হাওড়ার এই বাড়িতেই রামকৃষ্ণদেবকে উৎসর্গ করে স্বামীজি সর্বধর্মের মন্ত্রোচ্চারণ করেন

হাওড়ার রামকৃষ্ণপুরে পৌঁছে গেলেন স্বামী বিবেকানন্দ-সহ আরও ১৫জন সন্ন্যাসী

বাংলায় মাঘ মাসের প্রায় শেষ। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এখন ফেব্রুয়ারি, যদিও শীতের দাপট কমতে শুরু করলেও কাটেনি এখনও। গদাধর ঠাকুর চলে গেছেন তা প্রায় এগারো বছরের উপর হয়ে গেল। ঠাকুরের প্রিয় নরেন এর মধ্যে বিবিদিষানন্দ, সচ্চিদানন্দ হয়ে বিবেকানন্দে (Vivekananda) স্থিত হয়েছেন এবং আমেরিকা (America) জয় করে ফিরেছেন। এমনই একটি সময়ে, সালটা ১৮৯৮, তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি (১৩০৫ বঙ্গাব্দ) মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সকালবেলা গঙ্গার (Ganga) পশ্চিমপাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিল তিনটি নৌকা। নৌকাগুলি আসছে আলমবাজার মঠ থেকে, শীতের রোদ আর গঙ্গার বাতাস গায়ে মেখে। পৌঁছাবে হাওড়ার (Howrah) রামকৃষ্ণপুর ঘাটে। নৌকাগুলিতে আছেন স্বামী বিবেকানন্দ-সহ আরও ১৫ জন সন্ন্যাসী, গন্তব্য হাওড়া শিবপুর সংলগ্ন রামকৃষ্ণপুরস্থিত নবগোপাল ঘোষের ভদ্রাসন।

নবগোপাল ঘোষ ঠাকুরের গৃহী ভক্তদের তথা শিষ্যদের অন্যতম। তিনি ঠাকুরের আশীর্বাদধন্য এবং ১৮৮৬-তে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে ঘটা ঐতিহাসিক ‘কল্পতরু’ দিবসের সাক্ষী। নবগোপালের আদি নিবাস কলকাতার বাদুরবাগানে। তিনি কোনো একসময় খবর পান হাওড়ায় গঙ্গার কাছে এক পুরোনো পল্লি আছে, নাম ‘রামকৃষ্ণপুর’। নবগোপাল ভাবলেন, ওই অঞ্চলে বাড়ি তৈরি করলে, আর কিছু না হোক, দুবেলা নিজের ঠিকানা বলতেও ‘রামকৃষ্ণপুর’ বলতে হবে, সেই সূত্রে অবধারিতভাবে গুরুনাম উচ্চারিত হবে। এই চিন্তা থেকেই তাঁরা সপরিবারে চলে এলেন রামকৃষ্ণপুরে। বাড়ি তৈরির পর তাঁদের পরিবার মনস্থির করলেন বাড়িতে শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ (Ramkrishna) পরমহংসকে ঈশ্বররূপে প্রতিষ্ঠা করবেন এবং এই কাজের জন্য যোগ্যতম মানুষ অবশ্যই স্বামীজি। সেই কাজ সম্পন্ন করতেই হাওড়ায় স্বামীজির আগমন।

আজকের দিনে, এই অস্থির সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বামীজিরচিত এই মন্ত্রের বক্তব্য, ‘সর্বধর্মস্বরূপিণে’, রামকৃষ্ণ পরমহংসের মহিমাকে আরও ব্যাপৃত করেছে এবং তাঁর প্রাসঙ্গিকতাকে প্রতি মুহূর্তে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে।

রামকৃষ্ণপুর ঘাটে নৌকা আসার পর স্বামীজি-সহ অন্যান্য মহারাজরা খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করতে করতে নবগোপালের বাড়ির উদ্দেশ্যে চললেন। পথের দুধারে তখন স্বামীজিকে দেখার জন্য জনসমুদ্র উপচে পড়েছে। আজ স্বামীজির পরনে গেরুয়া বস্ত্র, শিরে ক্ষেত্রীর মহারাজের দেওয়া পাগড়ি। তিনি মাথায় করে নিয়ে আসছেন বার্লিনে তৈরি শ্রী রামকৃষ্ণের পোর্সিলিন নির্মিত বিশেষ পট। এই পট স্বামীজি নিজেই আমেরিকা থেকে ফেরার পথে নির্মাণ করে এনেছেন।

নবগোপালের বসতবাটিতে পৌঁছে নিজের হাতে ঠাকুরের সেই পট প্রতিষ্ঠা করলেন স্বামীজি। এ এক দিব্য মুহূর্ত, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সর্বপ্রথম কোথাও ঈশ্বররূপে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। পট প্রতিষ্ঠার পর পুজোয় বসে দেখা দিল এক বিপত্তি, স্বামীজির পাশে থাকা স্বামী প্রকাশানন্দ বললেন, ঠাকুরের পট তো প্রতিষ্ঠা হল, কিন্তু ঠাকুরের পুজো হবে কোন মন্ত্রে? ঠাকুরের পুজো করার মন্ত্র কোথায়?

প্রকাশানন্দের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকলেন বিবেকানন্দ, হয়তো তিনি ধ্যানস্থ হলেন। কিছু সময় পর স্বামীজি উচ্চারণ করলেন —

“ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্বধর্মস্বরূপিণে।

অবতারবরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নমঃ।।”

এবার ১৮৯৮ থেকে ফিরে আসা যাক ২০২২-এ। সেদিন নবগোপাল ঘোষের বাড়িতে ঠাকুরের পট প্রতিস্থা করার পর স্বামীজি যে প্রণামমন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন তা আজ ১৪০ বছর ধরে প্রত্যেক রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের কর্মী তথা ভক্তসমাজের কাছে বীজমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। আজকের দিনে, এই অস্থির সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বামীজিরচিত এই মন্ত্রের বক্তব্য, ‘সর্বধর্মস্বরূপিণে’, রামকৃষ্ণ পরমহংসের মহিমাকে আরও ব্যাপৃত করেছে এবং তাঁর প্রাসঙ্গিকতাকে প্রতি মুহূর্তে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে।

হাওড়ার রামকৃষ্ণপুরের ঘোষ বাড়িতে ১৯৯৮-এর ৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনা হয়তো কিছুটা সত্যি, কিছুটা মিথ। যদিও, ওই বাড়িটির সামনে শ্বেত পাথরের ফলকে সেদিনকার সমস্ত ঘটনা খদিত আছে।

পুনশ্চঃ

১৮৯৮-এর ৬ ফেব্রুয়ারি আরও দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ছিল রামকৃষ্ণপুরের নবগোপাল ঘোষের বাড়ি।

• সেদিন পুজোয় প্রথম সারদাদেবীর নামে সংকল্প হয়, যা পরবর্তীতে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বিভিন্ন পুজোয় দেখা যায়। এটিও একটি বিরলতম ঘটনা।

• সেই বিশেষ দিন স্বামীজি নবগোপালের বাড়িতে রামপাখির মাংস খাওয়ার আবদার করেন। স্বামীজিকে নবগোপালের স্ত্রী নিস্তারিণীদেবী রামপাখির মাংস রান্না করে খাওয়ান। রান্না খেয়ে স্বামীজি এতই প্রীত হন যে নিস্তারিণীদেবীকে কিছু উপহার দিতে চান, কিন্তু তিনি তো সন্ন্যাসী মানুষ, কীই বা উপহার দিতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীজি নিজের মাথার পাগড়ি খুলে নিস্তারিণীদেবীকে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই পাগড়ি আজও সেই বাড়িতে যথাযথভাবে সংরক্ষীত আছে।

 

ছবি – প্রণয় দাস

Developed by DXDasia