কোচবিহার রাজ-ইতিহাসের একমাত্র জীবন্ত সাক্ষী এখন কেমন আছেন?

এক্সক্লুসিভ জগদীশচন্দ্র সরকার- পর্ব ১

১৯৪৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি কোচবিহার মহারাজার চাকরি করেছেন। কিন্তু  চুক্তি অনুযায়ী শেষ মহারাজা বীরাজেন্দ্র নারায়ণের পক্ষে কর্মচারিদের গ্র্যাচুইটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ রাজার কাছে অর্থের অভাব ছিল। তাছাড়া রাজন্যভাতা বিলোপ হয়ে গিয়েছিল। ফলে মহারাজের পক্ষে সব কর্মচারীকে কাজে রাখাও সম্ভব ছিল না। তাই মহারাজা স্থির করেন, টাকার পরিবর্তে রাজবাড়ি এলাকার ভিতর থেকে কর্মচারীদের শ্রেণি অনুযায়ী জমি প্রদান করবেন। সেই অনুযায়ী তিনি দশ কাঠা জমি নিয়ে রাজবাড়ির চাকরি ছেড়ে চলে আসেন। তারপর বেশ কয়েকবছর কোচবিহারে কাটিয়ে সেখানে জমিজমা বিক্রি করে দেন পাকাপাকিভাবে শিলিগুড়ি থাকতে শুরু করেন।

জগদীশচন্দ্র সরকার, শিলিগুড়ির সুকান্তনগরে বাস। এখন তাঁর বয়স ৯৪ বছর ছুঁইছুঁই। জীবনে বহু করুণ, বেদনাদায়ক স্মৃতি আছে তাঁর। আবার মহারাজাদের সঙ্গে থেকে দাপটের মধ্যে কাজ করার বহু রোমাঞ্চকর স্মৃতিও আছে। ১৯৪১ সালের অক্টোবর মাসে এক রাতের মধ্যে তাঁর বাবা যাদবচন্দ্র সরকার এবং দুই দাদা রমেশচন্দ্র সরকার ও কনকচন্দ্র সরকার কলেরায় মারা যান। শিলিগুড়ি আসার পর কিছু দিন আগে জগদীশবাবু তাঁর স্ত্রী সোনা সরকারকে হারান। আবার এর মধ্যেই হারান বড়ো পুত্রকেও। এসব শোকের স্মৃতির মধ্যেই তিনি কোচবিহার রাজবাড়ির বহু স্মৃতি হাতড়ে চলেছেন। লিখে ফেলেছেন দু’টি স্মৃতিকথাধর্মী বই। একটি, ‘স্মৃতির আলোয় কোচবিহার ও অন্যান্য প্রবন্ধ’, অপরটি ‘জীবনকাহিনি’।

বৃদ্ধ বয়সে তাঁর একাকী ঘরে তিনি হাতড়ে চলেছেন কোচবিহার রাজপরিবারের বিভিন্ন পুরোনো ও দুস্প্রাপ্য ছবি। আওড়ে চলেছেন বিভিন্ন স্মৃতি। জগদীশবাবু কোচবিহার রাজপরিবারের এক জীবন্ত সাক্ষী। তাঁর কথায়, ১৯৬৮ সালের ২ অক্টোবর ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল জলপাইগুড়ি জেলায়। মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুর তখন লন্ডনে বিশেষ কাজে গিয়েছেন। তিনি লন্ডন থেকে দিল্লি ফিরবেন। আর ফেরার আগে কোচবিহার রাজবাড়িতে বার্তা পাঠিয়েছেন, এক লাখ টাকা নিয়ে জগদীশবাবু যেন দিল্লি পৌঁছে যান। যদি দিল্লিতে কোনো কারণে টাকার দরকার হয়, তাই রাজার হুকুম। হুকুম শোনামাত্রই রাজবাড়িতে হইহই রব। সেসময় আবার ঘোর বন্যা। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার সর্বত্র রাস্তাঘাট জলে থইথই। সেই অবস্থায় কোচবিহার এরোড্রোম থেকে বিমানে কলকাতায় যান জগদীশবাবু। বন্যার কারণে সেদিন বিমানে কোনও যাত্রী ছিলো না। শুধুমাত্র রাজার প্রতিনিধি হিসাবে একমাত্র তিনিই বাক্সের মধ্যে নগদ এক লাখ টাকা নিয়ে কোচবিহার থেকে কলকাতা, তারপর কলকাতা থেকে দিল্লি গেলেন।

১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কোচবিহার রাজবাড়িতে মহারাজাদের অধীনে কাজ করেছেন জগদীশবাবু। মোট দু’জন রাজার অধীনেই তিনি কাজ করেছেন। কোচবিহার তখন একটি করদ মিত্র রাজ্য। তার আয়তন ১৩০৭ বর্গমাইল। ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে জগদীশবাবু রাজবাড়ির তোষাখানা অফিসে চাকরিতে যোগদান করেন রেকর্ড কিপার হিসাবে। জগদীশবাবু বলেন, তোষাখানা অফিসের অধীনে অনেক লোকজন ছিল। ঝাড়িধরা, পাখাধরা, বোকনাধরা, তামাক বরদার, বল্লম সরদার, খাশ বরদার এবং অফিসের লোকজন। যখন যার যে কাজ সেসময় তাঁরা নিজের কাজে আসতেন। বল্লম বরদার, খাশ বরদারগণ রথযাত্রা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতেন। রথযাত্রায় মহারাজা ভূপবাহাদুরের হাতিগুলোকে সুন্দর পোশাক ও গহনা পড়িয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করানো হত।

(পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে আগামী সপ্তাহে)

Developed by DXDasia