আন্দুল রাজবাড়ির গায়ে লেখা আছে ১৮৫ বছরের ইতিহাস

একসময় সরস্বতী নদীর স্রোত এই প্রাঙ্গণ পর্যন্ত অবাধ বিচরণ করত

কলকাতা থেকে সড়কপথে হাওড়ার মিষ্টি একটি শহরতলি মৌড়িগ্রাম। একটু পরেই আন্দুল। আন্দুল মানেই এক রাজবাড়ির রোমাঞ্চকর কাহিনি। বিশালাকৃতি এই রাজবাড়ি যে ভগ্নপ্রায়, তা কিন্তু বলা যাবে না। একসময় যে এই অট্টালিকা অপূর্ব দেখতে ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যায়। ১৮৫ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে এই বাড়ি। বাড়ির চারপাশ ঘুরলেই আপনার মনে হবে পাঁচিলের গায়ে ইতিহাসের গন্ধ মাখা। কীভাবে উঁকি মারছে ইতিহাস থেকে উঠে আসা এক একটি চরিত্র। স্থানীয় মানুষের কাছে বিভিন্ন গল্প শুনলে জানা যায়, হিন্দি ছবি ‘সাহেব-বিবি-গুলাম’-এর নাকি শুটিং হয়েছিল এই বাড়িতেই।

যাঁরা ঘুরতে ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে মনে হয় ঘুরে বেড়ানোর আলাদা করে কোনও সময় হয় না। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, দুই পা-ই ভরসা। কলকাতা থেকে মাত্র কিছুক্ষণের পথ। হাওড়ার ইতিহাস মাখা মফস্‌সল আন্দুল। রিক্সায় উঠলে চারপাশে দেখতে পাবেন অলিগলি পথ, বহু পুরোনো বাড়ি, আরও কত কী। আমাদের বাংলাতেই লুকিয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য রাজবাড়ি। সেইসব অট্টালিকাদের খোঁজ কি রাখি আমরা? 

সেইসময় আন্দুল রাজবাড়ির আদপকায়দাই ছিল অন্যরকম। ‘সাহেব-বিবি-গুলাম’ ছাড়াও শুটিং হয়েছে আরও বহু হিন্দি-বাংলা সিনেমার। অনেক পরে আন্দুল রাজবাড়ি হেরিটেজ বিল্ডিং-এর মর্যাদা পেয়েছে। বাড়ির সামনে বিরাট খোলা প্রাঙ্গণ। একসময় নাকি সরস্বতী নদীর স্রোত এই প্রাঙ্গণ পর্যন্ত অবাধ বিচরণ করত। এখন কোথায় সেই নদী! শীতকাল এলেই রাজবাড়ির দিকে মুখ করে আরামে, অলসভাবে কিছুক্ষণ চুপ করে নিশ্চিন্তে বসে থাকা যায় অথবা প্রাণ খুলে আড্ডা দেওয়াও যায়। বিকেল হলেই দেখা যায়, এলাকার ছেলেরা এসেছে ব্যাট-বল হাতে নিয়ে। অজস্র পায়রার ডাক আপনাকে কত কথা-কথকতা জানান দেবে।

আন্দুল রাজবাড়ি স্থাপিত হয় ১৮৩৪ সালে, স্থাপন করেছিলেন রাজা রাজনারায়ণ রায়বাহাদুর। আন্দুল রাজ পরিবারের সৃষ্টি হয় রামলোচন রায়ের হাত ধরে। তিনি ছিলেন লর্ড ক্লাইভের দেওয়ান। পরে ওয়ারেন হেস্টিংসেরও দেওয়ান হন। ওই সময়েই তিনি প্রভূত ধনম্পত্তির অধিকারী হন। আন্দুল রাজ পরিবারের সঙ্গে পাশাপাশি উচ্চারিত হয় শোভাবাজার রাজপরিবারের নাম। দু’টি পরিবারের সৃষ্টির ইতিহাস সমসায়য়িক বলেই জানান আন্দুল রাজ পরিবারের সদস্যেরা। তবে রাজবাড়ির আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে সহজে কেউ উত্তর দিতে চান না। পাশেই রয়েছে রাজবাড়ির অন্নপূর্ণা মন্দির। প্রবেশমুখেই রাখা রয়েছে কামান। পুজোয় প্রথম মোষবলি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কামানটি দাগা হত। সেই শব্দ পৌঁছে যেত সারা আন্দুলের ঘরে ঘরে। তারপর শুরু হত বাকি পুজোগুলি। মূল মন্দিরের দুইপাশে রয়েছে শিবমন্দির। এখনও বহু মানুষ এখানে পুজো দিতে আসেন।

সত্যজিৎ রায় ‘জলসাঘর’ ছবির একটি দৃশ্য এই রাজবাড়িতে শুট করেছিলেন। এই রাজবাড়ি ছাড়াও আন্দুলে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জায়গা রয়েছে। যেমন- ঝোড়হাট হরিসভা গৃহ, শঙ্করী মন্দির, কুণ্ডু চৌধুরী বাড়ি, পঞ্চানন্দ মন্দির, সাধক ভৈরবীর গুহা ইত্যাদি। আন্দুল এই নামটি কেন, তা নিয়ে নানান মতামত রয়েছে। সেই মতামতের রহস্য জানতে আপনাকে একবার ঢুঁ মারতে হবে এই মফস্‌সলে। ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেই দায়িত্ব কি সহজে ঝেড়ে ফেলা সম্ভব!

(প্রচ্ছদের ছবি উইকিমিডিয়া থেকে প্রাপ্ত)

কীভাবে যাবেন- কলকাতা থেকে গাড়ি করে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে যেতে। আন্দুল রোড ধরে আন্দুল পৌঁছে যাকেই জিজ্ঞেস করা যায়, রাজবাড়ির কথা সে-ই বলে দেবে। ট্রেনে করে গেলে, হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে আন্দুল নেমে রিক্সা বা টোটো করে আন্দুল রাজবাড়ি।

Developed by DXDasia