প্রকাণ্ড ব্যবধান, যা তাদের সঙ্গে একটু না মিশলে ঠাহর করা মুশকিল। একটি নামি রিটেল চেনের এক মহা-বিপণিতে একবার আলাপ হয়েছিল এক দ্বার রক্ষীর সঙ্গে – সুদূর বীরভূমের মল্লারপুরের ছেলে, সিকিউরিটির কেতাদুরস্ত পোশাক পরে স্টোরে দাঁড়িয়ে থাকেন আট ঘণ্টারও বেশি, বেতন পান অতি সামান্য – বেলঘরিয়ার একটি মেসে কোনোক্রমে থাকেন, প্রতিদিন মুড়ি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে টিফিন করলে বাড়িতে পাঠানোর মতো হাতে কিছু থাকে না। সমস্যাটা হল ওই প্রকাণ্ড শপিং মলের আনাচে কানাচে এরকম যে মানুষদের অবস্থান, তাদের সচরাচর নাগাল পাওয়া যায় না। কেননা, এই বাজারে আসলে বিক্রেতা কে, তাঁকে আমরা কেউ চিনি না, পরিবর্তে এরাই দাঁড়িয়ে থাকেন কাউন্টারে কাউন্টারে, থরে থরে সাজানো সামগ্রী বোঝাই র্যা কের সামনে, যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত ক্যাশ কাউন্টারে।

প্রতিদিনের আলু পটলের বাজারে এই দেখাশোনার আদলটা একেবারেই ভিন্ন। সেখানে যিনি বাজারে বসেন তিনিই বিক্রেতা, তার জিনিস হাতে ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা যায়, দর করা যায়, তার আনাজের ভালো মন্দ নিয়ে কথা বলা যায়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে যে বাজার, সম্ভবত সেটাই কোনো কবির কবিতা লেখার প্রণোদনা হয়ে ওঠে। হয়তো কবি নীরেন্দ্রনাথ পরোক্ষে সেই কথাই বলতে চেয়েছিলেন সেদিন।

এরই সমান্তরালে একটু খেয়াল করে দেখা যায়, গত বিশ-তিরিশ বছরে শহর কলকাতা ও তার সংলগ্ন শহরতলির বাজারগুলির এক রকমের বিবর্তনের কথা, যা হয়তো বা কোনও সন্ধানী সমাজ গবেষকের কৌতূহলের বিষয় হতে পারে অনায়াসে। শহর ও শহরতলিতে নতুন নতুন উপনিবেশ তৈরির মাধ্যমে জনবসতির বিন্যাসের যে রকমফের ঘটেছে, বাজারের বিন্যাসের সঙ্গে তার একটা অনায়াস সংগতি থেকে গেছে কোথাও। একটু খেয়াল করে দেখলে দেখা যাবে আগে পুরসভা বা পৌরসভা এলাকায় সরকারিভাবে নির্ধারিত এলাকা ছিল বাজারের জন্য নির্দিষ্ট। সমস্ত পুরসভা বা পৌর সংস্থার কিছু অনুমোদিত বাজার ছিল, যা মূলত একটা ঘেরা এলাকায়। কিন্তু জনবসতির চাপ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্র থেকে বাজার সরে আসতে লাগল পরিধির দিকে।

গত বিশ-তিরিশ বছরে শহর কলকাতা ও তার সংলগ্ন শহরতলির বাজারগুলির এক রকমের বিবর্তনের কথা, যা হয়তো বা কোনও সন্ধানী সমাজ গবেষকের কৌতূহলের বিষয় হতে পারে অনায়াসে।

খতিয়ান নিলে দেখা যাবে, ওইসব সুনির্দিষ্ট বাজার বৃত্তের বাইরে এরকম অজস্র গোত্রহীন বাজার গড়ে উঠেছে আমাদের চেনা পথঘাটের আশেপাশে। স্থানবিশেষে, আয়তন বিশেষে এমনকি সময় বিশেষে তার চেহারা আলাদা আলাদা। শহরতলির প্রতিটি রেল স্টেশনের লাগোয়া গড়ে উঠেছে বাজার, কলকাতার উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণের প্রান্তসীমায় বাস স্টপে নেমে এলাকার মানুষ যে পথ ধরে মূল বাস রাস্তা থেকে পাড়ার মধ্যে ঢুকে পড়তে থাকেন, চলাচলের সেই পথের দু’ধারে বাজারের উপস্থিতি আমাদের চেনা ছবি। বেহালা থেকে বরানগর, বাগুইহাটি থেকে গড়িয়া, শিবপুর থেকে সালকিয়া – এই একই দৃশ্য ঘুরে ফিরে আসে আমাদের চোখের ওপর। এমনকি সকালে যেখানে বাজার বসে, বিকেলে সেই বাজারই চলে আসে বড়ো রাস্তা বা রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের ওপর – কেননা অফিস ফেরত নিত্যযাত্রীদের পক্ষে সেইটাই সুবিধেজনক। বাজারের এ-ও এক নিয়ম। বিক্রেতারা সেটা বুঝে গেছেন বলেই সরকারি বাজারের নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে তাঁরা পসরা সাজিয়ে বসছেন চলাচলের পথের ওপর। প্রয়োজনের এই তাগিদ থেকে এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক মাতব্বর বা স্থানীয় থানার বড়োবাবুকে এই বাবদ প্রণামী দিতেও তাঁরা পিছপা নন।

হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশনের মুখে যে বিপুল ও বিস্তারিত বাজার, হাওড়ার ক্ষেত্রে যা ছড়িয়ে আছে হাওড়া ব্রিজ ও স্টেশনের সাবওয়ে জুড়ে, তার পেছনে এইরকম অনেকগুলো সম্মিলিত স্বার্থের সংযোগ আছে বলেই তা আজও স্থায়ী, যাতে ক্রেতা বিক্রেতা নেতা পুলিশ কারোরই লোকসান নেই। একইভাবে চোখের ওপর দেখেছি চক্র রেল ও লঞ্চ পরিষেবা চালু হওয়ার পর থেকে হাজারো নিত্যযাত্রীদের সুবিধায় গিরিশ মঞ্চের সামনে বাগবাজার স্ট্রিটের ওপর সারি সারি কাঁচা আনাজ ও মাছের দোকানি বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই দোকান সাজিয়ে বসেন। বালি হল্ট স্টেশন চালু হওয়ার পরে সেখান থেকে নেমে মেন ও কর্ড লাইনের বালি স্টেশন সংযোগকারী রাস্তার ওপর দু’ধারে বাজার চালু হয়ে গেল। দমদম রোডের ওপর দমদম মেট্রো স্টেশন ও রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে প্রকাণ্ড ও বিচিত্র বাজার যা দমদম রোড বরাবর এগিয়ে গেছে নাগের বাজারের দিকে। খুঁজলে এমন উদাহরণ আরো অনেক অনেক মিলবে।

হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশনের মুখে যে বিপুল ও বিস্তারিত বাজার, হাওড়ার ক্ষেত্রে যা ছড়িয়ে আছে হাওড়া ব্রিজ ও স্টেশনের সাবওয়ে জুড়ে, তার পেছনে এইরকম অনেকগুলো সম্মিলিত স্বার্থের সংযোগ আছে বলেই তা আজও স্থায়ী, যাতে ক্রেতা বিক্রেতা নেতা পুলিশ কারোরই লোকসান নেই।

আর বিস্ময়ের কথা হল, ওই সেই প্রকান্ড বিপণির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোটো ছোটো মানুষগুলোর মতো এই ব্যাপ্ত বাজারের অগুনতি ক্রেতা বিক্রেতার ভিতর লুকিয়ে থাকে অন্য এক জীবনের গল্প। সে জীবন আমাদের প্রতিদিনের আলোকিত জীবন নয়, সে আসলে এক অবতল ‘বাতুন’ জীবনের আলো আঁধার। সেখানে খোঁজ পেয়ে যাই এমন এক মানুষের, যিনি রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের ওপর বাজার বিছিয়েই কাটিয়ে দিলেন তার এক জীবন, তারই ভিতর দিয়ে তাঁকে সাহায্য করতে আসা তার বড়ো ছেলেটি আরো বড়ো হয়ে যায়, তখন সেও আবার শরিক হয়ে যায় অন্য এক বাজারের। দূর ক্যানিং থেকে ডাঁটো ডাঁটো কাঁকড়া নিয়ে বরানগরের বাজারে বেচতে আসে কেউ কেউ। ডোমজুড় থেকে আসে পাখির মতো বক ফুল, সন্ধের নিত্যযাত্রীদের ব্যাগে পরম যত্নে ঢুকে যায় সেগুলি। আসে সজনে ফুলের ঝুড়ি, খেতের প্রথম শিশির ভেজা ফুল কপি, কচি পটল, নটে শাকের সতেজ আঁটি – প্রতিদিনের চলাচলের পথে তৈরি হতে থাকে কত রকমের সম্পর্ক, কত রকম লেনদেন, কত বিচিত্র সংযোগ। আমাদের বড্ড বেশি সোচ্চার বেঁচে থাকার পাশে এও সব নানান জলছবি। এইসব নিয়ে কবিতা লেখা হবে না তো কী নিয়ে হবে?

Developed by DXDasia