
টেনিদা বা ঘনাদার মতো চরিত্ররা এক বিশেষ সময়ের সন্তান
লেখালিখির সঙ্গে অবশিষ্ট সমাজ-অর্থনীতির যে কিছু কিঞ্চিৎ যোগসূত্র থাকে, অনেকে গায়ের জোরে তাকে অস্বীকার করতে চান – কিন্তু সেটা খুব সমীচীন প্রয়াস বলে মনে হয় না। এই কথা নয় যে যারা লেখালেখি করবেন, তাঁরা সবটাই বাইরের দিকে তাকিয়ে করবেন। ভিতরের তাগিদ তো অবশ্যই গ্রাহ্য উপাদান – পাশাপাশি তার সমকালীন বাস্তব, তাও অগ্রাহ্য করার মতো ব্যাপার নয়। এ নিয়ে তর্কাতর্কি হয়েছে প্রচুর, তবে তার সারটুকু এই যে – শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভিতর আর বাইরের একটা সামঞ্জস্য দরকার। অন্তত যে মাটিতে লেখক বেঁচে আছেন, সেই মাটিতে দাঁড়িয়েই তার লেখালিখি – এই প্রবণতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে শুধু নয়, তার ভিতর থেকে তৈরি হয়েছে অনেক মনে রাখার মতো লেখাপত্র। চট করে আমাদের মনে পড়ে যাবে মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক হানাহানি ও দেশভাগ নিয়ে বাংলার সাহিত্যিকদের অনবদ্য সব সৃষ্টির কথা। এমনকি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রকৃতিভাবুক লেখকও নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারবেন না এই বাইরের দুনিয়ার প্রবল অভিঘাত থেকে। তারাশঙ্করের লেখায় এইভাবেই পেয়ে যাব গ্রামপতনের অনুপুঙ্খ ছবি। সতীনাথের লেখায় আসবে প্রান্তীয় মানুষের জীবনধারণের আখ্যান।
আবার ধরা যাক, পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কলকাতা শহরের কথা। সদ্য স্বাধীন দেশের সোনালি স্বপ্ন যে খুব উজ্জ্বল হয়ে জাগরূক ছিল সেই সময়ে এমন নয়। ফলে পাড়ায় পাড়ায় বেকার যুবকের দল, পাড়ার রক ঘিরে গুলতানির মরসুম – যে বেকার বাউন্ডুলেদের নিয়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখবেন তাঁর বহুখ্যাত কবিতা। তখনো বাঙালির একান্নবর্তী পরিবার সেইভাবে ভাঙতে শুরু করেনি। বড়ো পরিবারে খুঁজে পাওয়া যেত একেক জন সদস্য, যারা চাকরিবাকরির মধ্যে ঢুকে নিজের জীবিকার নিশ্চিতি না করতে পারলেও পাড়ার আড্ডার শিরোমণি হয়ে থাকতেন – পাড়ার কাজেকর্মে ডাকলেই তাদের পাওয়া যেত বা কখনো স্বেচ্ছাতেই এসে দাঁড়াতেন তারা। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া বা পাড়ার চেনা বউদির জন্য ম্যাটিনি শোয়ের টিকিট কেটে দেওয়া অথবা খাদ্যসংকটের দিনে ঠিক সময়ে রেশন দোকানে গিয়ে লাইন দেওয়া – এর সবগুলোতেই হাজির হয়ে জেতেন তারা।
পাড়ার ক্লাবগুলো তখনো পর্যন্ত এতদূর হিসেবি পেশাদার হয়ে ওঠেনি, ক্লাবের সংখ্যাও ছিল কম। আর এই ধরনের পাড়ার মাতব্বরদের দিব্যি জুটে যেত একপাল সাঙ্গোপাঙ্গো – তারা ফাইফরমাশ খাটত আবার নরক গুলজার আড্ডাতেও তাল ঠুকত সমানে।
খুব কি ভুল হবে যদি বলি, টেনিদা বা ঘনাদার মতো চরিত্ররা তেমনই এক সময়ের সন্তান? নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যেখানে থাকতেন, সেই পটল ডাঙা স্ট্রিটে সত্যিই এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাকে সামনে রেখে টেনিদা চরিত্রের ভাবনা। সেই মানুষটিও মধ্য কলকাতার ওই প্রাচীন পাড়ার এক স্বঘোষিত মাতব্বর এবং টেনিদার মতোই নিষ্কাম ও সঙ্গী পরিবৃত। ঘনাদার ক্ষেত্রে এমন কোনও বাস্তব চরিত্রের হদিশ না মিললেও তার মূলে যে কলকাতার পাড়া কালচার আর পুরোনো বাড়ির বাঁধানো রকে জমে ওঠা নিপাট আড্ডা – এই বিষয়ে কোনও ভুল নেই। সমকালীন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার ভিতর থেকে এইসব চরিত্রগুলো উঠে আসে; তার কাহিনির পারিপাট্য আর স্বাদ সব সময়েই পাঠককে মুগ্ধ করে। অবশ্যই এখানে স্মরণে রাখতে হবে তাদের সৃষ্টিকর্তাদের অনবদ্য লিখনশৈলী, হিউমার আর উইটের যুগলবন্দি, যা আরও ঘন করে তোলে আখ্যানগুলিকে। পাঠক তার চারপাশে প্রতিদিনের দেখা চরিত্রদের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে এঁদের – একরকম একাত্ম্যতায় ডুবে যেতে থাকে। নিজের সৃষ্ট চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের আত্মীয়তা তৈরি যে কোনও লেখকের প্রাথমিক চাহিদার মধ্যে পড়ে আর সেইটুকু করার জন্য তাকে বারবারই ফিরে তাকাতে হয় নিজের চারধারের পৃথিবীতে। কীভাবে তিনি তা ঘটিয়ে তুলবেন সেটা তাঁর মুন্সিয়ানা কিন্তু তাঁর মৌলিক শর্ত প্রতিবেশকে দেখা ও লেখায় তাকে স্থাপিত করা। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বা প্রেমেন্দ্র মিত্র ঠিক এই কাজটি করে টেনিদা ও ঘনাদাকে ছোটোদের বৃত্ত ছাড়িয়েও সকলের জন্য তুলে দিয়েছেন তাদের নিটোল গল্পগুলো। এখানে হয়তো প্রাসঙ্গিকভাবে বলা দরকার, সত্যজিৎ যখন তাঁর ফেলুদার কথা ভেবেছেন, তখন সামাজিক বাস্তবতা কিছু বদলে গেছে। তাই ফেলুদাকে আমরা ড্রয়িং রুমের অন্দরেই দেখলাম , ঠিক পাড়ার দাদা হিসেবে তাকে স্থাপনা করার ইচ্ছে সত্যজিতের ছিল না।
আরও পড়ুন
হিন্দি কি কেউ সাধে বলে নাকি?
আজকের শহর থেকে উধাও হয়েছে পাড়া। একান্নবর্তী পরিবারগুলি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এখানে ওখানে, নতুন নতুন উপনিবেশে – কেউ কেউ বা কলকাতা ছেড়ে কিছু দূরবর্তী মফস্বলে। পাড়ায় পাড়ায় সাবেকি বাড়ি ভেঙে নতুন ফ্ল্যাট, উধাও রক আর তাঁর আড্ডা। অন্যদিকে একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙনের পাশাপাশি আর্থিক সংকট, বাড়ির মেয়েরা জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়েছেন এখানে ওখানে – কেউ সরকারি চাকরি, কেউ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বা সওদাগরি অফিসে। গত কয়েক দশকে আরো মৌলিকভাবে সামাজিক আর্থিক কাঠামোয় নিত্য নতুন পেশায় আসছেন মেয়েরা, অন্তত তাদের ম্যাটিনি শোয়ের টিকিট কেটে দেওয়ার লোকের দরকার ফুরিয়েছে। শহরের সিনেমা হলগুলি ধুঁকছে, অন্যদিকে মাল্টিপ্লেক্সের সংস্কৃতি ফিল্ম দেখার সংজ্ঞা পালটে দিয়েছে অনেকটাই। এইসব নতুন নতুন এলাকায় মানুষের পারিবারিক পরিচয়টুকুও পালটে গেছে বেমালুম। আগেকার কুণ্ডুবাড়ির নিকুঞ্জদা এখন ডি-পাঁচশো আট এর মিস্টার নন্দী। হাইরাইজের উল্লম্ব পাড়ায় কোনও বেকার বাউন্ডুলে মাতব্বরের দিন ফুরিয়েছে।
এই পাড়ায় হয়তো বা বৎসরান্তে একটি দুগগা পুজো হয় তবে সেখানে মোড়লি করার কোনো সুযোগ নেই। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিই সেখানে আয়োজক, বাকি নাগরিকরা সকলে নিমন্ত্রিত – ক্যাটারার সংস্থা সেখানে ভোগ রান্না থেকে পরিবেশন করেন, সেখানে বেকার যুবক বা তাঁর কোনও চেলাচামুন্ডা আর লাগে না। সবাই এখানে স্বেচ্ছাবন্দি, এমনকি এখানে চাকরি না পাওয়া যুবকরাও শহরে নেই, তারা পাড়ি দিয়েছে মুম্বাই বেঙ্গালুরু নয়া দিল্লি বা চেন্নাই। এই পাড়ায় কারোর আড্ডা দেওয়ার আর অবসর নেই। যেটুকু ফাঁক, সেটুকুর দখল নিয়েছে সোশাল মিডিয়া। এই পাড়ায় কেউ রাত বিরেতে অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার কোনও লোক নেই, অন্য কোনও বিপদে আর কেউ সহায় নেই কারোর। যদিও বহুতল ফ্ল্যাটের সমস্ত ফ্লোরেই ঠাসা বাসিন্দা – প্রত্যেকেই দূরতর দ্বীপের মতন।
তাই টেনিদা আর ঘনাদারা আর নেই কোথাও। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আর কোনও টেনিদা বা ঘনাদার সৃষ্টি বাস্তব কারণেই সম্ভব নয়। এই ধাঁচে কোনও চরিত্র নির্মাণ হলে তা হবে সময়ছুট বেখাপ্পা। তাই বলছিলাম, আকবর বাদশার দিন গিয়েছে। দিন গিয়েছে টেনিদার, ঘনাদার।
[ছবিগুলি ঘনাদা সমগ্র ১-এর প্রচ্ছদ (শিল্পী সমীর সরকার) এবং টেনিদা সমগ্রর প্রচ্ছদ (শিল্পী দেবাশীষ দেব) থেকে গৃহীত। বই দু’টি প্রকাশিত হয়েছে আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড থেকে।]
