চৈতন্যদেব পা রেখেছিলেন এখানে, উল্লেখ রয়েছে মনসামঙ্গলেও
সাকু বানুমরে ভাঁটা বাইল বৈষ্ণবঘাটা
বারুইপুর করিল পশ্চাৎ।
বারাশত গ্রামে গিয়া নানা পাচার দিয়া
পূজা দৈল অনাদি বিশ্বনাথ।।
কবি অযোধ্যারামের ‘সত্যপীরের পাঁচালি’তে রত্নাকর সওদাগরের বাণিজ্যযাত্রার সাক্ষী ছিল বারুইপুর। এই বারুইপুরেরই উল্লেখ মেলে চৈতন্যপূর্ববর্তী যুগের কবি বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসামঙ্গলেও’। চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙা নাকি সমুদ্রে যাওয়ার সময় গিয়েছিল বারুইপুর-পার্শ্ববর্তী আদিগঙ্গা দিয়েই। জনপদ হিসেবে বারুইপুরের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে মধ্যযুগের এইসব কাব্য। সেই সময় বারুইপুরের অদূরে নাকি প্রায়ই শোনা যেত বাঘের ডাক। আদিমতার সঙ্গে ঘর করতে করতেই এরপর ক্রমশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠল এই অঞ্চল। সেই থেকে বারুইপুরকে জড়িয়ে রেখেছে হাজারো ইতিহাস, গল্প, কিংবদন্তিরা।
১৫১০ সালে নীলাচলে যাওয়ার পথে এই বারুইপুরেই পা রেখেছিলেন চৈতন্যদেব। একরাত্রি ছিলেনও অনুচর অনন্ত সাধুর কুটিরে। কথিত আছে, কুটিরের পাশেই আদিগঙ্গার ঘাটে বসে সারা রাত কীর্তন করেছিলেন চৈতন্যদেব। বারুইপুর প্লাবিত হয়েছিল সেই ভক্তিরসে। বারুইপুর শ্মশান-সংলগ্ন এই ঘাটটি এখন ‘কীর্তনখোলা ঘাট’ নামে পরিচিত।
গল্পরা এভাবেই জমাট বাঁধে বারুইপুরকে ঘিরে। তেমনই এক বিখ্যাত কিংবদন্তি রয়েছে লাঠিখেলা নিয়েও। বারুইপুরের বিখ্যাত গাজনমেলার অন্যতম আকর্ষণ এই লাঠিখেলা। জমিজমাকে কেন্দ্র করে বারুইপুরের জমিদার রায়চৌধুরীদের সঙ্গে বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরীদের বিবাদ ছিল বহুযুগের। সেই বিবাদই একবার চরম আকার নিল গাজনের মেলায় লাঠিখেলার সময়। সংঘর্ষের সময় বারুইপুরের রায়চৌধুরীদের লেঠেল-সর্দার তরবারির এক কোপে সাবর্ণদের লেঠেল সর্দার ভৃগুরামের মাথা নামিয়ে দিল ঘাড় থেকে। ভৃগুরাম সেযুগের বিখ্যাত লেঠেল। তাঁকে খুবই মান্যিগন্যি করত মানুষজন। ফলে, মৃত্যুর পরেও তাঁর দীর্ঘ কেশরাজি সংরক্ষণ করা হয়েছিল দীর্ঘদিন। এখনো নাকি গাজনমেলার সময় স্মরণ করা হয় ভৃগুরামকে।
তিনশো-সাড়ে তিনশো বছর আগেও বারুইপুরের জমিদাররা প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক লেঠেল নিযুক্ত করতেন। সেই ইতিহাসই আজো বহন করছেন বারুইপুরের ‘সর্দার’ পদবিযুক্ত অসংখ্য মানুষজন।
১৮৬৪ সালে এই বারুইপুর আদালতেই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এসেছিলেন বঙ্কিমচদ্র চট্টোপাধ্যায়। ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের কিয়দাংশ লেখা হয়েছিল এখানেই। একবার, জমিজমা সংক্রান্ত মামলায় বিচারক অর্থাৎ বঙ্কিমকে প্রভাবিত করতে রায়চৌধুরীরা কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছিলেন ব্যারিস্টার মাইকেল মধুসূদন দত্তকে। মাইকেলের কাব্য প্রতিভার দ্যুতি তখন বেশ ভালোমতোই ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সাহিত্যাকাশে। কিন্তু, বিচারকক্ষে মাইকেলকে রেয়াতই করেননি বঙ্কিমচন্দ্র। মামলায় হেরেও যান মধুসূদন। পরে স্মৃতিচারণায়, এই বারুইপুর-বাসকালীন সময়কে নিজের জীবনের উজ্জ্বলতম অধ্যায় বলেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।
এই বারুইপুরের নবগ্রামেই (মতান্তরে শ্যামপুরে) জন্মেছিলেন কৃষ্ণমোহন মুখোপাধ্যায় ওরফে বিখ্যাত রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন। ডিরোজিওর এই প্রিয়পাত্রর সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই নাকি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিতে আগ্রহী হয়েছিলেন মধুসূদন। বাংলার নবজাগরণেও কৃষ্ণমোহনের অবদান কম নয়। বারুইপুরে এসে কান পাতলে আজো শোনা যায় কৃষ্ণমোহন, মধুকবি, বঙ্কিমচন্দ্রকে ঘিরে নানা গল্প। সেই গল্পেই কখন মিশেছে কল্পনার রং। হয়তো বাসা বেঁধেছে কিংবদন্তিরাও। তাতে আরো নিবিড় হয়েছে বারুইপুরের ইতিহাস।
হান্টার সাহেব এবং ও’ম্যালির বিখ্যাত গেজেটেও বারুইপুরের উল্লেখ রয়েছে। ১৭৯৪ সালের একটি গেজেট থেকে জানা যায়, বাংলার নীলচাষের অন্যতম আদি কেন্দ্র ছিল বারুইপুর। উনিশ শতকের গোড়ায় এখানে তৈরি হয়েছিল বিরাট লবণগোলাও। ১৮৮২ সালে শিয়ালদা থেকে প্রথম বাষ্পচালিত ট্রেন চলাচল শুরু হয় বারুইপুরে। সেই সময় রেললাইন পাততে এবং বারুইপুর স্টেশন তৈরির জন্য প্রচুর পরিমাণে মাটি কাটতে হয়েছিল। সেই মাটি কাটার ফলেই তৈরি হয় বিরাট পুকুর। লোকমুখে যার নাম ‘কলপুকুর’। রেলপুকুর না হয়ে কলপুকুর নাম কেন? বাষ্পচালিত ট্রেনের ইঞ্জিনে জল দেওয়ার জন্য নাকি ওই পুকুরে মোটা মোটা পাইপের পাম্প থুড়ি ‘কল’ বসানো হয়েছিল। সেই থেকেই এমন নাম।
আর, বারুইপুরের নাম? বিপ্রদাসের ‘মনসামঙ্গল’ পঞ্চদশ শতাব্দীর। তখনও স্বনামে প্রতিষ্ঠিত এই অঞ্চল। অর্থাৎ, বারুইপুরের নামের ইতিহাসটিও নেহাত কম প্রাচীন নয়। কিন্তু, নামকরণের কারণ খুঁজতে গিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে ভাষাতাত্ত্বিক-পণ্ডিত-ঐতিহাসিকদের। গাছগাছালিতে ভরা বারুইপুরের উর্বর মাটিতে প্রচুর ফসল, ফলের ফলন হয়। বারুইপুরের পেয়ারা তো বিখ্যাত। এছাড়াও রয়েছে আম, লিচু, সবেদার বাগান। শসা, ডালিম, লকেট ফলের ফলনও বেশ ভালোমতোই হয় এই অঞ্চলে। এর কারণ, এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রাচুর্য। ঐতিহাসিকদের একদল, এই বৃষ্টিপাতকেই খুঁজে পেয়েছেন বারুইপুরের নামকরণের আড়ালে। তাঁদের মতে, বৃষ্টি অর্থাৎ ‘বারিপুর’ থেকেই বারুইপুর।
তবে, নামকরণের এই তত্ত্বকে নাকচ করে দিয়েছে ভিন্নমত। তাঁরা দেখাচ্ছেন, বারি নয়, বারুইপুর নামের মূলে রয়েছে ‘বারু’ অর্থাৎ পান। একসময়ে নাকি এই অঞ্চলে প্রচুর পানের চাষ হত। এখনো পানের বরজ দুর্লভ নয়। ফলে, বারুজীবী অর্থাৎ পানচাষীদের বসবাসের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চল। বারুজীবীদের বসবাসের অঞ্চল থেকেই নাকি বারুইপুর। এই মতটিও যে ফেলে দেওয়ার মতো নয়, বলাই বাহুল্য।
নামকরণের ধোঁয়াটে ইতিহাসের মতোই আরো নানা ইতিহাসকে জড়িয়ে বাঁচছে আজকের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার অন্যতম মহকুমা শহর বারুইপুর। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতাতেও উত্তাল হয়েছিল এই অঞ্চল। দেশপ্রেমী জমিদার দুর্গাদাস রায়চৌধুরী আর বারুইপুর কোর্টের উকিল সুশীতল ঘোষের আহ্বানে বিরাট জনসভা হয়েছিল রাসমাঠে। ১৯০৮ সালের একটি লেখায় অরবিন্দ ঘোষ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বারুইপুরের নাম।
চৈতন্যপূর্ব আমল থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম—বারুইপুরের ইতিহাসে ডুবে রয়েছে সময়ের এক বিস্তৃত অধ্যায়। নামকরণের স্থায়ী সমাধান না হোক, এই ইতিহাসে, নানা গল্পে-কিংবদন্তিতে বুঁদ হয়ে থাকতে জানে বারুইপুর। আর, নিছক নস্টালজিয়া নয়—গর্ব করার মতো নানা উপাদান তার এখনো রয়েছে। বারুইপুরের পেয়ারা, আম, লিচুদের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম।
তথ্যসূত্রঃ P. Thanakappan Nair, Calcutta in the 17th Century, Calcutta, 1986; L.S.S. O’Malley, Bengal District Gazetteers: 24 Parganas, Calcutta, 1911; মৃদুল দাশগুপ্ত, ফুল ফল মফস্সল, রোববার, প্রতিদিন, ৫ মার্চ, ২০১৭।