সৌরদীপ দত্তের Cycle Of Eternity : বাংলা সিনেমার নতুন ভাষা

অস্কার উত্তীর্ণ রেইনডান্স চলচ্চিত্র উৎসবে হয়েছে এই ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার

ছবির একটি দৃশ্য (বাঁদিকে) এবং পরিচালক সৌরদীপ দত্ত (ডানদিকে)

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আন্দ্রেই তারকোভস্কি (Andrei Tarkovsky) বলেছিলেন, যারা নিজস্ব জগৎ তৈরি করতে সক্ষম হন তারাই সাধারণত কবি। কলকাতার তরুণ পরিচালক সৌরদীপ দত্ত (Souradeep Datta)-এর একটি ছবি দেখে মনে হয় সিনেমার কাব্যময়তা তাঁকে নতুন জীবন দিয়েছে। এ জীবন একজন কবির। তাঁর স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘সাইকেল অফ ইটারনিটি’ (Cycle Of Eternity) আসলে ব্যক্তিজীবনের চুরমার করা কবিতার টুকরো বিশেষ। কবিতার আঙ্গিকে চলচ্চিত্র, তার ইতিহাস বহু প্রাচীন ও ব্যাপৃত। আলোচ্য ছবিতে সৌরদীপ জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে কোন সুদূর মেঘজমা ভাঙা হৃদয়ের কথা বললেন, যেখানে গল্পের শুরু কিংবা শেষ রইল না। এই চিরন্তন মাধুর্যই আসলে জীবন, এই শেষ হয়ে যাওয়াই মরণের ধ্রুব সত্য। সাইকেল অফ ইটারনিটি অর্থাৎ চিরকালীন চক্র আসলে সদ্যজাত আর মৃত্যুপথ যাত্রীর মুলাকাত।

অফিশিয়াল পোস্টার

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে (২০২৩ সালে) লন্ডনের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র উৎসব রেইনডান্স-এ (Raindance Film Festival) ভারতের একমাত্র ছবি হিসেবে মনোনীত ছিল সৌরদীপ দত্তের সাইকেল অফ ইটারনিটি। রেইনডান্স অস্কার উত্তীর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব। বিশ্বের স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অন্যতম বড়ো মঞ্চ। সৌরদীপ মারফৎ জানা গিয়েছে, প্রতিবছর সারা পৃথিবী থেকে প্রায় কয়েক হাজার ছবি জমা পড়ে। সেখান থেকে বেছে নেওয়া হয় চল্লিশটি ছবি। তার মধ্যে থেকে আবার মাত্র পাঁচটি ছবি মনোনীত হয় রেইনডান্সে। ২০২৩ সালে ভারত থেকে একমাত্র সৌরদীপের ছবিটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ছবিতে কীভাবে উঠে এল মৃত্যু চেতনা আর কেনই বা মৃত্যু চেতনা! বঙ্গদর্শন.কম-কে সৌরদীপ দত্ত বলেন, “মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোলা যায় না, চিরকাল থেকে যায়। তবে আমাদের অস্তিত্ব কি সহজেই নিঃশেষ হয়ে যায়? হয়তো না। মৃত্যুকে ছাপিয়েও একটা সত্তা রয়েছে। জীবন অনেক বড়ো। আবার মৃত্যু স্বাভাবিক ও সত্য। এই মৃত্যুকে কোন দর্শনের মধ্যে দেখলে যন্ত্রণা থেকে উত্তরণ সম্ভব, সেই ভাবনাই আসলে এই ছবিটার মূল ভিত্তি।”

ছবির কাহিনি বলা একজন চলচ্চিত্র সমালোচকের কাম্য নয়। তবে পাঠকদের সুবিধার্থে সংক্ষেপে বলে রাখা প্রয়োজন। একজন মৃত মা তার মেয়েকে দেখতে পান একটি প্রস্ফুটিত গাছের মধ্যে, আর মেয়ে তার মাকে দেখতে পায় কাঠের আলমারির ভেতর। জীবন এবং মৃত্যুকে অতিক্রম করে, এই ছবি একটি চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের সন্ধানে ঘোরাফেরা করে। যদিও এই ছবিটি নির্দিষ্ট কোনো সরলরৈখিক গল্প ধরে এগোয়নি। অনবরত ওঠানামা চলন তার আঙ্গিকের। সদা ঘূর্ণায়মান। সাইকেলের মতোই। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রেম, ভালোবাসা, চুম্বন, যৌনতার সন্ধানে এক যুগল। তাদের ভালোবাসার চিরন্তন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নারী-পুরুষের সন্তান। যেন সে প্রতীক।

অফিশিয়াল ট্রেলার দেখুন এখানে ক্লিক করে

চলচ্চিত্রের নিজস্ব একপ্রকার ভাষা রয়েছে। কালোত্তীর্ণ সিনেমা ধারণ করে রাখে নিজস্ব সেই ভাষা। সৌরদীপের ছবিটিকে সিনেমা না বলে ভিডিওআর্টও বলা যেত। চমৎকার কিছু দৃশ্য, চমৎকার অভিনয়, অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে চরিত্রদের বোঝাপড়া, ছবির শ্লথ গতি, আকর্ষণীয় আবহের ব্যবহার, দক্ষ চিত্রনাট্য, ছবির মেজাজের সঙ্গে মানানসই সম্পাদনা – একটি ছবিতে যা যা থাকার সবই আছে। তৎসত্ত্বেও কিছু দৃশ্য ‘অতিরিক্ত’ হয়ে থেকে যায় কিংবা জোরপূর্বক বলে মনে হয়, যার ফলে ছবির গতি শ্লথ থেকে শ্লথতর হয়ে যায়। দর্শক হিসেবে দেখতে মন্দ লাগে না, কিন্তু কাহিনি বা চরিত্রায়নের সঙ্গে যুক্তিও খুঁজে পাওয়া যায় না অনেকসময়। তবে এই সমালোচনা মোটা কালিতে দাগ দিয়ে বলার কিছু নেই। কারণ সে সামান্যই এবং তা উপেক্ষাও করা যায়। বরং ছবি শেষে ব্যক্তি দর্শক কিছু প্রশ্ন আর উত্তরের সন্দিহানে হাতড়ে মরে। হয়তো গুমরে ওঠে। এটিই সৌরদীপ দত্তের ছবি সাইকেল অফ ইটারনিটির জয়। এটিই নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের জয়।

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে (২০২৩ সালে) লন্ডনের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র উৎসব রেইনডান্স-এ ভারতের একমাত্র ছবি হিসেবে মনোনীত ছিল সৌরদীপ দত্তের সাইকেল অফ ইটারনিটি। রেইনডান্স অস্কার উত্তীর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব। বিশ্বের স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অন্যতম বড়ো মঞ্চ।

শ্যুটিং-এর মুহূর্ত

ছবির দৃশ্য

সৌরদীপের জন্ম নদিয়ার কৃষ্ণনগর শহরে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি সিনেমার খুঁটিনাটি শিখেছেন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। এই চেষ্টা থেকেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন সিনেমার নিজস্ব ভাষা। ফার্মেসি পড়েছেন। পাশাপাশি চলেছে গান আর লেখালেখির যাপন। খুঁজে পেয়েছেন সিনেমার বন্ধুত্বকে। ক্রমশ ঝুঁকেছেন ভারতীয় দর্শন আর পাশ্চাত্যের রোমান্টিকতায়। লন্ডনের রেইনডান্স চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে সৌরদীপ জানান, “রেইনডান্সে গিয়ে বুঝলাম ওখানকার দর্শক সিনেমা নিয়ে কী মারাত্মক প্যাশনেট। ওঁদের কোনোকিছু নিয়েই ছুৎমার্গ নেই। বরং নিরীক্ষামূলক সিনেমা দেখে তাঁরা উচ্ছ্বসিত হন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। এই উষ্ণ অভর্থ্যনা আমাকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। সেখানে ভারত কিছুটা হলেও এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমা নিয়ে ভাবিত নয়। এখানে তো এখনও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নিজস্ব মঞ্চ তৈরি হল না। অথচ সেই জন্মলগ্ন থেকে বাংলা ছবি (ব্যতক্রমী) পৃথিবীর বড়ো বড়ো চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নিয়েছে, পুরস্কৃত হয়েছে। এখনও আমাদের দেশ স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি আর তথ্যচিত্রকে নিচু চোখেই দেখেন। সিনেমা নিয়ে উন্মাদনা থাকলে সব ঘরানার সব আঙ্গিকের ছবিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।”

শ্যুটিং-এর মুহূর্ত

রেইনডান্স চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হওয়ার পর আরও কিছু জায়গায় মনোনীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে এই ছবির। তেমনটাই আশা করেন পরিচালক। সাইকেল অফ ইটারনিটি ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিশ্বজিৎ দাস, শ্রীতমা দে, কাজল শম্ভু এবং মিতালি হাজরা। মানস ভট্টাচার্যের চিত্রগ্রহণ, সৌগত ব্যানার্জির শব্দ, মেঘ ব্যানার্জির আবহ সংগীত, অমিত কুমারের করা রং, দেবরাজ নাইয়ার সহ-প্রোডাকশন ডিজাইন, জগন্নাথদেব মণ্ডলের সৃজনশীল পরিচালনা এই ছবির মূল স্তম্ভ। সম্পাদনা, চিত্রনাট্য, পরিচালনার মতো একাধিক বিভাগ একা হাতে সামলেছেন সৌরদীপ নিজেই। ছবিটির প্রধান প্রযোজক সৌরদীপ দত্ত, মাসুদ আহমেদ লস্কর ও সন্দীপন মল্লিক।

Developed by DXDasia