অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ‘মানিকবাবুর মেঘ’- পর্দায় মানুষ আর মেঘের মহাজাগতিক যাপনচিত্র

এনএফডিসি ফিল্ম বাজারের গত বছরের বাছাই করা ছবির তালিকায় স্থান পেয়েছে অভিনন্দনের ছবি

“২০১৬ সালের কথা। এক গ্রীষ্মের দুপুর। অফিসে ফিরছি। আশেপাশে দোকানপাট সব বন্ধ। কোনো মানুষ নেই। শুধু আমার মাথার উপর একদলা মেঘ। এই মুহূর্তটা ছিল মহাজাগতিক। জনশূন্য সেই পরিবেশে শুধু আমি আর মেঘ।” – প্রথম পরিচালিত ছবি ‘মানিকবাবুর মেঘ’ প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন তরুণ চিত্রনির্মাতা অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনাচক্রে কোনো জড় বস্তুর সঙ্গে মানুষের প্রেমের সম্পর্ক বিরল নয়। এর উদাহরণ রয়েছে সাহিত্যে-শিল্পে। কিন্তু প্রকৃতিকে জড় বলা যায় না। যেমন গাছ, যেমন আকাশের মেঘ। তারা পাল্টাতে থাকে নিয়ত। মানুষের ভাষা আর সেই প্রকৃতির ভাষা তখন বিন্দুতে এসে মেশে। আর কখনও সেই প্রেমের উচ্চারণ অমোঘ হয়ে যায় বৈকি!

আমরা জানি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর কথা। এক খণ্ড মেঘকে সে দূত সাব্যস্ত করেছে। সেই মেঘরূপ দূতকেই তার প্রিয়ার কাছে পাঠাচ্ছে। কী অসম্ভব মর্মস্পর্শী আতপ্ত হৃদয়ের পোড়ানি, কী অব্যর্থ সেই দিকনির্দেশ, কী বিধুর সেই বার্তা। অভিনন্দনের উল্লেখ্য ছবিতে মানিকবাবুও তার পড়শি। তাঁরও একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে, আছে ভুবনজোড়া চোখ বা চোখের মন, আছে মানুষের শরীরের মতো মেঘের আকার পাল্টে যাওয়ার দিকনির্দেশ। অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মানিকবাবুর মেঘ’ দর্শককে সেইসব চিরন্তন দৃশ্যের সাক্ষী করতে চলেছে।

অভিনন্দনের বড়ো হওয়া বারাসাতের মফস্‌সলে। ছোটোবেলা থেকেই তাঁকে টেনেছে বাংলা সাহিত্য, লিটল ম্যাগাজিন। তারপর মুম্বই চলে যাবার পর ব্যস্ত হয়ে যাওয়া। যেমন হয় আরকি! ইচ্ছা সত্ত্বেও লিটল ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু অভিনন্দনের স্বপ্ন দেখা জারি থাকল। পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখালেখির মধ্যে দিয়ে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করার অনেক বছর পরে চলচ্চিত্রে প্রবেশ। বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘তিনকাহন’ -এর চিত্রনাট্য লেখা দিয়ে শুরু। এরপর তাঁর গল্প নিয়ে হয়েছে একাধিক পুর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি। পরবর্তীকালে ‘মানিকবাবুর মেঘ’-এর চিত্রনাট্য লিখেছেন প্রায় দুই বছর ধরে। যে সিনেমায় নির্দিষ্ট কোনো গল্প নেই। তথাকথিত গল্প বলাতে তিনি বিশ্বাসই করেন না। তাঁর মতে, সিনেমা নিজস্ব একটা ভাষা হয়ে উঠুক। অভিনন্দন বলেন, “প্রথম ছবিটা তথাকথিত নিতান্ত গল্পকেন্দ্রিক ছবি বানাতে চাইনি। গল্পকেন্দ্রিক ছবিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম আমার প্রথম ছবি হবে সিনেমার নিজস্ব ভাষাতেই। ছবিটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করার আগে সাত-আটমাস ধরে একটা গবেষণা করেছিলাম। এই ভাবনায় এর আগে কোনো ছবি বা সাহিত্য আছে কী না, সেটা জানতে আগ্রহী ছিলাম। যদিও কালীদাসের ‘মেঘদূত’ ছাড়া তেমন কোনো রেফারেন্স পাইনি মেঘ ও মানুষ নিয়ে। তারপরেই ঠিক করলাম ‘মানিকবাবুর মেঘ’ বানাব। আর শুরু থেকেই আমার পাশে ছিলেন বৌদ্ধায়ন  মুখোপাধ্যায় এবং মোনালিসা  মুখোপাধ্যায়। ওঁরাই এই ছবির প্রযোজক।”

ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছে দুটি চরিত্র – মানিকবাবু এবং মেঘ। মানিকবাবুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন চন্দন সেন। অভিনন্দন চেয়েছিলেন পর্দার অভিনেতাকে আগে ‘মানুষ’ হতে হবে। স্টারডম এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অনেক সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন তিনি। সেই মতো চন্দন সেনকে কাস্ট করা হয়। পরিচালকের বক্তব্য, চন্দন সেনকে এর আগে কখনও প্রধান চরিত্রে দেখা যায়নি। এই ছবিতে অন্যান্য নানান চরিত্রে অভিনয় করেছেন থিয়েটারেরই শিল্পীরা – দেবেশ রায়চৌধুরী, ব্রাত্য বসু, নিমাই ঘোষ। একটি চরিত্রে দেখা যাবে প্রয়াত অভিনেতা অরুণ গুহঠাকুরতাকেও।

ছবিতে তেমনভাবে কোনো সংলাপ রাখতে চাননি পরিচালক। একটা মানুষের যদি প্রিয় বন্ধু হয়ে যায় আকাশের ভেসে থাকা মেঘ, তাহলে মেঘের সঙ্গে মানুষের কী কথা থাকতে পারে! তারা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকতে পারে। আর তাদের কথা থাকবে ভিতরে ভিতরে। মেঘ-মানুষের মিলনটাই তখন সংলাপের মতো। পর্দা জুড়ে কত কত কথা। দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ সেই কথা শুনতে পাবেন, কেউ পাবেন না। অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় এই ছবিটিকে নির্দিষ্ট কোনো তকমা দিতে চান না। বাস্তব, পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব – সবকিছুই হতে পারে আবার নাও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে পরিচালক জানান, “আমি চাইনি, এই ছবির ভাষা বাংলা, হিন্দি বা অন্য কিছু হোক। বরং চেয়েছি, ছবিটা নিজেই একটা ভাষা হয়ে উঠুক।’’

‘মানিকবাবুর মেঘ’ – নামটা প্রথম শোনার পরেই একটা ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল। দুটো শব্দের মধ্যে চমৎকার অনুপ্রাসের প্রয়োগ। যদিও পরিচালকের বক্তব্য, মানিকবাবু নামের পিছনে তাঁর আলাদা কোনো শ্রম নেই। হঠাৎই মাথায় চলে এসেছিল। অথচ এই নামের মধ্যে নানন্দিকতা আছে। মানিকবাবু নামকরণের জন্য পরিচালককে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেকেই ভেবেছেন এটা কি সত্যজিৎ রায়ের বায়োপিক! পরিচালকের বক্তব্য, তাঁদের মতো যাঁরা মফস্‌সল শহরে বড়ো হয়েছেন, আর যাঁরা বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী, তাঁদের কাছে যুবকবেলার হিরো সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও এই ছবির সঙ্গে সত্যজিৎ রায় বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

পরিচালকঃ অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়

৫২তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়ায় (গোয়া) ভারতীয় প্যানোরমায় দেখানো হতে চলেছে ‘মানিকবাবুর মেঘ’। এছাড়াও এনএফডিসি ফিল্ম বাজারের গত বছরের বাছাই করা ছবির তালিকায় স্থান পেয়েছে অভিনন্দনের ছবি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের তিন বিখ্যাত নাম পাওলো বের্তোলিন, কিকি ফুং এবং স্তেফান বোর্সোসের জুরি বোর্ড এনএফডিসি ফিল্ম বাজার পুরস্কারের মঞ্চে ‘মানিকবাবুর মেঘ’-কে দিয়েছে ‘স্পেশাল মেনশন’-এর তকমা। পাশাপাশি তালিনের ব্ল্যাক নাইটস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ২৫তম বর্ষের ফার্স্ট ফিচার কম্পিটিশনে একমাত্র ভারতীয় ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে এই ছবি।

কলকাতায় কবে এই ছবি দেখা যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে পরিচালক এখনও কিছু জানাননি। ‘মানিকবাবুর মেঘ’-এর না বলা কথাগুলো যে আমাদের সকলের প্রিয় হয়ে উঠবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Developed by DXDasia