আমরা কি বেঁচে আছি মৃতের মতো? তাংসু কর্মকারের ‘আফটারবার্থ’ দেখে প্রশ্নের মুখোমুখি দর্শক

স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা তাংসু কর্মকারের ছবিতে শহর-প্রেম-রাজনীতির ভিন্ন স্বর

স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা তাংসু কর্মকার অনেকদিন ধরেই পরিকল্পনা করছিলেন, কীভাবে একটা ওয়ান রুম ড্রামাকেন্দ্রিক ছবি বানানো যায়। যেখানে অবশ্যম্ভাবী চলে আসবে চারপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অতিমারির দিন-রাত। এই সবকিছু নিয়েই একটা নতুন কাজ করার চেষ্টা করছিলেন তাংসু। ‘আফটারবার্থ’ ছবিটির জন্ম সেখান থেকেই। যার চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন তাংসু নিজেই এবং মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্দ্রাশিস ঘোষ ও হুসনে শবনম।

তাংসু জানাচ্ছেন, “২০১৯ সালের শেষ দিক থেকে ‘আফটার বার্থ’-এর লেখালেখির কাজ শুরু হয়। আমি চেয়েছিলাম মূল লোকেশনের এসেন্সটা সংলাপের মধ্যে থাকুক। তাছাড়া যে জায়গাতে বা স্পেসে ঘটনাটা ঘটছে, সেই স্পেসটাকে নিজের মতো করে তৈরি করতে চাইছিলাম। ছবির দুটি চরিত্রের মধ্যে যে পলিটিক্যাল ডিসকোর্স চলছে, সেখানে সবসময় আমার মাথায় কাজ করত চরিত্রের দ্বিচারিতা। যা কমবেশি অনেক মানুষের মধ্যেই কাজ করে।”

ছবির গল্পটি আবর্তিত হয়েছে দুই চরিত্র নটরাজ ও তনিমাকে ঘিরে। তাঁরা দুজনেই এক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। তাঁদের নানান সংলাপের মধ্যে ঢুকে পড়ছে শহরের রাজনীতি, প্রেম। আর সেখানে ঘর ও বাইরের দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। হঠাৎই একদিন নটরাজ ও তনিমা একটা ঘরে মিলিত হয়। তারপর এগোতে থাকে দুই চরিত্রের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব। 

ছবির পরিচালক তাংসু কর্মকার স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। স্নাতকের পর তিন বছর স্থপতি হিসেবে কাজ করেছেন নানাভাবে। যদিও তারপর গ্রাফিক ডিজাইনকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি প্রোডাকশন ডিজাইনার হিসেবেও ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেন। ‘আফটারবার্থ’ সম্পর্কে তাংসু বলেন, ছোটো বাজেটের ছবি হিসেবে বড়ো এক্সপোজার।

এই ছবিতে অনবরত চলে আসছে মৃত্যুর প্রসঙ্গ। কিন্তু ছবির নাম ‘আফটারবার্থ’ অর্থাৎ জন্মানোর পর। এই জন্ম-মৃত্যুর সহজ ধারা পরীক্ষামূলকভাবে দুটি চরিত্রের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন তাংসু। ‘আফটারবার্থ’ শব্দদুটি শুনলেই সাংঘাতিকভাবে ইতি ও নেতি দুই জিনিসই কাজ করে। যদিও ইংরেজি অভিধানে কথাটার নেতিবাচক একটা অর্থ আছে। সন্তান প্রসবের সময় মায়ের পেট থেকে যে মৃত ভ্রূণ বেরোয়, সেই ভ্রূণকে অনেকক্ষেত্রেই আফটারবার্থ বলা হয়। অর্থাৎ, জন্ম না নেওয়া অপত্য বংশধর, যা মাতৃদেহে ভ্রূণ থেকে বিকাশ লাভ করে। ভ্রূণের বিকাশের পরপরই ভ্রণের বিকাশ ঘটে। অভিধান অনুযায়ী এখানে যে মৃত্যুর কথা বলা হয়, তার সঙ্গে পরিচালক একটা সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। যদিও তা অত্যন্ত ক্ষীণভাবেই ছবিতে ধরা দিয়েছে। তাংসু বলেন, “আমরা যারা ভ্রূণাবস্থায় বেঁচে যাই এবং বাঁচলে মৃত্যু ঘটবেই এটা জানি – সেই জার্নিটা আসলে কীরকম! এই ছবিতে প্রশ্ন তোলা হয়, আমরা কি আসলে বাঁচার মতো বাঁচছি নাকি মৃতের মতো বেঁচে থাকাকেই বেছে নিয়েছি!”

সম্প্রতি প্রখ্যাত চিত্র-পরিচালক গৌতম ঘোষ একটি সাক্ষাৎকারে বর্তমান সময়ের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজ নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাংলা ছবি তাঁরা তৈরি করছেন, যা সময়ের দাবি মেনে হয়ে উঠছে শক্তিশালী। কিন্তু স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের কিছু সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। কথাটা শুধুমাত্র ভারত নয়, অন্যান্য অনেক দেশের জন্যই সত্যি। আমরা জানি, ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতারা স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারেন না। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বললেই তাঁকে আটক করা হয় আজও। এ প্রসঙ্গে তাংসু জানান, “স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা – খুব ভারি একটা তকমা। সবার আগে এখানে চলে আসে পরিচালকের বক্তব্যের স্বাধীনতা। অনেকসময় সেটাই যদি না থাকে তাহলে কীসের স্বাধীন চিত্র পরিচালক। শুধুমাত্র ব্যক্তি-উদ্যোগে শিল্প নির্মাণকেই কিন্তু স্বাধীনভাবে কাজ করা বলা যায় না, এখানে শিল্পের বক্তব্যের প্রসঙ্গও চলে আসে। তবে হ্যাঁ, স্বাধীনভাবে ছবি বানালে পরীক্ষানিরীক্ষার অনেক জায়গা থাকে। আমি সেটা ব্যবহার করার চেষ্টা করি।” তাংসু এবং তাঁর ছোটোবেলার বন্ধু তনয় সেনগুপ্ত দুজনে মিলে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন।

‘আফটারবার্থ’ ছবির অভিনেত্রী হুসনে শবনম স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, “এই ধরনের ছবিতে নিজেকে কোনোকিছুতেই সীমাবদ্ধ রাখতে হয় না। শুধুমাত্র অভিনয়ই নয়, অন্যান্য টেকনিক্যাল কাজগুলোও শিখতে পারি। সত্যিকারের শিল্পী হওয়ার জন্য বোধহয় এই শিক্ষাটা খুব জরুরি।”

বিখ্যাত রাশিয়ান নাট্যকার আন্তন চেকভ লিখেছিলেন, “বহুদিন ধরে ভালোবাসা নিয়ে যে অবিশ্বাস্য সত্য প্রচলিত রয়েছে, সেটাই একটা বড়োসড়ো রহস্য” (So far only one incontestable truth has been uttered about love : This is a great mystery)। ভালোবাসা-ঘৃণা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস – পাশাপাশি জীবনের দর্শন এবং মতান্তর যেন পিঠোপিঠিভাবে কাজ করেছে ‘আফটারবার্থ’ ছবিতে।

ছবিটির চিত্রগ্রাহক হর্ষ দোশি, আবহ নির্মাণ করেছেন নবারুণ বোস, শিল্প নির্দেশক প্রাজ্জল মজুমদার। দেশ-বিদেশের বেশকিছু ফেস্টিভ্যালের পর ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ভারতীয় শর্টফিল্ম বিভাগের প্রতিযোগিতায় ছিল এই ছবি, যদিও করোনা পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। এই মুহূর্তে, বিখ্যাত যাত্রাশিল্পী স্বপন কুমারকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে ব্যস্ত তাংসু।

Developed by DXDasia