Whispers Of Fire & Water : লোকার্নোর প্রতিযোগিতা বিভাগে পরিচালক লুব্ধক চ্যাটার্জির ছবি

৭৬তম লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে বাঙালি পরিচালকের ছবি-যাত্রা

আগুন চোখে তার দহন আলোর ইশারা
সে আকাশ ভেবে জড়িয়ে ধরে
সে তার চোখের বিরাম
অকূল ধারায় বৃষ্টি নামে
গহন সবুজ যে শরীরে
সেখানে শুধু জলের দাগ
আর জলের দাগ

ঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাওয়া তেজ/আগুন এবং অপ/জলকে এ মহাবিশ্বের দার্শনিকরা নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন। আর একালের পরিচালক লুব্ধক চ্যাটার্জির চলচ্চিত্রে মানুষের মন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে তার পথ হয়ে ওঠে আগুনের, আরেক পথ নরম জলের। Whispers Of Fire & Water — লুব্ধক চ্যাটার্জির (Lubdhak Chatterjee) প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাংলা চলচ্চিত্র। প্রকৃতির দুই মেজাজকে কেন্দ্র করে এ ছবির কাহিনি সমান্তরাল ভাবে এগিয়েছে দুই দিকে। যে গল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছে শিবা।

শিবা। একজন অডিও ইনস্টলেশন শিল্পী। শব্দ নিয়ে যাঁর কাজ। পূর্ব ভারতের বৃহত্তম কয়লা খনি পরিদর্শন করছেন তিনি। তাঁর চোখের সামনে ধরা পড়ছে প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়। শেষমেশ তাঁকে জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়৷ শিবা চলে যান জঙ্গলের একটি উপজাতীয় গ্রামে। এখানেই আখ্যানের দ্বিতীয় ভাগ। শিবার মন তখন সমস্ত শহুরে আবরণ ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। নিজের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেন নিজেকেই। জঙ্গলের ভিতর বয়ে যায় স্রোতস্বিনী জল। কয়লাখনির আগুন যেমন তাকে রাজনৈতিক করে তোলে, তেমনই জল এখানে এক উপাদান হিসেবে সত্যের জন্য তার অনুসন্ধানের গোলকধাঁধা তৈরি করে।

এ ছবির মূল চরিত্র একজন অডিও ইনস্টলেশন শিল্পী। অতএব তার চরিত্রটি চারপাশের নানান শব্দ দিয়ে বোনা হয়েছে। দুটি ভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এই ছবির প্রেক্ষাপট। একটি ধানবাদের কাছে ঝড়িয়া নামক এক কয়লাখনি অঞ্চলে, যেখানে প্রায় একশো বছর ধরে আগুন জ্বলছে। আগুন সেখানকার একটা বড়ো অঞ্চল খেয়ে নিচ্ছে ক্রমশ।

এমনই একটি বিষয় নিয়ে ছবি বানিয়েছেন লুব্ধক। ২০২১ সালে নির্মিত এই ছবিটি এবার পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র উৎসবে। ৭৬তম লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসব-এর (Locarno Film Festival 2023) সমসাময়িক চলচ্চিত্র নির্মাতা (Filmmakers of the Present) বিভাগে। সেইসঙ্গে সম্মাননীয় গ্রিন পার্দো অ্যাওয়ার্ডে (Green Pardo Award) মনোনীত হয়েছে এই ছবি।

Whispers Of Fire and Water ছবির নায়ককে কেন একটা অন্তর্লীন রাজনীতির সামনে দাঁড় করাতে চাইলেন লুব্ধক! কথা প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি বলেন, “আমি চেয়েছিলাম আমার ছবির নায়ক শিব এমন এক ব্যবস্থার সম্মুখীন হোক, যা বছরের পর বছর ধরে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করছে। চেয়েছিলাম তার সযত্নে বোনা শহুরে পরিচয়ের সম্মুখভাগটি ভেঙে যাক। কারণ গ্রামীণ জীবনযাত্রায় কীভাবে সে নিজের সঙ্গে মোকাবিলা করছে এবং চারপাশের শব্দ কীভাবে বারবার তাকে আঘাত করছে, এটাই আসলে বোঝাতে চেয়েছিলাম।”

এ ছবির মূল চরিত্র একজন অডিও ইনস্টলেশন শিল্পী। অতএব তার চরিত্রটি চারপাশের নানান শব্দ দিয়ে বোনা হয়েছে। দুটি ভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এই ছবির প্রেক্ষাপট। একটি ধানবাদের কাছে ঝড়িয়া নামক এক কয়লাখনি অঞ্চলে, যেখানে প্রায় একশো বছর ধরে আগুন জ্বলছে। আগুন সেখানকার একটা বড়ো অঞ্চল খেয়ে নিচ্ছে ক্রমশ। ছবির দ্বিতীয় আখ্যানভাগ জুড়ে রয়েছে পালামৌর জঙ্গল। শিব আসলে এই দুটি প্রাকৃতিক উপকরণ চাক্ষুষ করে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। সামাজিক-রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনই নিজের কাছে প্রশ্নও আছে। নিজের কাছে প্রশ্ন আসলে শিল্পী হিসেবে। যে আর্টফর্ম নিয়ে কাজ করছে তার গুরুত্ব কতখানি, সেটা চরিত্রের কাছে আয়নার মতো ধরা দেয়। এটাকেই হয়তো ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বলা যায়। সেখানে মানুষ আর প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক এসেছে কীভাবে! আর কীভাবেই বা জন্ম নিল এই ছবি! এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে লুব্ধক বলেন, “কর্মসূত্রে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হত। যদিও আমার ব্যাকগ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, তারপর সিনেমা পরিচালনায় ঝাঁপিয়েছি। এমতাবস্থায় একটা তথ্যচিত্রের প্রস্তাব আসে ২০১৮ সালে, যার জন্য আমাকে ঝাড়খণ্ড যেতে হয়। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মিশতাম আর চুপ করে বসে থাকতাম। আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ ছিল যে, আমার বড়ো হওয়া একটা শহুরে জায়গায়, যার সঙ্গে ঝাড়খণ্ডের ওই মানুষগুলোর জীবনযাত্রার কোনো মিলই নেই। আমি এগুলোই আসলে বোঝার চেষ্টা করতাম মানুষের সঙ্গে গল্প করে। শুধু তাই নয়, জায়গাটা নিয়েও অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। জায়গাটার চরিত্র বোঝার চেষ্টা করলাম। ধানবাদে গিয়ে দেখলাম চারদিকে আগুন। ওই পরিবেশ-পরিস্থিতিগুলোই আসলে আমাকে এই ছবিটা বানাবার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।” ২০২০-র জানুয়ারি থেকে এই ছবির মূল যাত্রা শুরু হয়। তবে লুব্ধক এ-ও জানান যে, তাঁর কিছু প্রশ্ন শিবা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি আদতে এই চরিত্র নন। এ ছবিতে তাঁর ব্যক্তিগত জার্নি দেখাতে চাননি। শিবা আসলে একটা কেস স্টাডি।

উল্লেখ্য, ভারতের পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং ট্রাস্ট এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক কর্তৃক কমিশনকৃত লুব্ধকের তথ্যচিত্র ‘বৈখরী’ (২০১৮) দুরদর্শনের ফেলোশিপ জিতেছিল। এরপর তাঁর পরীক্ষামূলক ছোটোছবি ‘আহুতি’ (২০২০) নির্বাচিত হয় রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। পেশাগতভাবে চিত্রগ্রাহক এবং সম্পাদক হিসেবে একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন লুব্ধক। Whispers Of Fire and Water তাঁর প্রথম পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি।

যেহেতু ছবির প্রধান চরিত্র একজন অডিও ইন্সটলেশন শিল্পী, তাই পুরো ছবির আবহ জুড়ে শব্দ ভাবনা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। যা দক্ষ হাতে সামলেছেন এই ছবির শব্দ নির্মাতা সৌগত ব্যানার্জি (Sougata Banerjee)। বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে সৌগতর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “শিবা এখানে প্রকৃতি থেকে শব্দ সংগ্রহ করে এবং পরে সেগুলো থেকে ইন্সটলেশন ডেভেলপ করে। প্রথম থেকেই এই কাজটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, কারণ শুধুমাত্র সাউন্ড নিয়ে এত বড়ো পরিসরে তেমন কেউ ভাবেন না। এখানে তো ছবির অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে সাউন্ডের উপর ভিত্তি করে। প্রথমত সাউন্ড, দ্বিতীয়ত ছবির মূল চরিত্রকে সেইভাবে অভিনয়টাও করতে হবে। তাঁকে কিছুটা হলেও জানতে হবে কিছু টেকনিক্যাল জিনিস। ছবিতে লোকেশন সাউন্ড হয়েছিল। রেকর্ডিস্ট হিসেবে তাঁর ঠিক কী কী করা উচিত, সেইটা অভিনেতাকে জানতে হয়েছে সবার প্রথমে। অর্থাৎ আমাকে নিজের কাজ যেমন সামলাতে হয়েছে, তেমনই অভিনেতাকে রেকর্ডিস্টের চরিত্রে সত্যতা আনার জন্যেও দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।”

সৌগত জানান, পোস্ট প্রোডাকশনে সম্পাদনার সময় লোকেশন সাউন্ড এবং অ্যাম্বিয়েন্স ডিজাইন করে তাঁরা এডিট টেবিলে বসতেন। শব্দ আর সম্পাদনা খুব একটা আলাদা নয়। এই দুটো বিভাগ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে। সম্পাদকের যেমন শব্দ বোঝা জরুরি, তেমনই শব্দ নির্মাতাকেও সম্পাদনা বুঝতে হয়। সৌগত জানান, “আমি আর লুব্ধক দীর্ঘদিন ধরে এই কাজটার মধ্যে পড়ে থেকেছি। লুব্ধক প্রথমেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিল, একটা ছবি করতে যাচ্ছি যে ছবিটার মূল চরিত্রই সাউন্ড ইন্সটলেশন শিল্পী। তাই এই ছবিতে শব্দের মাত্রাকে সেই জায়গায় নিয়ে গেলে তবেই তা বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে।”

লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের অন্যতম নামী উৎসবগুলির মধ্যে একটি। লোকার্নোয় বাঙালি যোগ আসলে বহু ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৬১ সালে লোকার্নোয় নির্বাচিত হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের তথ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের তিনটি ছবি লোকার্নোয় নির্বাচিত তো হয়েছিলই, সঙ্গে পুরস্কারও জিতেছিল – ‘দূরত্ব’ (১৯৭৯), ‘নিম অন্নপূর্ণা’ (১৯৮০) এবং ‘গৃহযুদ্ধ’ (১৯৮২)। এছাড়াও গৌতম ঘোষের ‘দখল’ (১৯৮২), অপর্ণা সেনের ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’ (২০২২), ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘অন্তরমহল’ (২০৫৫) পায় বিশেষ পুরস্কার। ১৯৯০ সালে রাজা মিত্রের ‘একটি জীবন’ প্রদর্শিত হয় লোকার্নোয়। পরবর্তীকালে ১৯৯০ সালে লোকার্নোর রেট্রোস্পেকটিভে দেখানো হয় ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’। ২০০৭ সালে আশিস অভিকুন্তকের ছবি ‘নিরাকার ছায়া’-ও লোকার্নোতে মনোনীত হয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের তরুণ পরিচালক মেহেদি হাসানের ছবিও জায়গা করে নেয় এই উৎসবে। ২০২৩ সালে নতুন সংযোজিত হল লুব্ধক চ্যাটার্জির Whispers Of Fire and Water। যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, আগুন ও জলের ফিসফিস।

এই ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাগ্নিক মুখার্জি। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করেছেন অমিত সাহা, রোহিনী চ্যাটার্জি, সৈকত চ্যাটার্জি, দীপক হালদার। সংগীতের দায়িত্বে রোহন বোস। প্রোডাকশন ডিজাইন করেছেন ডোনা বোস। চিত্রগ্রাহক কেনিথ সাইরাস। সম্পাদনা করেছেন অর্জুন গৌরীসারিয়া এবং লুব্ধক চ্যাটার্জি। শব্দ নির্মাণ ও মিশ্রণ করেছেন সৌগত ব্যানার্জি। চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় লুব্ধক চ্যাটার্জি। এ ছবির চারজন প্রযোজক যথাক্রমে বৌদ্ধায়ন মুখার্জি, মোনালিসা মুখার্জি, শাজি ম্যাথিউ এবং অরুণা আনন্দ ম্যাথিউ। প্রযোজনা সংস্থা লিটল ল্যাম্ব ফিল্মস এবং নিভ আর্ট মুভিস।

আগামী ৮, ৯ ও ১০ অগাস্ট পরপর তিনদিন লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হবে এই ছবি। ৮৩ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটিতে রয়েছে বাংলা ও হিন্দি দুই ভাষা। আপাতত লুব্ধক তৈরি হচ্ছেন সুইজারল্যান্ডের লোকার্নোয় পাড়ি দেবার জন্য।

লেখার শুরুতে ব্যবহৃত কবিতাটি লেখকের নিজের (সুমন সাধু)
ছবি সৌজন্যে: লুব্ধক চ্যাটার্জি

Developed by DXDasia