
ছবির অনেকটা অংশ জুড়ে রয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি
আলিয়া ভাটের সঙ্গে হুসনে শবনম
পূর্ব বর্ধমান জেলার গুসকরা পৌরসভার (Guskara Municipality) মধ্যবিত্ত শিক্ষক পরিবারের বড়ো সন্তান হুসনে শবনম (Husne Shabnam)। সম্প্রতি হুসনে বলিউডের প্রথমসারির দুই অভিনেত্রী শাবানা আজমি এবং আলিয়া ভাট-কে বাংলা ভাষা শেখালেন। করণ জোহারের নতুন ছবি ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ (Rocky Aur Rani Ki Prem Kahani)-তে এরকমই এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেন তিনি। পরিবার সাধারণ হলেও তাঁর চিন্তাভাবনাকে কোনো ঘেরাটোপের মধ্যে আটকে রাখতে চাননি হুসনে। উচ্চ মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা আসেন। সম্পূর্ণ অন্য খাতে বইতে শুরু করে জীবন। পড়াশোনার পাশাপাশি মডেলিং দিয়ে শুরু করেন কেরিয়ার৷ এরপর কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারে যোগ দিয়ে অভিনয়ের সঠিক তালিম নিতে শুরু করেন। তাঁর ইচ্ছা থিয়েটারের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও কাজ করবেন। সপ্তাহে অন্তত দুটো করে অডিশন। ডাক না পাওয়া, কটূ কথা শোনা, কখনও ছোটো সুযোগ, কখনও চরিত্র থেকে বাতিল হয়ে যাওয়া, সংখ্যালঘু হওয়ার জন্য শুরুর দিকে কলকাতায় বাড়ি ভাড়া না পাওয়া — হোঁচট খেতে খেতেই কলকাতায় কাটিয়ে দেন পাঁচটা বছর। একবছর আগে বাণিজ্যনগরী মুম্বাইতে পাড়ি দিয়েছেন।

রণভীর সিং-এর সঙ্গে হুসনে
রণবীর সিং (Ranveer Singh), আলিয়া ভাট (Alia Bhatt) অভিনীত ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ ছবির হাত ধরে দীর্ঘ সাত বছর পর পরিচালনায় ফিরলেন করণ জোহার (Karan Johar)। রণবীর-আলিয়ার পাশাপাশি এই ছবিতে অভিনয় করেছেন শাবানা আজমি (Sabana Azmi), ধর্মেন্দ্র (Dharmendra), জয়া বচ্চন (Jaya Bacchan), টোটা রায়চৌধুরী (Tota Roychowdhury) ও চূর্ণি গঙ্গোপাধ্যায় (Churni Ganguly)। পাঞ্জাবি রানধাওয়া পরিবারের সন্তান রকি। অন্যদিকে বাঙালি চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সন্তান রানি। একেবারে দুই ভিন্ন পরিবেশে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও একে অপরের প্রেমে পড়েন রকি আর রানি। সবশেষে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তিন মাস করে তাঁরা একে অপরের বাড়িতে থাকবেন। অর্থাৎ স্যুইচ অপারেশন। যদি এই তিন মাস তাঁরা টিকে যেতে পারেন, তাহলে বিয়ের পরের পঞ্চাশ বছরও নির্বিঘ্নে কাটাতে পারবেন। হাসি মজার মোড়কে প্রেম, ভালোবাসা, লড়াই, মন ভাঙার ‘হার্ডকোর বলিউডি’ গল্প বলছে করণ জোহারের রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি। যেটি প্রযোজনা করেছে করণের ধর্মা প্রোডাকশন (Dharma Production)।
বিকাশ বলেন, “আমাদের আগের প্রজেক্ট ছিল অ্যামাজন প্রাইমের সিরিজ ‘জুবিলি’। সেখানে কিছু ভয়েস নোট নিয়ে হুসনের সাহায্য নিয়েছিলাম। তিনি নিজে একজন অভিনেত্রী, তাই হয়তো ডায়ালেক্ট শেখাতে গিয়ে সংলাপের ইমোশনগুলো আনতে পেরেছিলেন।
ছবির অনেকটা অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি। এবং চরিত্রকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য ছবিতে দৃশ্যায়িত চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বাংলায় কথা বলাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই গুরু দায়িত্বটি করণ জোহার তুলে দেন মুম্বাইয়ের স্ট্রিক্টলি স্পিকিং (Strictly Speaking) সংস্থার হাতে। যার কর্ণধার বিকাশ কুমার (Vikas Kumar)। গত দশ বছর ধরে এই সংস্থা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় খ্যাতনামা অভিনেতা-সহ মডেল, ক্রিকেট কমেন্টারস, ভয়েসওভার আর্টিস্ট, সাংবাদিক, টেলিভিশন সঞ্চালকদের ট্রেনিং দিয়ে আসছে। সেখানেই একটি উঁচু পদে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন হুসনে শবনম। করণ জোহারের এই ছবির জন্য তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রখ্যাত শাবানা আজমি এবং আলিয়া ভাটকে বাংলায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার।
ছবির পোস্টার
সারা ভারত জুড়ে মুক্তি পেয়েছে করণ জোহারের ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’। শাবানা আজমি এর আগেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাংলা ছবিতে কাজ করেছেন। বাংলা ভাষা সম্বন্ধে তিনি সচেতন। কিন্তু আলিয়া ভাটের ক্ষেত্রে বাংলায় কথা বলা একেবারেই নতুন একটি অধ্যায়। কেমন ছিল আলিয়াকে বাংলা শেখানোর সেশনগুলো? বঙ্গদর্শন.কম-কে হুসনে শবনম জানান নিজের অভিজ্ঞতার কথা। বলেন, “আমাদের টিমের হাতে আসলে খুব বেশি সময় ছিল না। তাছাড়া আলিয়াও অন্যান্য কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। মোটামুটি চার থেকে পাঁচটা সেশন নিয়েছিলাম। ওই দিনগুলো আলিয়ার বাড়িতে যেতাম নিয়ম করে। আলিয়া ভীষণ মিষ্টি মেয়ে। উষ্ণ অভ্যর্থনার পাশাপাশি আমি ওঁর থেকে অনেক কিছু শিখেছি। দেখতাম, খুব তাড়াতাড়ি বাংলা শব্দের অর্থগুলো বুঝে নিতেন৷ বাচ্চাদের মতো করে তাঁকে শেখাতে হয়নি। বাংলায় কাজ না করলেও বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল। চিত্রনাট্যের ইমোশনগুলো ওঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলেই বাংলায় কথা বলা নিয়ে জড়তা থাকত না আর। শুটিংয়ের সময় সেটেও আমাকে থাকতে হত। কোথায় ভুল হচ্ছে, কোথায় কীরকম উচ্চারণ প্রয়োজন এই সবটা আমাকে দেখভাল করতে হত। এই অভিজ্ঞতাগুলো ভুলবার নয়।”
অন্যদিকে শাবানা আজমির শক্তিশালী অভিনয়ের ভক্ত আসমুদ্রহিমাচল। পাঁচবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন সেরা অভিনেত্রী হিসাবে। শিল্পকলায় অবদানের জন্য পেয়েছেন পদ্মশ্রী (১৯৮৮) এবং পদ্মভূষণ (২০১২)। প্রখ্যাত বাঙালি পরিচালক যেমন সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষের একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন। বাইরে থেকে গুরুগম্ভীর মনে হলেও আদতে যে তিনি নরম মনের মানুষ, তা বোঝা গেল হুসনের কথায়। হুসনে বলেন, “শাবানা ম্যাম প্রথম দিনেই বলে দিয়েছিলেন বর্ণপরিচয় থেকে শুরু করতে। যাতে এতটুকুও বাংলা বলতে ও বুঝতে তাঁর সমস্যা না হয়। ম্যামকে শেখাতে গিয়ে আমিও আমার ছোটোবেলায় ফিরে যাচ্ছিলাম। শুধু চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনাই নয়, শাবানা ম্যামের সঙ্গে কাজের ফাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প হত। গুসকরা থেকে আমার মুম্বাইয়ে এই কাজ করার জার্নি, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সমস্যা, কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আরও কত কী বিষয়ে গল্প করতেন উনি। অভিনেত্রী ছাড়াও তিনি যে একজন সচেতন সমাজকর্মী, তাঁর সেই সত্ত্বাটা ভীষণ ভাবে বুঝতে পারতাম।”
ছবির সেটে শাবানা আজমির সঙ্গে হুসনে
এই ছবিতে দুই বাঙালি অভিনেতা আলিয়া ভাটের বাবা ও মায়ের চরিত্রে কাজ করেছেন। তাঁরা যথাক্রমে টোটা রায়চৌধুরী এবং চূর্ণি গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁদের সবার সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে সময় কাটত হুসনের। ভুলতে পারেননি রণবীর সিং-এর সঙ্গে গল্প করার মুহূর্তগুলো। উল্লেখ্য, এই ছবিতে একটি স্বল্প চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন হুসনে। তাঁর সঙ্গে একই ফ্রেমে অভিনয় করেছেন স্বয়ং শাবানা আজমি।
ডায়ালেক্ট কোচিং সংস্থা স্ট্রিক্টলি স্পিকিং-এর কর্ণধার ও অভিনেতা বিকাশ কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বঙ্গদর্শন.কম। কেমন ছিল ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ ছবিতে হুসনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা? বিকাশ বলেন, “আমাদের আগের প্রজেক্ট ছিল অ্যামাজন প্রাইমের সিরিজ ‘জুবিলি’। সেখানে কিছু ভয়েস নোট নিয়ে হুসনের সাহায্য নিয়েছিলাম। তিনি নিজে একজন অভিনেত্রী, তাই হয়তো ডায়ালেক্ট শেখাতে গিয়ে সংলাপের ইমোশনগুলো আনতে পেরেছিলেন। যে মুহূর্তে ধর্মা প্রোডাকশন থেকে ফোন পেয়েছি, আমি জানতাম এটা হুসনের জন্য উপযুক্ত কাজ হবে। সর্বকালের সেরা অভিনেত্রী শাবানা আজমি এবং বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা-অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের ডায়ালেক্ট কোচ হওয়া, এমনকি করণ জোহারের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে পারা পুরোটাই যে কারোর কাছে চ্যালেঞ্জিং, একইসঙ্গে ভয়ের। কিন্তু হুসনে গোটা কাজটা জলের মতো সরল করে দিয়েছিলেন। অভিনেতাদের সঙ্গে ওয়ার্কশপ করেছেন, শুটিংয়ের সময় সেটে তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং অভিনেতাদের ডাবিংও পর্যবেক্ষণ করেছেন। শাবানাজির সঙ্গে একটি দৃশ্যে অভিনয় করার সুযোগও পেয়েছেন হুসনে। ক্যামিও চরিত্র হলেও তাতে তিনি উজ্জ্বল। হুসনে, স্ট্রিক্টলি স্পিকিং টিমের একজন সম্পদ।”
শাবানা আজমির সঙ্গে হুসনে শবনম
বরাবর অভিনেত্রী হতে চেয়েছেন হুসনে শবনম। সেই মতো চলেছে তাঁর নিজেকে প্রস্তুত করা। কলকাতায় একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ওয়েব সিরিজ ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ (REKKA)-তে অভিনয়ের পাশাপাশি তংসু কর্মকারের ‘আফটার বার্থ’, অনীক চৌধুরীর ‘জারোখ’-এ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন৷ জারোখ ছবিটির চিত্রনাট্য এই মুহূর্তে রয়েছে অস্কার কমিটির সংগ্রহশালায়। কলকাতার থিয়েটার দল ভাণ-এর সঙ্গে ‘গো চরিত মানস’, ‘বিদ্যার সাগরেরা’; উজ্জয়ন-এর সঙ্গে ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ এবং সুমিত কুমার রায় ও প্রসেনজিৎ বর্ধনের নির্দেশনায় নাটক ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এ অভিনয় করেছেন হুসনে।
হুসনে শবনমের বাবা পেশায় শিক্ষক, মা গৃহবধূ এবং বোন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। হুসনে বলেন, “আমি ছোটো থেকে যা যা করতে চেয়েছি, আমার পরিবার সবেতেই সহযোগিতা করেছে, আমার পাশে থেকেছে। মুম্বাইয়ে একা থাকি। প্রতিদিন স্ট্রাগেল করছি, আরও ভালো ভালো কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি। পরিবার ছাড়াও আমার কিছু বন্ধু সবসময় আমার পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছে। করণ জোহারের এই ছবিতে কাজ করে ভালো অভিজ্ঞতা তো হয়েছেই। তবে কিছু আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম বলছে ছবিতে অন্যান্য চরিত্রে বাঙালি অভিনেতা ও কলাকুশলীরা নাকি বাংলা শিখিয়েছেন। তাঁরা একে অপরের সঙ্গে সেটে বাংলায় কথা বলতে পারেন, কিন্তু প্রাথমিক ট্রেনিং আমিই দিয়েছি। দায়িত্বটা পুরোটাই আমার কাঁধে ছিল। ছবির ইউনিট আমার জন্য আলাদা মনিটারেরও ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে শাবানা ম্যাম আর আলিয়ার অভিনয় এবং বাংলা উচ্চারণের সূক্ষতা আমি বুঝতে পারি।”
স্ট্রিক্টলি স্পিকিং-এর কর্ণধার বিকাশ কুমারের সঙ্গে প্রিমিয়ারে হুসনে
হুসনের কিছু কাজ মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেটফ্লিক্সের ‘সিএ টপার ত্রিভুবন মিশ্র’ (একটি বিশেষ চরিত্রে হুসনে অভিনয় করেছেন), জি স্টুডিওর ‘ব্রাউন’ (যেখানে হুসনে, প্রখ্যাত অভিনেত্রী করিশ্মা কাপুরের ডায়ালেক্ট কোচ, পাশাপাশি অভিনয়ও করেছেন)। এছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার একটি দলের সঙ্গে এই মুহূর্তে কাজ করছেন।
