জন্ম থেকে মৃত্যুর উৎসব বছরের প্রতিটি ‘তারিখ’ জুড়ে

তারিখ/ দ্য টাইমলাইন- ফিল্ম রিভিউ

একটি চলচ্চিত্রের রিভিউ মানেই আলোচ্য ছবির শুরু থেকে শেষ গল্প বলে দেওয়া নয় কিংবা কে যথাযথ আর কে ‘আরও একটু ভালো করতে পারতেন’ জাতীয় মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়া নয়। একটা ছবি দেখার পর তাকে সমালোচিত হওয়ার যোগ্যতা যেভাবে অর্জন করতে হয়, ঠিক সেভাবেই সমালোচককেও তাঁর যুক্তির কাছে সৎ থাকতে হয়। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় ছবি ‘তারিখ’ (The Timeline)। এই ছবি বক্সঅফিসে কতটা সফল জানি না, কিন্তু বাংলা ছবি খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে যাঁরা মন্তব্য করেন, তাঁদের একটিবার হলেও এই ছবিটি দেখা উচিত। চূর্ণী তাঁর প্রথম ছবি ‘নির্বাসিত’-তে যথেষ্ট যত্নের ছাপ রেখেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে আরেকজন উচ্চমানের পরিচালক চলে এলেন, একথা সেইসময় অনেকেই বলেছিলেন। তাই দর্শকদের প্রত্যাশার পারদ ছিল তুঙ্গে। এখন সেই পারদ দর্শককে কতটা ছুঁলো তা এখানে আলোচ্য নয়। বরং আলোচনা হোক এই লেখক/দর্শকের ‘তারিখ’ দেখার পর কী কী ভালো লাগল আর কী কী ভালো লাগলো না তা নিয়ে।

ভালো লাগলো-

• গল্প বলা/ স্টোরিটেলিং- সোশ্যাল মিডিয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে মূল চিত্রনাট্যে। গল্প বলার টাইম এবং স্পেসকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন পরিচালক। বিশেষত শান্তিনিকেতনে তিন বন্ধুর আড্ডা তিনটি পর্বে (বলা ভালো তিনটি আলাদা আলাদা সময়ে) ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাঝে বয়ে গেছে অনেকখানি সময়, পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো তারিখ। ছবি শুরু হয় মৃত্যু দিয়ে, ছবি শেষও হয় মৃত্যু দিয়ে। মধ্যিখানে জীবনের গভীরে ঢুকে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়া। এখানে তাই লগ ইন এবং লোগো আউটের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে উঠে এসেছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, টাইমলাইনে উপচে পড়া স্ট্যাটাস। ফেসবুকের দেওয়াল হয়ে উঠছে নিজস্ব ডায়েরি। যেখান থেকে একটা মানুষকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে বা তাঁর সময়কালকে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে।

• অভিনয়- ‘তারিখ’ ছবিতে প্রত্যেকেই চমৎকার অভিনয় করেছেন। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়/ অনির্বাণ নিজের আদর্শের কাছে অবিচল থেকেছেন। বলা ভালো, এতটুকুও অভিনয় করেননি তিনি। রাইমা সেন/ ইরা প্রেমে-অভিমানে-দুঃখে সমান স্বচ্ছন্দ। ঋত্বিক চক্রবর্তী/ রুদ্রাংশু চরিত্রগতভাবে ভীষণ শান্ত, তাঁর চোখ দৃপ্ত। পাশাপাশি অনসূয়া মজুমদার, অলোকানন্দা রায়, অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, একটি বিশেষ চরিত্রে কৌশিক গাঙ্গুলি প্রত্যেকেই চমৎকার। আলাদাভাবে উল্লেখ করতেই হয় বাচ্চা মেয়েটির (নীহারিকা) অভিনয়। তাঁর এক একটি অভিব্যক্তি চোখে পড়ার মতো। 

• আবহ- এই ছবির অন্যতম উল্লেখযোগ্য জায়গা আবহ বা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। রাজা নারায়ণ দেব নিজস্বতায় পরিপূর্ণ করেছেন ছবির প্রত্যেকটা ফ্রেম। যে টাইমলাইনের কথা এখানে বলা হয়েছে তা রাজা নারায়ণের আবহতে পূর্ণ মাত্রা পেয়েছে। বিশেষত কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠে যে গানগুলি ঘুরে ফিরে এসেছে, প্রত্যেকটির অ্যারেঞ্জমেন্ট দুর্দান্ত। মহীনের ঘোড়াগুলির জনপ্রিয় গান ‘এত চাওয়া নিয়ে কোথা যায়’ গানটির ব্যবহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। 

• ইঙ্গিতধর্মিতা- যেকোনো টেক্সটের একটা সাব-টেক্সট থাকে। সেই সাব-টেক্সটে উঠে আসে নানারকম রেফারেন্স। ‘তারিখ’ ছবিতে এই জায়গাটি চমৎকার। এক একটি চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং বাস্তবধর্মী রূপ দিতে পরিচালক নানারকম ইঙ্গিত রেখেছেন। যেমন- শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে উঠে এসেছে ফ্রয়েডিয়ান সাইকোলজি, এসেছে কবিতা, একজন অধ্যাপকের আদর্শ। রাইমা সেনের চরিত্রে এসেছে শপিং করার প্রসঙ্গ। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে নানারকম রাজনৈতিক ইস্যু তুলে আনা হয়েছে। বিশেষ কোনো রঙের রাজনীতি নয়, সমাজটাকে ভালোবাসোতে শেখা, একে অপরের পাশে থাকা সবটাই এই ছবির ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। 

ভালো লাগলো না-

• ক্যামেরা- গোপী ভগতের গোটা ছবি জুড়ে ক্যামেরার অত্যধিক জাগলারি বড্ড চোখে লেগেছে। এই ছবির বিষয়ের স্বার্থে ক্যামেরাকে নানা দিকে মুভ করার পদ্ধতি, ছবির আখ্যানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ বলে মনে হয়নি।

• কৃত্রিমতা- একঝাঁক ইয়ং ব্রিগেডকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন পরিচালক। তবে তাঁদের অতিরিক্ত ব্যবহার ছবিকে দীর্ঘায়িত করেছে। বেশি মাত্রায় কৃত্রিম বলে মনে হয়েছে।

• সমাপ্তি- ছবির সময়সীমা ১ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। শেষ ২০ মিনিট অর্থাৎ ক্লাইম্যাক্স উচ্চমানের বলে মনে হয়নি। অন্তত যে এক্সপেকটেশনে ছবিটি এগিয়ে যাচ্ছিল সেই মাপের বলে মনে হয়নি। এক সাধারণ মেয়ে ইরা অনির্বাণের একটি ইঙ্গিতে কিছুতেই মুক্ত হতে পারছিল না। মুক্তির পথ খুঁজতে খুঁজতে সে আবিষ্কার করেছে জর্জিনা এবং দীপঙ্কর মিত্রকে। শেষে সমস্ত অঙ্কের হিসাব মিলে গেছে। ইরা মুক্তিও পেয়েছে। এই যে জোর করে মুক্তিটাকে পরিচালক দেখিয়ে দিলেন, তা চোখে লেগেছে। এই টাইমলাইনটার মধ্যে রয়েছে খুব কম সময়। খুব সরাসরি দেখিয়ে দেওয়া হল বলেই সময়টাকে ছোঁয়া গেল না। উত্তরণেই ছবিটি শেষ হতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে কিছু প্রশ্ন আর কিছু খটকার উত্তরের মধ্যে দিয়ে শেষ হল ‘তারিখ’।

ছবি- তারিখ | পরিচালনা- চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় | অভিনয়- শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, ঋত্বিক চক্রবর্তী | সঙ্গীত- রাজা নারায়ণ দেব | প্রযোজক- অপেরা মুভিজ | বঙ্গদর্শন রেটিং- ৩.৫/৫

Developed by DXDasia