ঋত্বিক-পাওলি অনবদ্য, কিন্তু রহস্যের প্রজাপতি কতটা উড়ল?

রহস্য সিনেমার নামে, কিছু রহস্য সিনেমার গড়নেও বটে

শান্তিলালের চারপাশে প্রজাপতি উড়ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে বড়ো সাধারণ শান্তিলালের চারপাশে। ‘দ্য সেন্টিনেল’ নামক সংবাদপত্রের ওয়েদার রিপোর্টার সে। অন্য খবর করার বরাত জোটে না। সহকর্মীরা তাকে বিশেষ পাত্তাও দেয় না। বিয়ের প্রজাপতিও তার গায়ে এসে বসে কই! এহেন শান্তিলাল তাই সারাদিনের হতাশা ভোলে সন্ধ্যাকালীন মদ্যপানে আর গভীর রাতে ডিভিডি-বন্দী নীলছবি দেখে। সেইসব ছবিতে ‘নীল নায়িকা’ রোশনির বাঁদিকের পেটে একটা প্রজাপতির ট্যাটু। শান্তিলালের অবচেতনে জড়িয়ে যায় সেই চিহ্ন।

প্রতীম ডি গুপ্তর ‘শান্তিলাল ও প্রজাপতি রহস্যে’ যাবতীয় সমস্যার মূলে এই প্রজাপতি। অবশ্য সমস্যা কেন বলছি! বলা ভালো রহস্য। সিনেমার নামে এবং ট্রেলারেই স্পষ্ট এটি থ্রিলার। বাংলা চলচ্চিত্রে এখন থ্রিলারের রমরমা। গোয়েন্দাদেরও সংখ্যা কম নয়। সেই ভিড়ে শান্তিলাল আলাদা হতে পারবে কিনা, সেটা নেহাত ছোটো প্রশ্ন ছিল না। শান্তিলাল দিব্বি আলাদা হয়েছে বাকিদের থেকে। একজন অতি সাধারণ, সাদামাটা সাংবাদিক সে। সাদা চোখে ছবির নায়ক মায় গোয়েন্দা হয়ে ওঠার মতো প্রায় কোনো যোগ্যতাই তার নেই। এমন মানুষই যখন আস্ত একটা রহস্যের জট ছাড়িয়ে ফেলে, তখন সেটা আর সাধারণ থাকে না।

সিনেমার গপ্পটা একমুখী। অতি সাধারণ সাংবাদিক শান্তিলাল একদিন বুঝতে পেরে যায় প্রজাপতির ভিতরেই রহস্য। যে প্রজাপতিকে নীল ছবির নায়িকার পেটে দেখেছিল সে। এরপর, তার দেখা হয় বিখ্যাত নায়িকা নন্দিনীর সঙ্গেও। দেখা মানে অবশ্য লুকিয়ে দেখা। পেজ থ্রি সাংবাদিক তো নয় শান্তিলাল। তার আর সুযোগ কোথায় যে নন্দিনীর সামনে ঘেঁষবে! নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাওলি দাম। ইন্ডাস্ট্রির এক নম্বর নায়িকা, কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকতে থাকতেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নিজের জায়গাটুকু লড়াই করেই গড়ে নিতে হবে, তা তিনি ভালোই বোঝেন। এহেন নন্দিনীর সঙ্গেও জড়িয়ে যায় রহস্যের সুতো। আর সেই জট ছাড়ানোর জন্য কেমন জেদ চেপে যায় শান্তিলালের। ভালো ‘লিড’ পাওয়া সত্ত্বেও অফিস থেকে ছুটি মেলে না। অতএব, নিজের জমানো টাকা-পয়সা সম্বল করেই সে ছোটে চেন্নাই। সেখান থেকে সিঙ্গাপুর। তারপর ব্যাক টু কলকাতা। রহস্য সলভড, এবং অন্য রহস্য শুরু। ক্রমে সেটাও ‘সলভড’।

হলে বসে দেখতে খারাপ লাগবে না এই সিনেমা। বিশেষ করে ঋত্বিক আর পাওলির জন্য। ঋত্বিক চক্রবর্তী জাত অভিনেতা। চেহারাগত একটা সুবিধে তিনি সব জায়গাতেই ভোগ করেন। ভিড়ে মিশে যাওয়ার মতো সাবলীল চেহারা তাঁর। তাই শান্তিলালের মতো সাধারণ মানুষ হয়ে উঠতে তাঁকে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু শান্তিলাল তো নিছকই অতি সাধারণ নয়। সে যথেষ্ট বুদ্ধিমান, প্রয়োজনে তস্য স্মার্ট। কখনো তার চোখ জ্বলজ্বল করে ধূর্ততায়।এই বুদ্ধি, স্মার্টনেসকে নিজের চরিত্রে অসামান্য বুনেছেন ঋত্বিক। পত্রিকার সম্পাদক গৌতম ঘোষকে দেওয়া শর্তের দৃশ্যেই হোক কিংবা মদ্যপানের দৃশ্যে ঋত্বিক অনবদ্য। ধূসর রঙের একটা চাদর নিজের গায়ে চড়িয়ে নিয়েছেন ঋত্বিক। অতি বড়ো অভিনেতাদেরও কিছু ম্যানারিজম থাকে। ঋত্বিকেরও আছে। কিন্তু সেই ম্যানারিজমকে কীভাবে চরিত্রের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হয়, ঋত্বিক জানেন। এই ছবিতেও সেটা করে দেখিয়েছেন তিনি।

আর পাওলি! তিনি এই ছবিতে তুলনায় কম স্ক্রিন-স্পেস পেয়েছেন। যেটুকু পেয়েছেন, ভরিয়ে দিয়েছেন যাকে বলে। বিশেষ করে ছবির শেষ ১০-১৫ মিনিট। সেইসময় পাওলিই খেলেছেন, ঋত্বিক তাঁকে সঙ্গত করেছেন। আতঙ্ক, অসহায়তা, ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা—সমস্ত বিন্দুতেই পাওলি অসাধারণ। তাঁকে লেগেওছে ভারি সুন্দর, প্রয়োজনীয় মুহূর্তে লাস্যময়ী। পাওলি না থাকলে এই সিনেমার প্রজাপতি উড়ত না।

তবে এই ছবির গপ্পে বেশ কিছু ফাঁক রেখে দিয়েছেন পরিচালক। হয়তো সেইসব ফাঁক নয়। কিন্তু সমস্ত দর্শক তো শান্তিলালের মতো গোপন মেধাবী হন না। তাদের বুদ্ধি তাই অনেক অঙ্কই মেলাতে পারে না। এই যেমন, ডিভিডির খারাপ মানের ভিডিও ভিতর থেকে উঁকি দেওয়া একটা ট্যাটু এতখানি গেঁথে গেল শান্তিলালের অবচেতনে? আচ্ছা সে নাহয় গেল, দুয়ে-দুয়ে চার-ও নাহয় হল। কিন্তু তার জন্যে নিজের জমানো টাকা খরচা করে চেন্নাই ছুটে যাওয়া! আচ্ছা, এও নাহয় মেনে নিলাম। কিন্তু ‘রকেট রঞ্জন’ অম্বরিশ! তিনি কে? তিনি কেনই বা এত সাহায্য করবেন শান্তিলালকে? সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্য টাকার বন্দোবস্তই বা করবেন কেন? কেবলমাত্র শান্তিলাল এই ছবির গোয়েন্দা আর তাকে রহস্যের সমাধান করতে হবে বলেই কি? আর কোনো কারণ সহজ বুদ্ধিতে মাথায় এল না। যেভাবে মগজে ঢুকল না, কীভাবে সামান্য কয়েকটা সাজানো মিথ্যের সাহায্যে নীলছবির দেবী রোশনির থেকে ‘মিনাক্ষী-র ছবি জোগাড় করে ফেলল শান্তিলাল! সবটাই বড়ো সহজ, বড়ো দ্রুত। একটা এত বড়ো ইন্ডাস্ট্রি, র্যা কেটের কেন্দ্রে এইভাবে পৌঁছে যাওয়া যায়! এই রহস্যের ‘লিড’-টাও কী কাকতালীয়ভাবেই না পেল শান্তিলাল! ডিভিডির দোকানের পাশেই বসে অন্ধ ‘চাচা’। যিনি দক্ষিণি নীল ছবির গোপন কম্মের 
হালহকিকত সব জানেন। শান্তিলালের ভাগ্য সত্যিই ভালো। 

শুধু আমাদের কাছে কয়েকটা অঙ্ক না মেলাই থেকে গেল। সিনেমার শুরুতেই পরিচালক বলে দিলেন, যে-সময়ে স্মার্টফোনে নীল ছবি দেখা যেত না, ডিভিডিতে দেখতে হত, যে-সময়ে ইন্টারনেট এত সহজলভ্য হয়নি—এই সিনেমা সেই সময়ের। ভালো কথা। শান্তিলালের খুব সাদামাটা মোবাইল। অথচ, শঙ্করলাল চক্রবর্তী সেই ফোনেই ‘হোয়াটস্যাপ’ করার কথা বলেন। কবে থেকে ওই মডেলের ফোনে হোয়াটস্যাপ এল! অথচ ঐ ফোনে নেট নেই বলেই তো লুকিয়ে অন্য সহকর্মীর ডেস্কের কম্পিউটার থেকে নেট খোলে শান্তিলাল। সংবাদপত্রের অফিসে সবার ডেস্কে কম্পিউটার ‘সে-যুগে’ থাকত না নিশ্চয়ই। কিন্তু, ২০১৮ সালের নভেম্বরে রিলিজ হওয়া রজনিকান্তের ২.০ সিনেমার বিজ্ঞাপন সেই সময়ে ‘গুগলে’ দেখা যেত! যে-সময়ে ভালো স্মার্টফোন না আসায় ডিভিডিতেই লোকে পর্ন দেখত, সেই সময়টা ‘সেলফিরও যুগ’! অন্তত নন্দিনীর কথা শুনে সেটাই জানা যায়। তালিকা চাইলেই বাড়ানো যায়, তাতে রহস্য আরো বাড়বে। আর আমরা তো কেউ শান্তিলাল নই, অতএব…

তবে ঐ যে বললাম, এই সিনেমা হলে বসে দেখাই যায়। অন্তত ঋত্বিক চক্রবর্তী আর পাওলি দামের জন্য তো বটেই।

সিনেমা: ‘শান্তিলাল ও প্রজাপতি রহস্য’

পরিচালক: প্রতীম ডি গুপ্ত

অভিনয়: পাওলি দাম, ঋত্বিক চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, শঙ্কর চক্রবর্তী, অম্বরিশ

 

Developed by DXDasia