এক্সক্লুসিভ জগদীশচন্দ্র সরকার- পর্ব ২
(গত পর্বের পর)
কোচবিহার মহারাজার বিভিন্ন জায়গায় রাজবাড়ি ছিল। কলকাতার রাজবাড়ি উডল্যান্ডস, ১০৪ বিঘা জমির ওপর (যদিও এখন সেখানে উডল্যান্ডস নার্সিংহোম-সহ আরও অনেক বিল্ডিং রয়েছে)। দার্জিলিংয়ে রাজবাড়ি কলিনটন (বর্তমানে লালকুঠি)। দার্জিলিং ম্যাল থেকে শুরু করে জলাপাহাড় পর্যন্ত প্রায় সব বাড়ি কোচবিহার মহারাজার ছিল। এছাড়া মুম্বাই, বেনারসে কালীবাড়ি ও অতিথি নিবাসও ছিল। মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুর এবং তাঁর মা মহারানী ইন্দিরাদেবী গ্রীষ্মকালে দার্জিলিং আর বাকি সময়গুলো কোচবিহার, কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি, জয়পুর, বরোদা, মাদ্রাজ, পুনে এবং কোনো কোনো বছর ভারতবর্ষের বাইরে লন্ডন, আমেরিকা, ইতালিতে গিয়ে থাকতেন। যখন যেখানে যেতেন প্রয়োজনীয় লোকজন সঙ্গে নিতেন। অফিসের লোকজন থেকে শুরু করে ঠাকুর, চাকর, খানসামা, বাবুর্চি, মশালচি, ড্রাইভার, ক্লিনার, বেহারা, ধোপা, ঝি সবই সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তখনকার দিনে কলকাতা থেকে মহারাজা এবং মহারানী সাহেবরা স্যালুনে সুসজ্জিত রেলের কামরা করে শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট, চুয়াডাঙ্গা, পোড়াদা, ভেরামারা, পাস্কি, ঈশ্বরদি, সান্তাহার, হিলি হয়ে পার্বতীপুর পর্যন্ত ব্রডগেজে আসতেন। তারপর পার্বতীপুর থেকে মিটারগেজে আবার স্যালুনে করে খোলাহাটি, বদরগঞ্জ, শ্যামপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, গীতালদহ হয়ে কোচবিহার আসতেন। যখন ভারতবর্ষের বাইরে থেকে মহারাজা ফিরে আসতেন তখন কোচবিহার রেলস্টেশন থেকে রাজবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে কলা গাছ পুঁতে ফুলের মালা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হত।
জগদীশবাবু যখন রাজবাড়ির চাকরিতে যুক্ত হলেন সেইসময় মহারাজার মোটরগাড়ি ছিল রোলসরয়েস, কেডিলাক, ব্যান্টিলে, ফোর্ড, ডস, উইলিশ জিপ প্রভৃতি। মহারাজার পিলখানায় হাতি ছিল ২৫/২৬টি, আস্তাবলে ঘোড়া ও খচ্চর ছিল ১০/১২টি। এছাড়া কোচবিহার মহারাজা ভুপবাহাদুরের নিজস্ব একখানা ছোটো এরোপ্লেন ছিল। মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুর এবং তাঁর মা মহারানী ইন্দিরাদেবী সাহিবার মোটরগাড়ির কোনও নম্বর প্রয়োজন হত না। শুধু লাল প্লেটের ওপর কোচবিহার লেখা থাকত। আর মহারাজা মহারানী সাহেবাদের গাড়িতে যে পতাকা থাকত, তার রং ছিল সবুজ, কমলা ও লাল, মাঝখানে ত্রিশূল চিহ্ন। সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত রাজবাড়ির গম্বুজের মাথায় সারা রাত লাল বাতি জ্বলত।

১৯৫০ সালের পয়লা জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী (তখন প্রধানমন্ত্রীই বলা হত) ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় কোচবিহার রাজ্যকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করে একটি জেলায় পরিণত করেন। সেদিন থেকে কোচবিহার রাজ্যের সব কর্মচারীকে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারী হিসাবে গ্রহণ করা হল। হাউসহোল্ড বা রেকর্ডকিপার বিভাগের মধ্যে মহারাজা ভূপবাহাদুর যাদের রাখলেন, ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তাদের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পেনশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। মহারাজা ভূপবাহাদুর সেইসব কর্মচারীদের জন্য নতুন পেনশন, গ্র্যাচুয়িটি ইত্যাদি সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করে চুক্তি করেন। জগদীশবাবুরা কয়েকজন সেদিন থেকে আবার কোচবিহার মহারাজা ভূপবাহাদুরের প্রাইভেট কর্মচারী হিসাবে কাজে থেকে যান। ১৯৭০ সালে মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুর প্রয়াত হন। তার কোনো সন্তান না থাকায় তার ভাইয়ের পুত্র বীরাজেন্দ্র নারায়ণকে মহারাজা করার সিদ্ধান্ত হয়। পরে রাজন্যভাতা বিলোপ হওয়ায় মহারাজা বীরাজেন্দ্র নারায়ণ সব কর্মচারী আর রাখতে পারেননি। তিনি তাই অনেক কর্মচারীকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
রাজবাড়িতে দীর্ঘদিন কাটানোর স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে জগদীশবাবু আরও বলেন, “মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুর আমায় খুব বিশ্বাস করতেন। রাজার বিভিন্ন কাজে আমার ডাক পড়ত। মহারাজার সঙ্গে শিকারেও বের হতাম। রাজবাড়ির কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হয়েছে। বহু বিয়ের অনুষ্ঠানেও রাজবাড়ির হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছি। বিদেশী সাহেবদেরও রাজবাড়িতে আসতে দেখেছি। বাঘ শিকার করে রাজবাড়ি ফিরলে, সে বাঘের মাংস বিদেশীদের ওজন করে নিয়ে যেতে দেখেছি।” আবার একবার তাকে মহারাজার মা ইন্দিরাদেবী লন্ডনে নিয়ে যেতে চান বলে পাসপোর্টে তার পদকে চতুর্থ শ্রেণির করতে চান। অথচ তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মী ছিলেন। কিন্তু তিনি তার পদের অবমূল্যায়ন চাননি। মহারানী ইন্দিরাদেবীর নির্দেশে রাজপরিবারের পদস্থ অফিসারেরা তাঁকে বোঝান, পাসপোর্টে চতুর্থ শ্রেণির পদ লেখা হলে কিছু খরচ বাঁচবে। কিন্তু তিনি রাজপরিবারে যে পদে ছিলেন সেই পদেই থাকবেন। কিন্ত তাতে রাজি না হওয়ায় জগদীশবাবু লন্ডন যেমন যেতে পারেননি, তেমনই মহারানী ইন্দিরাদেবী বেশ কিছুদিন তার সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে তাঁকে এড়িয়ে চলেন।
এই বার্ধক্যে সেসব মূল্যবান ঐতিহ্যমন্ডিত ও ঐতিহাসিক স্মৃতি পাথেয় করে বহু শোকযন্ত্রণা ভুলে থাকার চেষ্টায় আছেন জগদীশবাবু। একাকী তাঁর ঘরে তিনি রাজপরিবারের বহু ছবি, বই হাতড়ে চলেছেন। ইতিহাসবিদরা তাঁর কাছে গেলে রাজপরিবারের ওইসব বহু রোমাঞ্চকর বিষয় মেলে ধরতে চান। এসব ইতিহাস বিশদে লিপিবদ্ধ না করলে বহু কিছু হারিয়ে যাবে, আর তাতে আগামী প্রজন্ম ক্ষমা করবে না।
(সমাপ্ত)