একমাত্র ভারতীয় ছবি হিসেবে Cannes-এর প্রতিযোগিতা বিভাগে যুধাজিৎ বসুর ‘নেহেমিচ’

Cannes-এ যাওয়ার আগে এ প্রসঙ্গে বিশদে জানাচ্ছেন পরিচালক

ঋতুস্রাবকালীন অবস্থায় দুই বোন নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একজন পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে নতুন ভাবে বাঁচতে চাইছে। অন্যজন পুরুষদের বিশ্বাস করতে বারণ করছে। মহারাষ্ট্রের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ঘরের গল্প এভাবেই বুনেছেন এফটিআইআই-এর প্রাক্তন ছাত্র যুধাজিৎ বসু (Yudhajit Basu)। নেহেমিচ (Nehemich) – মারাঠি ভাষায় নির্মিত ২৩ মিনিটের এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট জুড়ে রয়েছে মহামারী আর প্রত্যন্ত একটি গ্রামের ভয়াবহ প্রথা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই বছর বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ৭৬তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের (76th Cannes Film Festival) প্রতিযোগিতা বিভাগে একমাত্র ভারতীয় ছবি হিসেবে মনোনীত হয়েছে কলকাতার পরিচালক যুধাজিতের ‘নেহেমিচ’। এটি তাঁর ডিপ্লোমা ছবি।

ছবি সৌজন্যে: কান চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়েবসাইট

ভারতীয় সমাজে সেই আদিকাল থেকেই ঋতুস্রাবের সময় মেয়েদের সামাজিকভাবে নানান নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। শহরাঞ্চলে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে মেয়েরা কিছুটা মুক্তি পেলেও প্রত্যন্ত গ্রামে এখনও এই ট্যাবু রয়েই গেছে। ঋতুস্রাব চলাকালীন মেয়েদের অশুচি বলে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন না মেয়েরা। এমনকি মন্দির, বাড়ির ঠাকুরঘর ও রান্নাঘরেও ঢুকতে দেওয়া হয় না। তবে মহারাষ্ট্রের অন্যতম দরিদ্র ও অনুন্নত জেলা গাডচিরোলির মাদিয়া সম্প্রদায়ের মেয়েদের ঋতুস্রাবের সময় চরম বিধিনিষেধের সম্মুখীন হতে হয়, যা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার চেয়েও ভয়ংকর। যুধাজিৎ বসু করোনাকালীন সময়ে গণমাধ্যম থেকে জানতে পারেন এই গ্রামের মেয়েদের কথা। যুধাজিতের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঋতুস্রাবের সময় প্রতি মাসের ওই পাঁচদিন প্রথাগত নিয়ম মেনে তাদের থাকতে হয় একটা কুঁড়েঘরে। যাকে মারাঠি ভাষায় বলা হয় গাঁওকার (Gaokar)। এর অর্থ গ্রাম, অর্থাৎ গ্রামের মধ্যে আরেকটি গ্রাম। যদিও এর আরও একটি অর্থ রয়েছে – পিরিয়ড হাউস (Period House/Huts)। শুধু তাই নয়, এই কুঁড়েঘরগুলো হয় মূলত গ্রামের একেবারে বাইরে, জঙ্গলের কিনার ঘেঁষে। অর্থাৎ এই সময়টা মেয়েদের একঘরে হয়ে থাকতে হয়। কোনো পুরুষ মানুষের মুখদর্শন পর্যন্ত করা যায় না। যদি কোনো পুরুষ তাদের ছুঁয়ে ফেলে, তাহলে ওই পুরুষকে স্নান করতে হয়, এমনকি ওই ‘অপবিত্র’ মেয়েকে ছুঁয়ে ফেলার কারণে সেও ‘অপবিত্র’ হয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। গ্রামের এটাই প্রথা। এখানে কোনো অন্যায় যেমন দেখেন না বাড়ির পুরুষেরা, তেমনি মহিলারাও এই ‘প্রথা’ মেনে চলছেন দিনের পর দিন। যুধাজিতের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই গ্রামে কাজ করছেন, চেষ্টা করছেন মেয়েদের এই ভয়ংকর প্রথা থেকে উদ্ধার করতে।

কাজটি করার সময় গাডচিরোলিতে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি যুধাজিৎ। কারণ সেখানকার অধিকাংশ মেয়েরাই এই প্রথাকে আশীর্বাদের মতো দেখেন। যুধাজিৎ কথা বলেছিলেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে। এ বিষয়ে কিছু তথ্যচিত্র দেখেছিলেন। পাশাপাশি চলেছে নিরন্তর গবেষণা। যুধাজিতের সঙ্গে ছবিটি লিখেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী পৃথ্বীজয় গাঙ্গুলি, যাঁর জন্মস্থানও কলকাতা।

ছবি সৌজন্যে: কান চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়েবসাইট

বঙ্গদর্শন.কম-কে যুধাজিৎ বলেন, “করোনাকালীন সময়ে মানুষ ছিল গৃহবন্দি। আমরা জানি গৃহবন্দি হয়ে থাকা যন্ত্রণার দিনগুলোর কথা। ঘটনাচক্রে মহারাষ্ট্রের ওই গ্রামের মহিলারা কিন্তু বছরের পর বছর মাসের ওই পাঁচটা দিন গৃহবন্দি হয়ে থাকেন। তাঁদের শরীর যেন করোনা ভাইরাসের মতোই অচ্ছুৎ। মহামারি আর ওই মহিলাদের অবস্থার যে একটা অদ্ভুত সহাবস্থান, সেটাই আমাকে প্রবল ভাবিয়েছিল। তার ফলস্বরূপ আমার এই ছবি।”

এফটিআইআই-এর স্টুডেন্ট প্রজেক্ট হওয়ায় খুব বেশিদিন সময় ছিল না যুধাজিতের হাতে। অত্যন্ত স্বল্প সময়ে রীতিমতো গবেষণা করে এই ছবিটি নির্মাণ করেছেন তিনি। ‘নেহেমিচ’ এক যাবাবর প্রজাতির অল্পবয়সী মেয়ের কথা বলে। ঋতুস্রাবের সময় প্রথা অনুযায়ী তাকে বন্দি করে রাখা হয় একটি জীর্ণ কুঁড়েঘরে। নির্বাসনকালে মেয়েটি তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যেতে চায়। তখনই তার বোন বলে, “পুরুষদের বিশ্বাস করিস না। ওরা সবাই মিথ্যেবাদী।” কিন্তু মেয়েটির মন মানতে চায় না। তার স্বপ্নদৃশ্যে খেলা করে মুক্তির সমান্তরাল পৃথিবী।

ছবি সৌজন্যে: যুধাজিৎ বসু

কাজটি করার সময় গাডচিরোলিতে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি যুধাজিৎ। কারণ সেখানকার অধিকাংশ মেয়েরাই এই প্রথাকে আশীর্বাদের মতো দেখেন। যুধাজিৎ কথা বলেছিলেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে। এ বিষয়ে কিছু তথ্যচিত্র দেখেছিলেন। পাশাপাশি চলেছে নিরন্তর গবেষণা। যুধাজিতের সঙ্গে ছবিটি লিখেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী পৃথ্বীজয় গাঙ্গুলি, যাঁর জন্মস্থানও কলকাতা। দুজনে মিলে তৈরি করেছেন প্রযোজনা সংস্থা ‘ইউ টার্ন পিকচার্স’। ইতিমধ্যে তাঁদের বেশ কয়েকটি ছবি বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে। অনলাইন সিনে-প্ল্যাটফর্ম মুবি (MUBI)-তে এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে যুধাজিৎ-পৃথ্বীজয়ের দুটি ছোটোছবি ‘কুইরো’ এবং ‘খোজি – দ্য সার্চ’। দুটিই নেপালি ভাষায় নির্মিত। ২০২১ সালে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘কালসুবাই’ বিশ্বের বেশ কয়েকটি নামী চলচ্চিত্র উৎসব যেমন – আমস্টারডাম, শেফিল্ড ডকফেস্ট এবং ভিশনস ডু রিয়েল নিওন সুইজারল্যান্ড-সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেছিল। লস অ্যাঞ্জেলেসে ইন্টারন্যাশনাল ডক্যুমেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) ‘কালসুবাই’-কে নির্বাচিত করেছিল। ২০২০ সালে যুধাজিৎ এবং পৃথ্বীজয়ের সম্মিলিত প্রয়াসে খাসি ভাষার ফিচার স্ক্রিপ্ট ‘হোয়াট উই লস্ট ইন দ্য ফায়ার’-কে ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (NFDC) সহ-প্রযোজনার জন্য নির্বাচিত করেছিল। বর্তমানে যুধাজিতের ইচ্ছা নিজের মাতৃভাষা বাংলায় একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি পরিচালনা করবেন। ‘কাকতাড়ুয়া’ নামের সেই ছবিটির প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।

ছবি সৌজন্যে: যুধাজিৎ বসু

নেহেমিচ-এর ক্যামেরা করেছেন রচিত পাণ্ডে, শব্দে উৎসব ঘোষ, সম্পাদনায় গৌরব মল্লিক, প্রোডাকশন ডিজাইন করেছেন ফার্দিনান্দ ডি রোজারিও। একটি অসামান্য মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে, যা ইজরায়েলের সংগীতশিল্পী ওদেদ জুরের একটি অ্যালবাম থেকে সম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে। অফিশিয়াল পোস্টারটি বানিয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পী কৃষ্ণেন্দু চাকি। অভিনয় করেছেন সাক্ষী দিঘে, ভক্তি মাকারন্দ প্রমুখ। যুধাজিৎ জানিয়েছেন, ইন্সটিটিউটের নিয়ম অনুযায়ী ২০০ কিমির মধ্যে তাঁদের শ্যুট করতে হয়। এদিকে গাডচিরোলির দূরত্ব প্রায় ৮০০ কিমি। তাই মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার একটি ছোটো গ্রামে ছবিটি শ্যুট করা হয়েছে। যুধাজিৎ আরও জানিয়েছেন, “আমার মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরঘুর করত, করোনার সময় ওই গ্রামের মেয়েদের অবস্থা কেমন ছিল! যখন পৃথিবীর সব মানুষই গৃহবন্দি, তখন কি ওই মহিলাদের আলাদা জায়গায় পাঠানো হত নাকি হত না! এ ব্যাপারে সঠিক উত্তর আমি খুঁজে পাইনি। তার একটা কারণ গ্রামাঞ্চলে করোনা নিয়ে মানুষ তেমন ভাবিত ছিলেন না। ভ্যাকসিন তো তাঁদের কাছে ভীতিজনক। ঠিক এই পরস্থিতি থেকেই আমি দেখতে চেয়েছিলাম ছবির মূল ন্যারেটিভটিকে। একটি মেয়ে তার প্রেমিকের সঙ্গে পালাতে চায়। তার বোন কিছুটা তাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে মেয়েটি বেরিয়ে যায়। কিন্তু কোনো পুরুষ তাকে দেখলে বিপদ হতে পারে, এসবও তার ভেতর চলতে থাকে। আরও একটা ভয় কাজ করে করোনা নিয়ে।”

শৈল্পিক দিক থেকে আরও একটি জিনিস প্রভাবিত করেছিল যুধাজিৎকে। করোনার সময় প্রকৃতি খুব সুন্দর হয়ে উঠছিল। দূষণমুক্ত প্রকৃতির সম্মুখীন হয়েছিল মানুষ। “অমন নীল তারাভরা আকাশ একমাত্র লকডাউনের সময়ই দেখতে পেয়েছিলাম। অদ্ভুত এই কনট্রাস্ট আমাকে ভাবিয়েছিল। একদিকে অদ্ভুত মৃত্যু মিছিল, অন্যদিকে প্রকৃতির লীলা। এই ‘ফিয়ার থ্রু বিউটি’ আমাকে সাংঘাতিক প্রভাবিত করেছিল। সিনেমাটোগ্রাফির মধ্যে দিয়ে আমরা সেটা খোঁজার চেষ্টা করেছি।” বলেন যুধাজিৎ বসু।

অফিশিয়াল পোস্টার। শিল্পী: কৃষ্ণেন্দু চাকি

কান চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি এ ছবি প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে জানিয়েছেন, “নেহেমিচ-এর কাজ বিস্ময়কর, যা সিনেমার বিশুদ্ধ সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ”। আগামী ২৪ মে কানের বুনুয়েল থিয়েটারে দুপুরে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হবে যুধাজিৎ বসু পরিচালিত ছবি নেহেমিচ। পুরস্কার প্রদান হবে ২৫ মে।

কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করা যেকোনো শিল্পীর কাছেই গর্বের। এ প্রসঙ্গে যুধাজিৎ বলেন, “প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া গর্বের এবং সম্মানের। এর সঙ্গে আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এফটিআইআই-এর নামও জড়িয়ে আছে। এই মনোনয়নের ফলে আশা করি, আমার পরবর্তী কাজগুলি আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাবে।”

শুরু হয়ে গিয়েছে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৬তম সংস্করণ। সে উপলক্ষে সাজো সাজো রব। এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবে আরও একবার বাঙালি-যোগ। যুধাজিতের এহেন সাফল্য বাংলার কাছে গর্বের, সম্মানের।
__________________________________________________
কান চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়েবসাইটে দেখুন ‘নেমেনিচ’-এর ট্রেলার : Click

Developed by DXDasia