মধু-পুঁটির সম্পর্ক জীবন্ত হয়ে উঠল কৌশিক গাঙ্গুলির ছবিতে
‘হোমো’ কথাটা তখন খুব চলত। দুটো ছেলে বা মেয়ের মধ্যে সামান্যতম ঘনিষ্ঠতা মানেই তারা হোমো। তখন বলতে স্কুলজীবনের যে পর্যায়ে ধীরে ধীরে তারুণ্যের গন্ধ ধরছে মনে। আর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ রিলিজ হতে দেখলাম আমরা। বাইসেক্সুয়াল রিলেশনশিপের দোলাচল আর নারীবর্জিত যাত্রামঞ্চে মহিলা চরিত্র চিত্রায়ন করা প্রথিতযশা শিল্পীর জীবনের গল্প- এই দুই ঘটনাপ্রবাহকে একটি প্যারালাল ফ্রেমে চমৎকার দেখিয়েছিলেন পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’-এরও সাত বছর আগে ‘উষ্ণ তার জন্য’-র মতো প্রথাভাঙা ছবি উপহার দিয়েছিলেন দর্শককুলকে। ‘শব্দ’ বা ‘ছোটদের ছবি’ও পারতপক্ষে অন্তরালে থাকা, একঘরে হয়ে যাওয়া মানুষদেরই কাহিনি।
অতএব, ‘নগরকীর্তন’ নিয়ে প্রত্যাশার পারদ যে তরতরিয়ে চড়বে এ কথা জানাই ছিল। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং সিনেমা তৈরির টাইমলাইনটা। কৌশিক এই গল্পের চলচ্চিত্রায়ন শুরু করছেন, ঋদ্ধি সেনের মতো সম্ভাবনাময় তরুণ অভিনেতাকে দিয়ে এরকম চরিত্রে অভিনয় করাচ্ছেন, তারপর বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটার স্ক্রিনিং আর উচ্চ প্রশংসা- এই সবকিছুই হচ্ছে এমন একটা সময়ে যখন সর্বোচ্চ বিচারালয় তৃতীয় লিঙ্গকে আইনি বৈধতা দিলেও সমলিঙ্গের প্রেম তখনও জেলযোগ্য অপরাধ। ঋদ্ধির অভিনীত চরিত্র পরিমল ওরফে পুঁটি শরীরে সম্পূর্ণ ছেলে হলেও মনের দিক দিয়ে পুরোপুরিই নারী, মধুর প্রতি তার প্রেমানুভূতি সম্পূর্ণটাই নারীমনের দৃষ্টিকোণ থেকে, মধুও তাকে দেখে একজন মেয়ে হিসেবেই। নারীসত্তার দিক দিয়ে পুঁটি তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবেই গণ্য হবে, কিন্তু যেহেতু শরীরে সে সম্পূর্ণ একজন পুরুষই, সেহেতু তার আর মধুর প্রেমকে সমকামীও বলতে পারে সমাজ। সুতরাং, দুটি রায়ের মধ্যেকার অদ্ভুত বৈপরীত্যের ব্যাকড্রপে দাঁড়িয়ে এই চরিত্রের ভাবনা এবং তাকে পূর্ণতা দেওয়ার কাজে কৌশিক-ঋদ্ধি জুটি একশোভাগ সফল।

এখানেও সেই প্যারালাল ফ্রেমিং। পুঁটির জার্নি। যেখান থেকে বর্তমান শুরু হচ্ছে, একইসঙ্গে শুরু হচ্ছে অতীতও। দেহমনে সম্পূর্ণ নারী হয়ে ওঠার জন্য মধুর সঙ্গে ঘরবাঁধার আশা নিয়ে অনিশ্চিতযাত্রার বর্তমান আর ছোটো থেকে মনপিঞ্জরে ছটফটানো নারীসত্তার চন্দনাপাখিকে বুকে চেপে, কলকাতার হিজড়েপল্লীতে পালিয়ে আসা ও ভিক্ষাবৃত্তির অতীত। এই দুই সময়কাল একসঙ্গে এগোতে এগোতে ঠিক যেখানে মিশছে, সেখানেই ঘটছে চূড়ান্ত ট্র্যাজেডির পালা। সেই ট্র্যাজেডির মধ্যে দিয়েই অতীত আর বর্তমানের যন্ত্রণা বুঝি ভবিষ্যতের মহাকালে বিলীন হয়ে যেতে চায়।
তবে ব্যক্তিগত মতে, মূল স্টোরিলাইন আহামরি লাগেনি। অবশ্য সেই দুর্বলতাকে অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে সিকোয়েন্স-টাইমিং, জায়গায় জায়গায় শার্প ট্যুইস্ট আর ক্লাইম্যাক্সের আনপ্রেডিক্টেবিলিটি। মধুর (ঋত্বিক চক্রবর্তী) বাঁশির টানে মোহিত হয়ে যাওয়া পুঁটির প্রেম দেখে খুব স্বাভাবিকভাবেই কৃষ্ণ-রাইয়ের চিরকালীন কাহিনি মনে পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু শেষমেশ যেন মিলেমিশে যাচ্ছে পুঁটি আর কানুয়া। তাহলে কি আমাদের সকলের মধ্যেকার লুকিয়ে থাকা দ্বৈত স্বাভাবিকত্বের খোঁজ দিতে চাইলেন পরিচালক?
বৃহন্নলা সমাজের বাস্তবতার নিখুঁত কাহিনিচিত্রটি তুলে এনে মধু-পুঁটির সম্পর্ককে যেন আরও জীবন্ত ফ্রেমে ধরলেন কৌশিক। মানুষ বৃহন্নলা হয় জন্মের সময়েই। কিন্তু জন্মগতভাবে পুঁটি এই সমাজের ছিল না কোনোভাবেই। এক সুস্থ পুরুষের শরীরেই তার জন্ম। তার মনে লুকিয়ে থাকা ক্রন্দনরতা মেয়েটিকে কেবল বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই বুঝি ‘স্বাভাবিক’ সমাজের করালচক্ষু এড়িয়ে এই সমাজে অসহায় আশ্রয় নিয়েছিল রূপান্তরকামী পরিমল। ভাবেনি, এখানেও সেই একই কঠোর নিয়মাবলীর চক্রব্যূহ, একঘেয়ে অন্ধকার পরিণতি, প্রতিহিংসা-পরায়ণতা। ‘ভাই হয়ে ভায়ে কাটে’-র তাৎপর্যপূর্ণতা। আর এই চিত্রের পাশেই স্তরে স্তরে সাজানো থাকে ছোটোবেলায় মেয়েদের জিনিস নিয়ে খেলার ‘অপরাধে’ বাবার কাছে পরিমলের বকুনি খাওয়া আর পুঁটির পরিচয় জানবার পর মধুর দাদার মধুকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলার টুকরো চিরাচরিত দৃশ্য।
সুরক্ষিত এজলাস-কক্ষের বাইরেও একটা সমাজের সালিশি সভা বসে, যেখানে নির্দ্বিধায় স্বাভাবিক-অস্বাভাবিকের শ্রেণিবিন্যাস হয়, সেই সভার কাছে ডব্লিউ পি নম্বর ৬০৪, ৩৭৭, এগুলোর খবর পৌঁছয় কি?

ঋদ্ধির অভিনয় প্রশ্নাতীত। কয়েক জায়গায় মেয়েলিভাবের নিখুঁত প্রকাশ করতে গিয়ে অতি-অভিনয় মনে হয়েছে ঠিকই, তবে সার্বিক অভিনয়ের মুন্সিয়ানায় ওসব ছুটকোছাটকা ভুলগুলো অনেক গভীরে ঢাকা পড়ে যায়। সবথেকে যে কারণে ঋদ্ধি আরও বাড়তি প্রশংসা পাবেন, তা হল সিসজেন্ডার পুরুষ হয়েও কেরিয়ারের একদম শুরুতেই এমন একটি চরিত্রে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জটা নেওয়ার জন্য। বিদেশে এধরনের অভিনয় অনেক বছর ধরে হয়ে আসছে। আজ থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে মুক্তি পাওয়া ‘ডগ ডে আফটারনুন’ ছবিতে আল পাচিনোর বিপরীতে রূপান্তরকামী নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ক্রিস স্যারান্ডন। এরপর জে ডেভিডসন (‘দ্য ক্রাইং গেম’), লি পেস (‘সোলজার্স গার্ল’), এডি রেডমেইনরা (‘দ্য ড্যানিশ গার্ল’) মুখোমুখি হয়েছেন এরকম চ্যালেঞ্জের। এই তালিকায় রয়েছেন সিলিয়ান মার্ফির (‘ব্রেকফাস্ট অন প্লুটো’) মতো ভার্সেটাইল অভিনেতাও। অস্কার-সহ নানা পুরস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তাঁরা। নারীর ভূমিকায় পুরুষ অভিনেতার রেওয়াজ তো ছিলই, কিন্তু ‘চিত্রাঙ্গদা দ্য ক্রাউনিং উইশ’-এর কথা মাথায় রেখেও বলতে হয়, বাংলা চলচ্চিত্রে এরকম কাজ অনেকটাই নতুন। এরপর অন্যান্য অভিনেতারাও এমন কাজ করতে এগিয়ে আসবেন কিনা, সেটা অবশ্য সময়ই বলবে।
আপাতত ঋদ্ধির সঙ্গে আরেক ঋ-এর কথাও অবধারিত আসবে। রোজকার বাসে-ট্রামে যাতায়াত করা মধ্যবিত্ত বাঙালির মুখ। এফর্টলেস ব্রিলিয়্যান্স। ঋত্বিক চক্রবর্তীর কাছে অভিনয়টা জাস্ট প্লেন অ্যান্ড সিম্পল। ‘শব্দ’, ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’, ‘আসা যাওয়ার মাঝে’-র ধারাবাহিকতা এখানেও অক্ষুণ্ণ রেখে দিলেন ঋত্বিক। পুঁটির সৌন্দর্য-যন্ত্রণার কাছে মধুর যাপনটুকুকে একটুও ফিকে মনে হয়নি কখনও। অন্যান্যদের মধ্যে বিশেষ করে বলতে হয় মধুর বৌদির ভূমিকায় বিদীপ্তা চক্রবর্তীর অভিনয়। মাত্র কয়েক মিনিটের একটি চরিত্রে স্নেহশীল অথচ সাহসী অভিনয় যথেষ্ট কুর্নিশের দাবি রাখে। সিনেমায় অধ্যাপিকা মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাটি অতিথি শিল্পীর হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানবীর নিজের কথা বলার সঙ্গে অপেশাদার সেইসব মানুষদের সাবলীল অভিনয়-নগরসভ্যতায় কীর্তনের সুরটা দারুণ বেঁধেছেন কৌশিক।
হলে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে-পেছনে অগুন্তি ‘বিশেষ’ মানুষদের ভিড়। গল্পগুজবে, সেলফি তোলায় মত্ত। আনন্দের পেছনের দুঃখটুকু চোখে পড়ে না আমাদের, শুধু তাকানোটাই থাকে। কৌশিকের ছবিতে আশাবাদ ধ্বনিত হয়নি, বাস্তবে হতে পারে না?

ছবি- নগরকীর্তন | পরিচালক- কৌশিক গাঙ্গুলি | অভিনয়- ঋত্বিক চক্রবর্তী, ঋদ্ধি সেন, বিদীপ্তা চক্রবর্তী | সঙ্গীত পরিচালক- প্রবুদ্ধ ব্যানার্জী | প্রযোজক- অ্যাক্রোপলিশ এন্টারটেনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড | বঙ্গদর্শন রেটিং- ৪.৫/৫