
পরিচালনায় অরুণ রায় এবং হীরালালের চরিত্রে রয়েছেন কিঞ্জল নন্দ
হীরালাল সেন। বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ। তাঁর সৃষ্টিশীল কর্মজীবন ব্যাপ্ত ছিল ১৯১৩ সাল অবধি। এই সময়ের মধ্যে হীরালাল চল্লিশটিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। বেশিরভাগ ছবিতেই ফ্রেমবন্দি করেন অমরেন্দ্রনাথ দত্তের কলকাতা ক্লাসিক থিয়েটারে মঞ্চস্থ বিভিন্ন দৃশ্য। সেই যুগে ব্যবহারযোগ্য ফিল্ম আনা হত বিদেশ থেকে। ১৯০৩-এ তৈরি করেন “আলিবাবা ও চল্লিশ চোর” (Alibaba and the Forty Thieves), যেটি বানানো হয়েছিল ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত ওই নামের থিয়েটারের ওপর ভিত্তি করে। বাণিজ্যিকভিত্তিতে বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপন ও সংবাদমূলক চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন। ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞাপনে ফিল্ম ব্যবহার করায় তিনিই প্রথম ছিলেন। হীরালালের তৈরি তথ্যচিত্র “Anti-Partition Demonstration and Swadeshi movement at the Town Hall, Calcutta on 22nd September 1905” ভারতের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসাবে গণ্য করা হয়।
আরও পড়ুন
বাংলার বুকে প্রথমবার আসতে চলেছেন হিটলার
হীরালাল সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ফার্সি ভাষাও শিখতেন। হীরালাল সেনকে নিয়ে খুব সম্ভবত তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি। অথচ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রসঙ্গ এলেই হীরালাল সেনের নাম আসবে সবার প্রথমে। এই সিনে-নক্ষত্রের জীবনকাহিনি বাংলায় এই প্রথম সেলুলয়েড বন্দি করছেন পরিচালক অরুণ রায়। তথ্যচিত্র নয়, বায়োপিক। পরিচালক অরুণ রায় এর আগে “এগারো” এবং “চোলাই” নামের দুটি ছবি বানিয়েছিলেন। অনেক অজানা তথ্য পরিবেশিত হবে এই ছবিতে। ছবিটির নাম দেওয়া হয়েছে “হীরালাল”। তৎকালীন কলকাতার সেট বানিয়ে নির্মিত হয়েছে ছবি। শুটিং হয়েছে কলকাতার লাহাবাড়ি, বেলগাছিয়া রাজবাড়ি, টিটাগড় জুটমিল, মুর্শিদাবাদ সহ বেশকিছু জায়গায়।

ছবিতে হীরালালের চরিত্রে অর্থাৎ প্রধান ভূমিকায় দেখা যাবে তরুণ অভিনেতা কিঞ্জল নন্দ’কে। তাঁর কথায়, “এখানে হীরালালের শৈশব থেকে একেবারে শেষ বয়স অবধি জার্নিটা দেখানো হয়েছে। উনি বিজ্ঞাপন বা তথ্যচিত্র যেগুলি প্রথম বানিয়েছিলেন, সেগুলিকেই এক্সপ্লোর করা হয়েছে। প্রায় দুশো ছবি বানিয়েছিলেন হীরালালবাবু। সবই পুড়ে যায়। মানে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসবই আমাদের ছবিতে উঠে এসেছে। দাদাসাহেব ফালকে হীরালালের ঠিক কতদিন পর এসেছিলেন সেগুলিও উঠে আসবে।”
পরিচালক অরুণ রায়ের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় ছবির গল্পে উঠে আসবেন গিরিশ ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমরেন্দ্রনাথ দত্ত’র মতো কিংবদন্তীরা। গিরিশ ঘোষের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। এছাড়াও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন শংকর চক্রবর্তী এবং শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। রয়েছেন থিয়েটারের বেশ কয়েকজন অভিনেতা তন্বিষ্ঠা বিশ্বাস, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, অনুষ্কা চক্রবর্তী প্রমুখ। হীরালালের চরিত্রে অভিনীত কিঞ্জলের এটিই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি। তিনি নিজেও একজন থিয়েটার অভিনেতা। ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন ময়ূখ-মৈনাক, শিল্প নির্দেশক তপন শেঠ, চিত্রগ্রহণে গোপী ভগৎ। চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক অরুণ রায় স্বয়ং।

“হীরালাল” ছবিটি প্রথম প্রদর্শিত হয় ২৪তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ কম্পিটিশন সেকশন-এ। এবছরেই ছবির শুভমুক্তি। রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি একটি ছবি বানায় ১৯১৩ সালে। এরপর হীরালাল সেন ভয়ঙ্কর দুর্গতি আর অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হন। এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানির জামশেদজি ফ্রেমজি ম্যাডান তাঁর থেকে অনেক বেশি সাফল্য অর্জন করেন। কিছু বছর পরেই হীরালাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগেই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁর তৈরি সমস্ত ছবি নষ্ট হয়ে যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের দর্শক অরুণ পালের “হীরালাল” ছবির দিকে তাকিয়ে থাকবে, এই আশাটুকু করাই যায়। প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে। এতদিন পর হীরালালকে নিয়ে এই ধরনের ছবি দর্শকমহলে নজর কাড়বে। এর আগেও অরুণ রায় ‘এগারো’ এবং ‘চোলাই’ ছবিতে ভিন্নধর্মী দুটি ছবি বানিয়েছিলেন। যার মধ্যে এগারো ছবিতে উঠে এসেছিল মোহনবাগান ফুটবল দলের ইতিহাস। সেটিও ছিল একটি গবেষণাধর্মী ছবি। ঠিক কবে “হীরালাল”-এর মুক্তি তা স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। এখনও ছবির ট্রেলার মুক্তি পায়নি। তবে মানুষের মনে এই হীরালাল যে আশা জাগাবে তা বলাই বাহুল্য।

