গৌতম ঘোষের প্রথম তিনটি ছবিতে ভিন্ন দেশ, ভিন্ন আধুনিকতা
বাংলা চলচ্চিত্রে তো বটেই, এমনকি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও নতুন পরিকল্প নির্মাণকারী মূহুর্ত ১৯৫৬ সালে সত্যজিৎ-নির্মিত সেই আইকনিক ইমেজ – নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের অপূর্ব কুমার রায় কলকাতা এসে পটুয়াটোলা লেনের সামনে বাক্স প্যাঁটরা হাতে ঈষৎ ঘাড় বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘অপরাজিত’ ছবির এই দৃশ্যে ভারতীয় শিল্পের, বলা ভালো আধুনিক ভারতবর্ষের অত্যন্ত জরুরি শিল্পমাধ্যম – চলচ্চিত্রশিল্পের প্রধাণতম একটি দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রথম পরিণত প্রকাশ – ঐতিহ্য/পরম্পরা বনাম আধুনিকতা, ট্র্যাডিশন বনাম মর্ডানিটি। শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে চলচ্চিত্রের সঙ্গে এই দ্বন্দ্বের যোগ খানিক জন্মগতও বটে – বলা যায় চলচ্চিত্র সম্ভবত একমাত্র পরিণত শিল্পমাধ্যম যার জন্ম আধুনিকতার একদম শীর্ষমূহুর্তে (চলচ্চিত্রের পরেও নতুন শিল্পমাধ্যম আমরা পেয়েছি, যেমন কমিক বুক/ গ্রাফিক নভেল, টেলিভিশন সিরিজ/ ওয়েব সিরিজ ইত্যাদি, কিন্তু ভারতবর্ষ বা বাংলার কনটেক্সটে এখনও এই মাধ্যমগুলি চলচ্চিত্রের মতো পরিণতি পায়নি)। তাই অন্যান্য শিল্পের চেয়েও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আধুনিকতার সঙ্গে নিরন্তর একটি বোঝাপড়ার সম্পর্ক চলতে থাকে – কখনও চলচ্চিত্র আধুনিকতার কিছু উপাদানকে প্রশ্নাতীত ভাবে সম্মতি জানায়, কখনও সে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করতে থাকে আমাদের সমষ্টিগত আধুনিকতার জরুরি কিছু চিহ্নককে। এ লেখায় আমরা গৌতম ঘোষের প্রথম দিকের তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্রকে নিয়ে কিছু কথা বলব, যেখানে ‘মা ভূমি’ (১৯৭৯), ‘দখল’ (১৯৮২), ‘পার’ (১৯৮৪) – এই ছবিগুলির মাধ্যমে দেখতে চেষ্টা করব আধুনিকতা প্রসঙ্গে এ দ্বন্দ্বে তাঁর ছবি কোন ধরনের আধুনিকতার পক্ষ নেয়, আর কীভাবে সেই আধুনিকতার নানা মাত্রার সঙ্গে ছবিগুলির নিরন্তর বোঝাপড়া চলতে থাকে।
কলকাতায় অপূর্ব কুমার রায় (অপরাজিত)
কলকাতায় অপূর্ব কুমার রায় (অপরাজিত) — যে ইমেজের কথা বলে এ লেখা শুরু করেছিলাম, একটু লক্ষ্য করলেই আমরা খেয়াল করব, নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও অপূর্ব কুমার রায় ব্রাহ্মণ, তার সামাজিক রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘ভদ্রলোক’ কথাটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বিশেষ করে, অপু চিত্রত্রয়ীর তৃতীয় ছবি ‘অপুর সংসার’ (১৯৫৯)-এর শুরুর দিকের একটি দৃশ্য আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, যেখানে অপু পয়সাকড়ির অভাবে কাজ খুঁজতে বেরিয়েছে, তার নানান ডিগ্রি সত্ত্বেও, বা ডিগ্রি থাকার জন্যই সে চাকরি পাচ্ছে না, কারণ চাকরিদাতারা নানাভাবে প্রায় স্পষ্ট করেই বলে দিচ্ছেন, ওষুধের কারখানা জাতীয় জায়গায় তার মতো ছেলের খাটুনি করে পোষাবে না। ‘তার মতো ছেলের’ – এই শব্দবন্ধেই ইতিহাস, এই শব্দবন্ধেই রাজনীতি। বাঙালি মধ্যবিত্ত যুবক হিসেবে অপূর্ব কুমার রায়ের আইকনিক আত্মপরিচয় খানিকটা এই দৃশ্য থেকেই, যেখানে আধুনিকতার একটি নির্দিষ্ট মাত্রার দিকে, নির্দিষ্ট একটি চিহ্নকের দিকে সত্যজিৎ মনোনিবেশ করেন। সত্যজিতের সীমাবদ্ধতা এইখানে নয় যে তাঁর চরিত্রের আধুনিকতা বিশেষ একটি শ্রেণির এবং জাতের আধুনিকতা (পড়ুন সবর্ণ ভদ্রলোকের) হয়েই আটকে ছিল – কোনো না কোনো শিল্পীকে এই আধুনিকতার কথা বলতেই হত। বরং, ইতিহাসকে প্রায় আঠাশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে যখন অপুর মতোই ভারতের প্রান্তবাসী কোনো নাগরিক এই একই কলকাতা শহরে এসেছেন, (কলকাতা শহরে আসাটা এখানে বৃহত্তর অর্থে আধুনিকতার দ্যোতক হয়ে উঠেছে) কিন্তু অপুর মতো তাঁরা কলকাতায় আশ্রয় পাননি, বরং তাঁদের নিংড়ে চুষে খেয়ে কলকাতা ছিবড়ে করে ফেলে দিয়েছে। ভদ্রলোকের পাশে এই সর্বহারা, দলিত, প্রলেতারিয়েত মানুষের আধুনিকতার ইতিহাস তাই সত্যজিতের আধুনিকতার বিপ্রতীপে আরেকটি ভিন্ন মাত্রা এবং চিহ্নকের আধুনিকতার সন্ধান। হ্যাঁ, আমরা গৌতম ঘোষ নির্মিত ‘পার’ ছবিটির কথা বলছি।
কলকাতায় দলিত যুগল (পার)
নউরঙ্গীয়া এবং রামার গল্প ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আশ্চর্যভাবে ‘অপরাজিত’ ছবিটির পাশে রেখে পড়া যায়। বিহারের মুঙ্গের জেলার একটি দলিত গ্রাম থেকে রাজনীতির কারণে খুন হওয়ার ভয়ে পালিয়ে দলিত যুগল নউরঙ্গীয়া আর রামা যখন কলকাতা শহরে কাজ খুঁজতে আসে, শহর তখন ভারতের বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়ের আনন্দে মত্ত। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের আধুনিক নেশন-স্টেট নির্মাণের একটি শোচনীয় পরাজয়ের ইতিহাস অসমাপ্ত থেকে যায় পার ছবির প্রথমার্ধে, বরং আমরা সেই ইতিহাসের দুই রূপকার চরিত্রের সামনে এসে পড়ি, যাঁদের সঙ্গে আধুনিকতার সম্পর্ক সহযোগিতার নয়, বরং সংঘাতের। প্রলেতারিয়েত এই দুজন কলকাতা’য় এসে ঘুরে ঘুরে জাদুঘর আর চিড়িয়াখানা দেখে, কিন্তু ওরা ভুলতে পারে না ভুখা পেটে মিউজিয়ামের কোনো প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর হাড়ও তাদের ছেড়ে কথা বলবে না। অতঃপর অমানুষিক সেই নদীপারের গল্প আপনারা জানেন, দলিত শ্রমজীবী মানুষের গায়ের ঘাম আর রক্তে যে গল্পের অর্ধেক রাঙা হয়ে আছে।
মুখের রেখায় লেখা ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ইতিহাস (পার)
বরং এই গোটা গল্পটিকে আমরা ইতিহাসের বৃহত্তর একটি ন্যারেটিভের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারি, যেখানে ‘মা ভূমি’ এবং ‘দখল’ ছবিগুলিও আমাদের আলোচনায় জরুরি হয়ে উঠবে। শুরুতে যে কথা আমরা বলেছিলাম – আধুনিকতার নানান মাত্রা, নানান চিহ্নক – একটু খেয়াল করলেই লক্ষ্য করব গৌতম ঘোষ আধুনিকতার সেই সেই মাত্রায় বেশি আগ্রহী যা ভদ্রলোকের ইতিহাস বইয়ে এক পাতায় নমো নমো করে সেরে ফেলা থাকে। তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস বলার সময় গৌতমের ছবি তাই শুধুমাত্র ইতিহাসেই আটকে থাকে না, বরং সত্তরের উত্তাল রাজনীতির সাপেক্ষে তেলেঙ্গানার ইতিহাস পড়ে নিতে গিয়ে আধুনিক ভারতরাষ্ট্রের নিয়ামকদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘাত দেখাতেও তিনি ভোলেন না। এই ছবিতে একঘণ্টা আঠারো মিনিটের মাথায় একটি শট আছে, যা মৃণাল সেন কৃত নকশালবাড়ি আন্দোলনের রিপ্রেজেন্টেশনের (কলকাতা ৭১, পদাতিক ইত্যাদি) আইকোনোগ্রাফিকে মনে করায় – হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায় ইটের দেওয়ালের পাশ দিয়ে পুলিশের তাড়া খেয়ে বামপন্থী যুবক ছুটছে।
পদাতিক
মা ভূমি

আমরা বুঝতে পারি, ছবিটি মুখে বলছে স্বাধীনতা পূর্ব তেলেঙ্গানার কথা, কিন্তু দ্যোতনা তৈরি হচ্ছে সত্তরের দশকের। চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক আশিস রাজাধ্যক্ষ্য ‘মা ভূমি’ ছবির একটি বিশেষ ‘ডিভাইস’ – ভয়েসওভার বা কথকের কণ্ঠ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে নিয়ামক রাষ্ট্রের দালালি করার পরিবর্তে সেই কণ্ঠ ইতিহাসে প্রশ্নের বীজ পুঁতে দিতে চাইছে। ‘দখল’ ছবিতে আন্দির তীব্র চিৎকারে ‘ভদ্দরলোক’-র আইন আদালত প্রত্যাখ্যান করা আরও সপাট, সরাসরি, তীক্ষ্ণ থাপ্পড় – আমরা দেখতে পাচ্ছি চলচ্চিত্র কথা বলছে সেই মানুষগুলোকে নিয়ে যাঁদের নিয়ামক রাষ্ট্র আধুনিকতা বা প্রগতির ইতিহাসের বাইরে দেখতেই পছন্দ করে। তাই বৃহত্তর তর্কে ‘পার’ ছবির মাস্টারমশাই (অনিল চ্যাটার্জী নির্মিত চরিত্র)-এর গান্ধিবাদী অহিংসার আদর্শও দর্শকের কাছে খেলো লাগতে শুরু করে – যেখানে গোটা দেশ জ্বলছে সেখানে কে কার প্রতি অহিংস হয়ে থাকবে?
দখল
তাই শুধুমাত্র বাংলা চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় নয়, বরং ‘নিউ ইন্ডিয়ান সিনেমা’র ভারতীয় চলচ্চিত্রের সাপেক্ষে (মনি কাউলের উসকি রোটি, দুবিধা, কুমার সাহানীর মায়াদর্পণ, এম এস সথ্যুর গরম হাওয়া, শ্যাম বেনেগালের অঙ্কুর, নিশান্ত ইত্যাদি ছবি) আমাদের ফিরে দেখতে হবে, ভাবতে হবে গৌতম ঘোষের প্রথম পর্বের চলচ্চিত্রগুলির কথা। আমাদের ভাবতে হবে কেনই বা ইতিহাসের ঐ সন্ধিক্ষণে সারা ভারতের অন্যধারার চলচ্চিত্র পক্ষ নিয়েছিল শোষিতের, কেন তারা সবাই মিলে নিয়ামক রাষ্ট্রের চোখরাঙানি পেরিয়ে ভিন্ন দেশ, ভিন্ন আধুনিকতা খুঁড়ে দেখতে চেয়েছিল, আর কেনই বা পরবর্তীকালে অন্তত অন্যধারার বাংলা ছবি একটি বিশেষ শ্রেণির ড্রয়িংরুমে সেই যে ঢুকে গেল, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আর বেরোতেই পারল না। আধুনিকতার এই ভিন্ন দিক নির্মাণে এ ছবিগুলোকে ফিরে দেখা, ফিরে ভাবা ইতিহাসের সামনে আমাদের একধরনের দায়, যে দায় স্বচ্ছন্দে নিজেদের কাঁধে না নিলে ভাবী প্রজন্ম আমাদের সহজে ক্ষমা করবে না।
___________________
যে যে প্রবন্ধ এই লেখাটির নির্মাণে নানাভাবে সাহায্য করেছে:
১) গীতা কাপুরের প্রবন্ধ Sovereign Subject: Ray’s Apu, মূল বইঃ When Was Modernism: Essays on Contemporary Cultural Practice in India
২) মাধব প্রসাদের প্রবন্ধ Cinema and the Desire of Modernity
৩) আশীষ রাজাধ্যক্ষ্যের প্রবন্ধ Goutam Ghose’s Maabhoomi: Territorial Realism and the ‘Narrator’, মূল বইঃ Indian Cinema in the Time of Celluloid: From Bollywood to Emergency