বাড়ির পুজো থেকে বারোয়ারি পুজো : আগাগোড়া বিবরণ দেয় তথ্যচিত্র ‘বাংলার দুর্গা উৎসব’

আগামী ৩০ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে নন্দন-৩ -এ দ্বিতীয়বার দেখানো হবে ছবিটি

তকাল ২৭ এপ্রিল বেলা ১ টা থেকে শিশির মঞ্চে প্রথবারের জন্য দেখানো হল পরিচালক সম্রাট চট্টোপাধ্যায়ের তথ্যচিত্র ‘বাংলার দুর্গা উৎসব’। আজকের এই তথ্যচিত্র আদতে সম্রাটবাবুর দীর্ঘ ২১ বছরের গবেষণার ফসল।

বাঙালি মানেই দুর্গাপুজো (Durga Puja)। শারদীয়াই যে বাঙালির তেরো পার্বণের শ্রেষ্ঠ উৎসব তা বলাই বাহুল্য। পেঁজা তুলো মেঘ, কাশ ফুল, শিউলির সুবাস মানেই ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ’। বাংলার এই দুর্গোৎসবের শুরু কীভাবে, প্রথম দুর্গাপুজো কারা করেন, বারোয়ারি দুর্গাপুজোর চলই বা কবে থেকে, এসব নিয়ে পুরাণের নানা দিক তো আছেই, ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গেছে জনশ্রুতিও। বাংলার দুর্গাপুজোর ঐতিহাসিক কাহিনি থেকে পুজোর বনেদিয়ানা, ৪০০ বছরের ঐতিহ্য পাতায় পাতায় সম্মিলিত হয়েছে এই তথ্যচিত্রের কাহিনিতে।

আইএফএসডি-র যৌথ উদ্যোগে বাংলার দুর্গোৎসবের ৪০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে বাংলা ও ইংরাজি ভাষায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বইতে উল্লিখিত পুরোনো ইতিহাসের বেশ কিছু অংশ ইতিমধ্যেই ললিত কলা অ্যাকাডেমি ও ইউনেস্কোর সংগ্রহশালায় জায়গা করে নিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।

পরিচালক হিসেবে কাজ করার আগেই সম্রাট চট্টোপাধ্যায় বই আকারে প্রকাশ করেন তাঁর লেখা ‘বাংলার দুর্গা উৎসব: এক চলমান ইতিহাস’। এটি এমনই একটি গল্প যেখানে থিম পুজোর চর্বিতচর্বণ নেই, বরং আছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আইএফএসডি-র যৌথ উদ্যোগে বাংলার দুর্গোৎসবের ৪০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে বাংলা ও ইংরাজি ভাষায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বইতে উল্লিখিত পুরোনো ইতিহাসের বেশ কিছু অংশ ইতিমধ্যেই ললিত কলা অ্যাকাডেমি ও ইউনেস্কোর সংগ্রহশালায় জায়গা করে নিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।

১৫৯০ থেকে ১৬০৬ খ্রিষ্টাব্দ অবধি, বাংলার দুর্গোৎসবের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও সূচনা নিয়ে নানা কাহিনি লেখা হয়েছে ছবিতে। বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম গৌড়েশ্বর কংসনারায়ণ রায় রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা এবং পরবর্তীকালে গৌড়ের সম্রাট। তিনি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণকুলের প্রধান সংস্কারক এবং সেই সময়ের বাঙালি হিন্দু সমাজের নেতা ছিলেন। তিনি বাংলায় আধুনিক দুর্গাপূজা শুরু করেন। সেই ইতিহাসের আগাগোড়া বিবরণ আছে। রাজা কংসনারায়ণ, রাজা উদয়নারায়ণের সময়কার অনেক অজানা কাহিনি গবেষণা করে তুলে এনেছেন লেখক তথা পরিচালক সম্রাট চট্টোপাধ্যায়।

পাশাপাশি সে কালের দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজা, জমিদারশ্রেণির জাঁকজমক দেখানোর যে প্রথা প্রচলিত ছিল সে কাহিনিও তুলে ধরেছেন ছবিতে। এই উৎসবকে হাতিয়ার করে ইংরেজদের নেক নজরে যেতেও চাইতেন বনেদীরা। বাইজি নাচ, এলাহি খাওয়া দাওয়া, সাজ পোশাক কিছুরই কমতি ছিলনা। এমনকি বনেদি বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপ বা দুর্গাদালানের স্থাপত্যরীতিতে আজও রয়েছে সেই ছাপ। কলকাতার প্রথম বাড়ির পুজো থেকে শুরু করে আজকের সর্বজনীন দুর্গাপুজোর জার্নিটা ছবির মতোই তুলে ধরেছেন সম্রাটবাবু। শুধু তাই নয় হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারো জন বন্ধুর হাত ধরেই যে আজকের বারোয়ারী পুজোর চল সেকথাও রয়েছে এই ছবিতে।

তথ্যচিত্রের শুরু থেকে শেষ অবধি ছিল অসংখ্য স্কেচ। আর সেই স্কেচের মধ্য দিয়েই কাহিনি এগিয়েছে। নানা জানা-অজানা কাহিনির সংমিশ্রণে বাংলার দুর্গোৎসব আমাদের কাছে সহজেই হয়ে উঠতে পারে বাংলার চিরকালীন উৎসবের জীবন্ত দলিল। শুধু ইতিহাসের বিস্তারিত বিবরণ নয়, বাংলার সুপ্রাচীন ইতিহাস বাঁচানোর জন্য বার্তাও দেওয়া হয়েছে কাহিনিতে। রয়েছে একালের পুজোর মণ্ডপসজ্জা থেকে শুরু করে শারদ সম্মান পুরস্কারের হাত ধরে থিম পুজোর রমরমার কথাও। এছাড়াও আজকের আধুনিক সময়ে প্রযুক্তি আর ঝাঁ চকচকে আমেজের উল্লেখটুকুও করতে ভোলেননি পরিচালক। ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা, বরণ, পুজোর রীতিনীতি, থেকে শুরু করে ভিড় থেকে মণ্ডপ পরিক্রমা, খাওয়া দাওয়া অথবা জমজমাট বিসর্জনের রীতি কোনো কিছুকেই বাদ দেননি তিনি।বাঙালির দুর্গাপুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে আছে সেকথাও বলেছেন পরিচালক।

এই দুর্গাপুজোকে ঘিরে কোনোদিনই বাঙালির আনন্দ, আবেগ বা উত্তেজনার শেষ নেই। সেই উত্তেজনার পারদ আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশনাল সায়েন্টেফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (UNESCO)। বঙ্গ সংস্কৃতির ঐতিহ্য আজ আন্তর্জাতিক সম্মানের অধিকারী। আর সেই আবেগ এবং ঐতিহ্যকেই আরও খানিক উস্কে দিয়ে যায় ২৭তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের তথ্যচিত্র ‘বাংলার দুর্গা উৎসব’।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আগামী ৩০ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে নন্দন-৩ -এ আবারও দেখানো হবে। বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে চাইলে আপনিও ঢুঁ মারতে পারেন এবারের কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে।

Developed by DXDasia