শৈশবের নস্টালজিয়া নিয়ে সাবালক হচ্ছে মফস্‌সল

প্রতিটি মফস্‌সলেরই আছে এক সাধারণ চেহারা

বছর চল্লিশেক আগে শহর কলকাতা থেকে বিশ-বাইশ কিলোমিটার দূরের যে মফস্‌সলে আমাদের বেড়ে ওঠা, তার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল উদ্বাস্তু উপনিবেশ। অন্য অংশে, তুলনায় কিছু আদি বাসিন্দাদের বসবাস। গড়পড়তা মফস্‌সলে যেমন হয়, তেমনই এলাকার রেলস্টেশন থেকে শিরদাঁড়ার মতো একটা রাস্তা ক্রমশ চলে গেছে সেই জনপদের গহনে। রেলস্টেশনের গা-ঘেঁষে জিটি রোড, অন্যদিকে একটু এগোলেই গঙ্গার ঘাট, মস্ত পাইকারি বাজার। কাকভোর থেকেই লোকাল ট্রেনের সূত্রে চালু হয়ে যায় রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ, আবার প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত লাস্ট ট্রেন ধরে মানুষজনের বাড়ি ফেরা। অধুনালুপ্ত কলকাতা স্টেট ট্রান্সপোর্ট বা ট্রাম কোম্পানির অথবা রেলের কোনো কোনো কর্মী ভোরের প্রথম ট্রেনে ডিউটি বেরোতেন। প্রাতঃকালীন এই জীবিকা অভিযানে তাদের কারোর গলায় ভেসে আসত ‘ভজ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গ’ র ভক্তিভেজা সুর, কখনও বা সেই সময়ের এক দাপুটে বালক-বাবার বীজমন্ত্র: ‘রাম নারায়ণ রাম’। বিছানায় শুয়ে আধো ঘুমে আধো জাগরণে কানে আসত এইসব নিরালা সকালের স্বরলিপি। আমাদেরই পাড়ায় ছিলেন এক আধখ্যাপা রসিক মানুষ, যিনি মাঝে মাঝে ভোরবেলা পথে বেরোতেন চণ্ডীপাঠ করতে করতে। তবে এইসব টুকরো টুকরো স্মৃতির বাইরে নিস্তরঙ্গ মফস্সল। রাজধানী কলকাতা থেকে খুব বেশি দূর না হলেও শহুরে জীবনের বহুকৌণিক মাত্রা ও বিভঙ্গ থেকে নিরাপদে সরে থাকা মফস্সল যেন ওইটুকুতে নিজেকে চিনিয়ে রাখতে পরিতৃপ্ত। তাই খুব বেশি কিছু ঘটে না সেখানে। যেন তেমন কিছু ঘটারও নেই। সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে দুর্গাপুজো আর পুজোকেন্দ্রিক জলসার বাইরে দু-একটা গানের স্কুল, তাদের মাঝারি মাপের একটা বাৎসরিক অনুষ্ঠান। আর এখানে ওখানে প্রৌঢ় আর বয়স্কদের তাসের আসর, একটা শৌখিন যাত্রাদল। পাড়ার খোলা মাঠগুলোয় গ্রীষ্মে-বর্ষায় এলোমেলো ফুটবল পেটানো, শীতের মিঠে রোদে সেখানেই ক্যাম্বিস বলে জমে ওঠা পাড়ার ক্রিকেট – যেখানে চৌকা বা ছক্কা মারার অবাধ স্বাধীনতা থাকলেও পাশের পুকুরে বল পড়ে গেলে ব্যাটসম্যানকে আউট করে দেওয়াটাই একরকম নিয়ম। 

গত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি আমরা যখন সেই মফস্সল ছেড়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় পাড়ি জমাব বলে মনস্থির করে ফেলেছি, তখনই ঘটল ঘটনাটা। রেলস্টেশনের গা ছুঁয়ে এলাকার ভিতরে সেঁধিয়ে যাওয়া পিচরাস্তার পাশে স্টেশনের অনতিদূরে একটা পোড়ো বাড়ি আর তার সংলগ্ন একটা মজা ডোবা বুজিয়ে একটা ফ্ল্যাট বাড়ির স্পর্ধিত শিলান্যাস। মফস্‌সলের জীবনে সে এক মস্ত আলোড়ন-তোলা ইভেন্ট। তার একটু আগেই জিটি রোড লাগোয়া সিনেমাহলের বিপরীতে একটুকরো পড়ে থাকা জমি ঘিরে তৈরি হয়েছে এক দোতলা বিপণি, যার ডাক নাম সুপারমার্কেট। বাজারের ওপরে সুপারমার্কেট বলে যে একটা কিছু থাকতে পারে, এই ব্যাকরণের সঙ্গে তখন আমাদের সদ্য যোগাযোগ। আসলে এই সেই সময়, যখন দেশের অর্থনীতি খোলনলচে পাল্টে বিশ্বায়নের অভিমুখে দ্রুত ধাবমান। চারপাশ জুড়েই তখন কেবল সংস্কার আর বদলের বার্তা আর সেই কালের যাত্রার ধ্বনি এসে আছড়ে পড়ল এঁদো মফস্‌সলে। জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক। সুতরাং সাবেকি ‘অন্নপূর্ণা বস্ত্রালয়’ বা ‘নিস্তারিণী ভাণ্ডার’ দেখতে দেখতে বদলে গেল ‘ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড’ বা ‘টিট বিটস’ নামের আড়ালে। ওষুধের দোকানগুলিও রাতারাতি পলিক্লিনিকে ঘোষণায় মুখর, ইতিউতি ডায়গনিস্টিক সেন্টারের মোহিনী বিজ্ঞাপন, নিত্যনতুন প্রসাধন সামগ্রীতে ঝকঝকে হয়ে উপচে উঠল এতদিনের চেনা বোরোলিন বা স্নো-পাউডার-বেচা দোকানগুলো।

সন্ধানী সমাজতাত্ত্বিকরা যদি একটু খোঁজ তাল্লাশ করেন তাহলে দেখতে পাবেন এই বদলের গল্প কোনও বিশেষ মফস্‌সলকে পেরিয়ে দিব্যি বসিয়ে দেওয়া যায় নির্বিশেষ মফস্‌সলের কাঠামোয়। কারণ প্রতিটি মফস্‌সলেরই আছে এক সাধারণ চেহারা। রেলস্টেশন বা বড়ো রাস্তার ওপর বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হয় তার সদর ঘর, সেটাকে ঘিরে দোকান-বাজার, ব্যাংক, স্কুল, সিনেমাহল। সেই জমজমাট অস্তিত্বটুকু পেরিয়েই একটু খোলা মাঠ, পাড় বাঁধানো শান্ত পুকুর, ইটে-ছাওয়া গলিপথ, কোথাও ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাওয়া এক টুকরো জমি, বাঁশঝাড়। মফস্‌সলের অন্দরমহল। পাড়ায় পাড়ায় পাকা দালানের পুজোমণ্ডপ, তারই একাংশে ক্লাবের একটি পরিচ্ছন্ন ঘর, মস্ত ক্যারামবোর্ডের সঙ্গেই চোখে পড়ে যায় আয়তাকার টিভি সেট, পাড়ার মোড়ে মোড়ে গজিয়ে ওঠা শনিবার সন্ধের ভক্ত সমাগমে টইটুম্বুর শনিমন্দির। 

পেরিয়ে আসা যাক আরো পনেরো বছরের সময়কাল। নতুন শতকের নতুন দশকে আমাদের শৈশবের কৈশোরের মফস্‌সল আরো একটু সাবালক, তার গায়ে আরো বৈভবের খোদাই চিহ্ন । জনপদের আনাচে-কানাচে এখন স্পর্ধিত বহুতলের ঝিলিক, পুকুরের চিহ্ন লুপ্তপ্রায়, একই ভাবে পোড়োবাড়িগুলোও উধাও – যেগুলি টিকে আছে আসলে তাদের ঘিরে শরিকি বিবাদ আর তাই সেগুলি আইনি জটিলতায় বিশ বাঁও জলে। নতুন বাড়িগুলিতে দেখনদারির ছোঁয়াচ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি দু-একটি বেসরকারি ব্যাংক, তাদের এটিএম । জিটি রোডের ওপর মোবাইল ও কম্পিউটারের শোরুম । হতশ্রী রেডিও বা টিভি সারাইয়ের দোকানগুলি উঠে গিয়ে বা হাত বদলে সেখানে রকমারি ইলেক্ট্রনিক জিনিসের মারকাটারি দোকান। আদিকালের ষাট ওয়াটের হলদে আলোয় ঢাকা হতকুচ্ছিত  লেটার প্রেসগুলির বদলে ছিমছাম ডিটিপি সেন্টার, সঙ্গে জেরক্স বা তারই মধ্যে প্লাইউডের আড়ালে তৈরি হওয়া সাইবার কাফে। বদলে গেছে সাবেকি চপ-কাটলেটের রেস্টুরেন্টগুলো যেখানে বরাদ্দ থাকত মলিন পর্দাঘেরা দু-চারটে একান্তে বসবার কেবিন – সেগুলি এই পাল্টানোর হাওয়ায় উড়াল দিয়েছে গাঢ় রঙের কাচঢাকা ঝিম-ধরানো মৃদু আলোর বাহারি ইটিং হাউসে, যেখানে চপ-কাটলেটের জায়গা নিয়েছে রসনা তৃপ্তির নতুন ধরন চাইনিজ বা বিরিয়ানি-জমানা। আর এইসব কিছুর পাশে একটি বিদেশি সুরা-বিপণির সলাজ কানাকানি এবং সেখানে লক্ষণীয় জনসমাগম। বদলে যাচ্ছে মফস্‌সল।

আবারও বলি এই বদল বিশেষ নয়, নির্বিশেষ—যার গড়পড়তা আদল প্রায় একইরকম। তবু নেতি-ইতির বিতর্ক পেছনে ফেলে রেখে বলতে হয় গত কয়েক বছরে এই বিবর্ণ মফস্‌সলগুলি তুলনায় একটু রঙিন হয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের ভাঙা বাল্বের জায়গায় নতুন আলো, ছোটো ছোটো পার্ক, কিছু অঙ্গসজ্জা। তবু পরিকল্পনাহীন জনবিস্ফোরণে পয়ঃপ্রণালীগুলি ক্রমশ অগভীর, যার পরিণতিতে অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটুজল। কিন্তু কথাটা হল, এসব নিয়ে সাধারণ নাগরিকের কোনো হেলদোল নেই  বরং তাঁরা বৃহত্তর পৃথিবীর কঠিনতর সংকটের ভাবনায় উন্মনা অথবা নিছকই টিভি সিরিয়াল বা আইপিএল-এর বিনোদনে মাতোয়ারা। অথচ কী আশ্চর্য, এই কয়েক বছরের যে কোনো মফস্সল ঘিরে সুসজ্জিত দোকানবাজারের পাশাপাশি হকার্স কর্নারগুলির এলোমেলো বিস্তার। রাস্তার দু’ধারে তাদের অঘোষিত সাম্রাজ্যে ক্রেতার অভাব নেই। হলফ করে বলা যায়, এই হকার্স স্টলগুলিতে বেশ কিছু বিক্রেতা আছেন যারা একদা যুক্ত ছিলেন এইসব মফস্‌সলেরই আশেপাশে কোনও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানায়। নেতা ও নীতিকারদের বেখেয়ালি বাতেলায় আস্থা হারিয়ে তাঁরা জড়ো হয়েছেন এইরকম জীবিকার নীচে। মফস্‌সলের অর্থনীতি এদের বাদ দিয়ে হতে পারে না। এদের জীবনের গল্পও ধরা আছে এইসব বদলে বদলে যাওয়া জনপদের অলিতে গলিতে। শুধু বদলে যাওয়া মফস্সল যেন-বা কিছুটা উদাসীন হয়ে মুখ ঘুরিয়েছে ভিন্নদিকে। বদলে যাচ্ছে মফস্‌সল।

Developed by DXDasia