
গত ৭৪ বছর ধরে প্রতিবারই নতুন নতুন থিমের ওপর দুর্গাপুজো করে সমাজসেবী সংঘ
রাজধানী শহর কলকাতার ভাঁজে ভাঁজে আনন্দে-দুঃখে-অপমানে-অবহেলায় বাস করছে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার। কতটুকুই বা চাহিদা তাঁদের! কিন্তু সেই স্বল্প চাহিদাগুলো মেটানোর মানুষ কই! নিজেদের শৈশব, বার্ধক্য সমস্ত স্মৃতি ভুলে কী অবলীলায় শহরের ভিড়ে মিশে আছেন তাঁরা। নিজেদের রোজকার স্বপ্নগুলো একটু একটু করে মাড়িয়ে রুটি-রুজির জন্য এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিশ্চয় আপনার বাড়িতেও কাজ করতে যান প্রতি সকালে। কিংবা আপনার অফিসে ভালোবেসে টেবিল মুছে দেন, খাবার সার্ভ করেন হাসিমুখে। সংসারে যাতে আরেকটু পয়সা আসে, তার জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে বেরিয়ে পড়ছে ছোটো ছোটো শিশুরাও। কাঁধে বইয়ের ব্যাগের বদলে উঠছে ভারি ভারি বস্তা। শহরে পুজোর জাঁকজমকে খুঁজে পাওয়া যাবে না তাদের। নতুন জামাকাপড়? সেসব আবার কী? গরিব মানুষদের স্বপ্ন দেখতে নেই- এই সহজ বাক্যটা ছোটো থেকেই মাথায় ঢুকে যায় তাদের।
এদের কারোর আলাদাভাবে পুজো বলে কিছু নেই। উৎসবের দিনেও তারা রাস্তায় বেরোয়। ঠাকুর দেখার জন্য নয়, টাকা রোজগারের জন্য। এই শহরের পুজোর ভিড়ে সবচেয়ে অনুজ্জ্বল মুখ তো তারাই। এবার সেই ফিকে হয়ে যাওয়া মুখগুলোকেই মণ্ডপসজ্জার মধ্যে ধরতে চাইছে দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জের অন্যতম বড়ো পুজো সমাজসেবী সংঘ। তাদের সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এবারের থিম শ্রমিক শিশুরা।
শুধু তাই নয়, শ্রমিক শিশুদের রূঢ় বাস্তবের পাশাপাশি আয়োজকরা তুলে ধরতে চাইছেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের কথাও। তাদের জীবনযন্ত্রণার কথা কল্পলোকে পাড়ি দেবে। গত ৭৪ বছর ধরে প্রতিবারই এভাবে নতুন নতুন থিমের ওপর দুর্গাপুজো করে দর্শনার্থীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে সমাজসেবী সংঘ। পেয়েছে বহু পুরস্কার। এবার তাই শ্রমিক শ্রেণির পাশাপাশি সমাজের অটিজম আক্রান্ত শিশুদের উৎসর্গ করতে চাইছে সমাজসেবী সংঘের পুজো। আয়োজকদের মতে, সাধারণ মানুষ যদি দিব্যাঙ্গদের পাশে না থাকে, যদি আর পাঁচটা মানুষের মতোই তাদের গণ্য না করে, তাহলে তাদের পক্ষে সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেকেরই নজর দেওয়া উচিত।
মূলস্রোতের বাইরে গিয়ে একটু অন্য ধরনের কাজ, যা ২০১৯-এর দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রাপ্তি। এযাবৎ পাওয়া খবর অনুযায়ী, এবছর অনেক পুজো-ক্লাবই সমাজের আরেকটা অংশের কথা তুলে ধরছে তাদের থিমে। দক্ষিণের সমাজসেবী সংঘের এহেন পদক্ষেপকে সম্মান জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ অটিজম সোসাইটির ডিরেক্টর ইন্দ্রানী বসু। হাত বাড়িয়েছেন পুজোর প্রতিবেশীরাও।
