বারুইপুরের তন্দ্রা মাখাল : অ্যাসিডে পুড়েছে মুখ, পোড়েনি সাহস

তন্দ্রা মাখাল শোনালেন তাঁর জীবনের কথা

ময় সাদা, সময় কালো। সময়ের আকাশে রামধনু জাগে পাশপাশি এসে দাঁড়ালে, হাতে হাত রাখলে। দুঃসময় চিরকালীন। তার বিরুদ্ধে লড়াইও চিরকালীন। সেই লড়াইয়ের মাধ্যমেই বেঁচে থাকে জীবন। প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, “মস্ত একটা হাওয়ায়, ভাঙাঘরে, মানুষ কাঁপছে।” সেই ভাঙাঘরের সামনে আলো হাতে মাঝেমধ্যে এসে দাঁড়ান কেউ কেউ। নুইয়ে পড়া মানুষগুলোর মধ‍্যে আবার জেগে ওঠে জেদ, ঘরগুলো মেরামত হতে থাকে। তেমনই আলো হাতে এসেছিলেন বিমান দত্ত (Biman Dutta)। বারুইপুরের তন্দ্রা মাখাল-এর (Tandra Makhal) ঘরে। যেমন দাঁড়ান আরও অনেকের ঘরের সামনে। ডাক দেন, ‘আয়, আরও বেঁধে বেঁধে থাকি।’ নতমুখ মানুষগুলোর মুখে আবার আলো পড়ে। বিমানবাবু বারুইপুরে একটি এনজিও (NGO) চালান, নাম বেবিল্যান্ড ফাউন্ডেশন (Babyland Foundation), আর তন্দ্রা একজন হতভাগ্য অ্যাসিড-আক্রান্ত (Acid-victim)।

অ্যাসিড-আক্রান্ত? তা তো ঠিকই। তার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাসিড-যোদ্ধা, জীবনযোদ্ধাও বটে। অ্যাসিড আক্রান্ত তন্দ্রা মাখাল তাঁর জীবনের কথা শোনাচ্ছিলেন বঙ্গদর্শন.কম-কে। তাঁর কথায় কিন্তু ঝলক দিয়ে গেল আশা আর সংকল্প। প্রথমেই জানালেন, তাঁর জীবনের অন্ধকার দিনের কথা। “আমার পৈতৃক বাড়ি ডায়মন্ডহারবার লাইনের কল্যাণপুরে। ওখানে আমাদের একটা জমি আছে। সেটা নিয়ে বহুদিন ধরেই এক প্রোমোটারের সঙ্গে আমাদের ঝামেলা ছিল। একদিন সে দলবল নিয়ে এসে আমাদের বাড়িতে চড়াও হয়, শাসায়, গালিগালাজ করে। আমার বাবা আর ভাইকে মারধরও করে। আমি তখন বাড়িতে ছিলাম। প্রতিবাদ করি। তখনই আমি ওদের টার্গেট হয়ে গিয়েছিলাম। পরে একদিন ট্রেনে করে কল্যাণপুর থেকে যাদবপুরে আসছিলাম। তখন একটা বিউটি পার্লারে কাজ করতাম। আসার সময় ট্রেনেই আমার মুখে অ্যাসিড ছোড়া হয়।” -জানালেন তন্দ্রা। তারপরের ঘটনা যেমন হয়ে থাকে, তেমনই। যন্ত্রণা, ভয়, জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার পরেও পেয়েছিলেন হুমকি। তারপর পুলিশে অভিযোগ করার পর হুমকি খানিক কমে। তাঁর যন্ত্রণা বেরিয়ে আসছিল টুকরো-টুকরো কথায়, “হাসপাতালে যাওয়ার পর, যখন আমার জ্ঞান ফেরে, আমি কাউকে চিনতে পারছিলাম না, শুধু মনে পড়ছিল যে আমার এক ছেলে আছে। আমার একটা চোখ নষ্ট হয়ে যায়। পাঁচ বছর বাড়ি থেকে বেরোতে পারি নি, ভয়ে, অপমানে। কখন সূর্য উঠছে আর কখন ডুবছে, তাও জানতে পারতাম না। শুধু ভয় হত আমাকে মেরে ফেলবে।”

বিমানবাবু জানালেন তন্দ্রার সঙ্গে তাঁর আলাপের কথা, “আমরা বারুইপুর মহিলা থানায় (Baruipur Women Police Station) নারীদিবস পালন করি প্রতি বছর ৮ মার্চ। ২০২২ সালে আমরা ঐদিন অ্যাসিড-আক্রান্ত মেয়েদের সম্বর্ধনা দিয়েছিলাম। সেখানেই তন্দ্রার সঙ্গে আলাপ হয়, ওর জীবনের ঘটনার কথা জানতে পারি। জানতে পারি অন্যান্য মেয়েদের লড়াইয়ের গল্পও।” বিমানবাবুরা প্রায় সতেরো বছর ধরে সমাজসেবার বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর এই সংস্থা গত ১৫ বছর ধরে আয়োজন করে আসছে বেবি-শো। বিমানবাবুর জবানিতে, “আমরা প্রতি বছর ৩০০-৩৫০ জন বাচ্চাকে নিয়ে বেবি-শো করি। বাচ্চা আর তাদের মায়েরা অংশগ্রহণ করেন। বিচারক হিসাবে চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডাক্তারেরা থাকেন। বাচ্চাদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয়। বাচ্চাদের শারীরিক সুস্থতা আর তাদের ভরণ-পোষণের উপর বিচার করে বাচ্চাদের ও তাদের মায়েদের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান দেওয়া হয়। হাওড়া, কলকাতা থেকেও বাচ্চা ও তাদের মায়েরা এখানে আসেন। এছাড়াও সুন্দরবনে একটি প্রাইমারি স্কুল তৈরিতে আমরা সহযোগিতা করেছি। সেখানে এখন প্রায় ১০০ বাচ্চা পড়াশোনা করে। আমরা সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীঘাটে স্ট্রেচার সরবরাহ করেছি, যাতে অসুস্থ মানুষরা স্ট্রেচারে করে নৌকা থেকে ওঠা-নামা করতে পারেন।” আর অ্যাসিড-আক্রান্তদের নিয়ে কাজ? বিমান দত্ত জানালেন, তন্দ্রাদের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরে তাঁরা অ্যাসিড-যোদ্ধাদের (Acid-warrior) নিজেদের উদ‍্যোগে সামিল করা শুরু করেন। তাঁদের এইসব উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছে অন‍্য অনেক সংগঠনও। যেমন- খোলো আঁখি (Kholo Aankhi), বারুইপুর স্নেহ (Baruipur Sneho), খড়দা মনন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (Khardah Manan Welfare Society) ইত্যাদি।

বিমানবাবু জানালেন তন্দ্রার সঙ্গে তাঁর আলাপের কথা, “আমরা বারুইপুর মহিলা থানায় (Baruipur Women Police Station) নারীদিবস পালন করি প্রতি বছর ৮ মার্চ। ২০২২ সালে আমরা ঐদিন অ্যাসিড-আক্রান্ত মেয়েদের সম্বর্ধনা দিয়েছিলাম। সেখানেই তন্দ্রার সঙ্গে আলাপ হয়, ওর জীবনের ঘটনার কথা জানতে পারি। জানতে পারি অন্যান্য মেয়েদের লড়াইয়ের গল্পও।” বিমানবাবুরা প্রায় সতেরো বছর ধরে সমাজসেবার বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত।

এবার ফিরি তন্দ্রার কথায়। তাঁর লড়াইয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া ছিল পাড়া-প্রতিবেশীদের? তন্দ্রা বললেন, অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতো না, তাঁদের পাশে দাঁড়াতো না। তবে শুধু ভয় নয়, আধুনিকতার বড়াই করা সমাজের মনে এখনও সুন্দরের টিপিক্যাল টাইপকাস্টের ময়লা লেগে রয়েছে। “কোনও দরকারে রাস্তায় বেরোলে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতো, টিপ্পনিও কাটতো। তখন শুধু ভাবতাম, আমার সঙ্গে কেউ কখনও আর কথা বলবে না, কেউ আমার মুখ দেখবে না, ঘরের মধ‍্যে লুকিয়ে থাকতাম।” – তন্দ্রা মাখাল দুঃসহ স্মৃতির রোমন্থন করছিলেন। “এমনকি, বিমানদা যখন আমার খোঁজে প্রথমবার এলাকায় এসেছিলেন, তখন কেউ আমার বাড়ি চিনিয়ে দেয়নি। বিমানদা আমাদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন প্রতিবেশীদের, তাও কেউ বলেনি…”, বলছিলেন তিনি।

 

এখন তন্দ্রা মাখাল এই ফাউন্ডেশনের সঙ্গেই যুক্ত। বিমানবাবুরা একটি নতুন উদ‍্যোগ নিয়েছেন, যার নাম দেওয়া-নেওয়া ক্লথ ব‍্যাঙ্ক (Deoya-Neoya Cloth Bank)। এটি একটি কাপড়ের দোকান, যেখানে এলাকার মানুষেরা তাঁদের পুরোনো কাপড়জামা দিয়ে যান‍। অনেকসময় নতুন জামাকাপড়ও দেন, করেন অর্থসাহায্যও। সেইসব জামাকাপড় পরে দেওয়া হয় গরিবদের। বিমানবাবু বিশদে জানাচ্ছিলেন তাঁদের এই নতুন উদ‍্যোগের কথা, “অনেক গরিব বাচ্চা আছে, যারা ফুটপাতে বা স্টেশনে থাকে, রাস্তায় ভিক্ষে করে বেড়ায়। তাদেরকে নিয়ে আমরা একটি শিক্ষাকেন্দ্র করেছি। তন্দ্রা আর ওর মতো আরও অনেক মেয়েরা বাচ্চাগুলোকে পড়ায়, আঁকা শেখায়। এখানে অ্যাসিড-আক্রান্ত মেয়েদের স্বনির্ভর করার জন‍্য ট্রেনিংও দেওয়া হয়, হাতের কাজ শেখানো হয়। তাঁরা পারফিউম, ধূপ ইত্যাদি তৈরি করেন। বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরির ব‍্যবস্থাও করা হয়। সম্প্রতি অ্যামাজন কোম্পানিতে কয়েকজনের চাকরির ব‍্যবস্থা করা হয়েছে। এঁদের সমস্যা অনেক। শারীরিক, মানসিক দুই-ই। তবু এঁরা কেউ লড়াই ছাড়ছেন না।” 

বিমান দত্ত তন্দ্রার নতুন জীবন দিয়েছেন। তন্দ্রা বুঝেছেন, তাঁর মতো বা তাঁর থেকেও বেশি কষ্টে অনেকে আছেন। তিনি নতুন করে বাঁচার সাহস পেয়েছেন। নতুন বন্ধু, নতুন আশা খুঁজে পেয়েছেন। বিমানবাবু জানালেন, এরপর তাঁরা অ্যাসিড-আক্রান্তদের নিয়ে নতুন উদ‍্যোগ নেবেন। পুতুলনাচের মধ‍্যে দিয়ে সারা বাংলা জুড়ে সচেতনতার পাঠ দেবেন অ্যাসিড-যোদ্ধারাই (Acid Fighter)। তাঁদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে কয়েকমাস পর থেকেই।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও/ মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও/ …এসে দাঁড়াও, হেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও”। তাঁদের গল্প শুনে আশা জাগে, বিমানবাবুরা এভাবেই বারবার পাশে দাঁড়াবেন আর তন্দ্রাদের হেঁটমুখগুলো ঘুরে যাবে সূর্যের দিকে।

Developed by DXDasia