
পেনশনের টাকায় খেলা শেখান দুঃস্থ খেলোয়াড়দের
১৯৬৮ সাল থেকে ২০১৯, টানা ৫১ বছর ধরে টেনিস ব্যাট হাতে লড়ে চলেছেন টেবিল টেনিসের রানি ভারতী ঘোষ। ৭৫ বছর পার করলেও ক্রীড়াপ্রেমী অনেক মানুষ তাঁকে টেবিল টেনিসের রানিই বলেন। একসময় অন্যের খেলা দেখে নিজে খেলা শিখেছেন। আর আজ অন্যদের খেলা শিখিয়ে চলেছেন বহুবছর ধরে। দেশকে এই ৫১ বছরে বহু কৃতি টেবিল টেনিস খেলোয়াড় উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে অর্জুন পাওয়া মান্তু ঘোষের নাম সবার আগে উল্লেখ করতে হয়।

পুরো নাম ভারতী ঘোষ। ডাক নাম বাবলি। অনেকে আবার বাই সম্বোধনে ডাকেন। বাড়ি শিলিগুড়ি দেশবন্ধু পাড়ায়। উত্তরবঙ্গের অঘোষিত রাজধানী শিলিগুড়িকে অনেকে টেবিল টেনিসের শহর হিসাবে জানেন। জাতীয় ও রাজ্য স্তরে বহু টেবিল টেনিস খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে শিলিগুড়ি। এই টেবিল টেনিস উত্থানের পিছনে ভারতী ঘোষের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতীদেবী বলেন, টেবিল টেনিসই তাঁর একমাত্র সংসার। সন্তান হল বহু টেনিস শিক্ষার্থী। এই খেলাকে তিনি এতটাই ভালোবাসেন যে এর জন্য বিয়ে পর্যন্ত করেননি। ভারতীদেবী আমাদের জানান, “বাড়ি থেকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্ত আমি করিনি। কারণ সংসারে প্রবেশ করলে খেলার হয়তো ক্ষতি হতে পারে।”
ভারতীদেবী যখন সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন সেই সময় থেকে তাঁর আগ্রহ জন্মায় টেবিল টেনিসের প্রতি। বাবাকে হারান খুব ছোটোবেলায়। তখন সংসারে কিছুটা আর্থিক সংকট তৈরি হয়। মা, দাদা, দিদিরা তাঁকে বড়ো করেন। ছোটোবেলায় তাঁর এই টেবিল টেনিসের প্রতি আগ্রহ জন্মালে এক বন্ধুর মাধ্যমে নিউ সিনেমা হল লাগোয়া সায়গল ইন্সটিটিউটে যোগাযোগ করেন। সেখানে অনেকে টেবিল টেনিস খেলতেন। রোজ সেখানে গিয়ে অন্যদের খেলা দেখতে থাকেন। আর মাঝেমধ্যে একটু সুযোগ পেলেই ব্যাট হাতে সায়গল ইন্সটিটিউটেই টেবিল টেনিস অনুশীলন করে নিতেন। কারও কাছে তা শেখেননি। এভাবেই খুব অল্পসময়ে শিখে নেন টেবিল টেনিস। ব্যাট আর বলের প্রেমে পড়ে যান ভারতীদেবী। এভাবেই ১৯৭১ সালে হঠাৎ একদিন অসমে রেলের টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। আশ্চর্যজনকভাবে সেই প্রতিযোগিতার সব বিভাগে সফলও হন। তাঁর এই প্রতিভা দেখে রেলের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক প্রস্তাব দেন, তিনি চাকরি করবেন কিনা। রাজি হয়ে যান ভারতীদেবী। জুনিয়র ক্লার্ক হিসাবে তিনি রেলের চাকরিতে যোগ দেন। আর ২০০৩ সালে সুপারিন্টেনডেন্ট হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। রেলে চাকরির পাশাপাশি খেলার নেশা অনবরত চালিয়ে গিয়েছেন।
নিজে খেলেছেন। অন্যকে খেলিয়েছেন। যার ফলস্বরূপ আমরা মান্তু ঘোষের মতো অর্জুন পাওয়া টেবিল টেনিস তারকা পেয়েছি। পেয়েছি গণেশ কুণ্ডু, সুব্রত রায়, সঞ্জয় দে, প্রসেনজিৎ বসু-সহ আরও বহু টেবিল টেনিস খেলোয়াড়দের। এর বাইরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পাওয়া টেবিল টেনিস খেলোয়াড় পলি সাহা, শর্মিষ্ঠা হালদার, সোমা কুণ্ডু, সুরভি ঘোষ, নিমাই বণিক তাঁরই হাতে তৈরি।
যারা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া, টেনিস ব্যাট বা খেলার সামগ্রী কিনতে পারেন না, তাদেরকে নিজের পেনশনের টাকায় খেলার অনেক সামগ্রী কিনে দিয়ে নজির তৈরি করছেন। এই ৭৫ বছর বয়সে এসেও তিনি আরও ভালো ভালো খেলোয়াড় উপহার দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

এখন দেশবন্ধু স্পোর্টিং ইউনিয়ন ক্লাবে প্রতিদিন সকালে টেবিল টেনিস শেখান। আর বিকেলে অমিত আগরওয়াল ফাউন্ডেশনে গিয়ে চল্লিশ জন শিশুকে এই খেলা শেখান। প্রতিদিন খেলা শেখানোর জন্য সেই কেন্দ্রের চার তলায় ওঠেন সিঁড়ি বেয়ে। আর তাতে তাঁর কোনও ক্লান্তি বা আক্ষেপ নেই। ভারতীদেবী বলেন, “টেবিল টেনিসকে ভালোবাসি। শিশুরা আরও বেশি করে এই খেলা শিখুক। তাদের খেলা শেখাতে সিঁড়ি বেয়ে রোজ চারতলায় ওঠানামা করতে কোনও ক্লান্তি নেই আমার।”
