
দুঃস্থ খেলোয়াড়দের সাহায্য করেন নিয়মিত
কলেজে যেতে হলে ফুল প্যান্ট পড়া বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু তাঁর আর্থিক ক্ষমতা ছিল না। ফলে পায়জামাতে ভাতের মাড় দিয়ে মোটা করার চেষ্টা করতেন। ভেবেছিলেন, ভাতের মাড় পায়জামায় দিলে তা দেখতে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা মোটা হবে। আর সেই মোটা পায়জামা দেখে যদি কলেজ কর্তৃপক্ষ ফুলপ্যান্ট পড়ার বাধ্যবাধ্যকতা থেকে মুক্তি দেয়! কিন্তু না, মুক্তি পাওয়া যায়নি। শেষমেষ তাই পড়াশোনাকে বিদায় জানিয়ে কাজে নেমে পড়েন। সেসব সত্তরের দশকের কথা। পারিবারিক অভাব মেটাতে রিক্সা চালিয়ে শিলিগুড়ি শহরে দুধ ফেরি করেছেন, হাটে হাটে কখনও সব্জি কখনও ছাগল বিক্রি করেছেন। তারপর ক্রীড়া সামগ্রীর দোকানে মাসিক ১২৫ টাকা বেতনে কাজ করেছেন। আজ বাংলা তো বটেই, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রীড়া সরঞ্জাম তৈরির উৎপাদন জগতে তাঁর নাম বহু ক্রীড়া অনুরাগীর কাছে চর্চার বিষয়। তাঁর কারখানায় উৎপাদিত সামগ্রী অস্ট্রেলিয়ার সিডনি কিংবা কানাডাতেও সরবরাহ হচ্ছে। এই ক্রীড়া-শিল্পোদ্যোগী হলেন শিলিগুড়ির খোকন ভট্টাচার্য।
দেশের নানা প্রান্তে রয়েছে তাঁদের কারখানা
শিলিগুড়িতে তাঁর ক্রীড়া সামগ্রীর বিক্রয় কেন্দ্রে একসময় ভারতীয় ক্রিকেটের সেলিব্রিটি সুনীল গাভাসকার থেকে কপিলদেব, সৌরভ গাঙ্গুলি, সচিন তেন্ডুলকর, বিখ্যাত অ্যাথলিট পিটি উষা সকলেই এসেছেন। আর ভারতীয় ফুটবলের আইকন বাইচুং ভুটিয়া তো এখনও নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। শিলিগুড়িতে একসময় খেলাধুলার বড়ো আসর বসলে তিনি হয়ে উঠতেন অন্যতম মধ্যমণি। আজ তাঁর ক্রীড়া সামগ্রী বিক্রয় কেন্দ্র থাকলেও মূলত ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন বা কারখানাই মূল ধ্যানজ্ঞান। পাঞ্জাবের জলন্ধর থেকে কলকাতা এবং শিলিগুড়িতে রয়েছে কারখানা। তাঁরা খেলার বুট থেকে শুরু করে ফুটবল, পিংক বল, টেনিস বল, স্কিপিং রোপ, কিট ব্যাগ, টি শার্ট প্রভৃতি বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করছেন। সিকিম রাজ্য ফুটবল টিম তাঁদের তৈরি জার্সি ব্যবহার করে।
আরও পড়ুন: বিজ্ঞানী প্রণব কুমার সাহার ‘অন্যরকম’ চাষবাস
একসময় নিজেও ভালো ফুটবল খেলতেন খোকনবাবু। এখন শুধু ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন নিয়েই নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক কাজও করছেন। বিভিন্ন ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফুটবল দানও করেন। আবার অর্থ সমস্যা জনিত কারণে কোনও প্রতিভাবান খেলোয়াড় ক্রীড়া সামগ্রী কিনতে না পারলে তিনি সেসব বিনামূল্যে দান করেন। এর বাইরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের সাহায্য করা বা অন্য কোনও সামাজিক কাজ সবেতেই তিনি আছেন। তাঁর বাবা প্রয়াত দ্বিজেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, মা-ও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। আর তা থেকে সমাজ ও দেশের কাজ করতে তাঁর ভালো লাগে বলে তিনি জানিয়েছেন।
ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক কাজও তিনি করেন
তাঁর একমাত্র পুত্র গৌরব ভট্টাচার্য এখন তাদের ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভাবনায় দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন। নিয়ে আসছেন আধুনিক সব প্রযুক্তি। ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন বিষয়ে চিন থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণও নিয়ে এসেছেন গৌরব। বিদেশের মাটিতে ভারতীয় ক্রীড়া সামগ্রী পৌঁছে বিপণন করার জন্য কলকাতা প্রেস ক্লাবে বেশ কিছু দিন আগে তরুণ সম্ভাবনাময় শিল্পোদ্যোগী হিসাবে সংবর্ধিতও হয়েছেন গৌরব।
সিকিম রাজ্য ফুটবল টিম তাঁদের বানানো জার্সি ব্যবহার করে
শিলিগুড়িকে এখন স্পোর্টস সিটি হিসাবে দেখতে চান গৌরব। তাঁর কথায়, পৃথিবীতে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। তাই এমন কিছু কাজ করে যেতে হবে যাতে আগামী প্রজন্ম আরও ভালো করে মনে রাখতে পারে। বিভিন্ন ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদনে বিভিন্ন ডিজাইন তৈরির জন্য বাবাকে সহযোগিতা করেন গৌরব। ফুটবল বুট প্রয়োজনে তিনি সেলাইও করতে পারেন আবার বিদেশে গিয়ে মার্কেটিংও। খোকনবাবু বলেন, বাংলার ছেলেমেয়েদের চাকরি মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তৈরি করতে হবে স্বনির্ভর হওয়া বা কারখানা তৈরির মানসিকতা। আর এরজন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ কেউ চাইলে তিনি স্বেচ্ছায় তা দিতে প্রস্তুত।

