
সত্যজিতের চোখে যেভাবে বাংলার মুখ দেখেছিলেন দুই শিল্পী
স্কেচ অথবা সিনেমায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাসটিকে (পথের পাঁচালি) সত্যজিৎ রায় যেভাবে ধারণ ছিলেন, একজন প্রকৃত শিল্পীর পক্ষেই তা সম্ভব, এ নিয়ে দ্বিমত নেই। নিজস্ব ধৃ-ক্ষমতাই সত্যজিতকে শিল্পী হিসেবে অনন্য স্বীকৃতি দিয়েছে, মকবুল ফিদা হুসেন থেকে পাবলো পিকাসো অবধি পৌঁছে দিতে পেরেছে ‘পথের পাঁচালি’-কে।
মকবুল ফিদা হুসেন ভারতের একমাত্র শিল্পী যিনি স্যাভিল রো-র লম্বা সুট আর খালি-পায়ে হাঁটাচলাকে সহাবস্থান করাতে পারতেন একই শরীরে। তাঁর প্রিয় শহরের নাম কলকাতা। কলকাতা তাঁর জীবনের অনেকটা জুড়ে আছে। হুসেনের প্রথম একক প্রদর্শনী হয় মুম্বইতে। দ্বিতীয়টি কলকাতার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে। ১৯৪৫-এ গণনাট্য সঙ্ঘের উদ্যোগে মুম্বইতে (তখন বম্বে) আয়োজিত হয়েছিল ক্যালকাটা গ্রুপের ছবি ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনী। বেঙ্গল স্কুল-এর শিল্পচিন্তা থেকে দূরে সরে এসে প্রদোষ দাশগুপ্ত, গোপাল ঘোষ, পরিতোষ সেন, কমলা দাশগুপ্ত প্রমুখ কয়েকজন তরুণ শিল্পী ১৯৪৩ সালে গঠন করেছিলেন ক্যালকাটা গ্রুপ। সুভো ঠাকুর এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। যদিও রামকিঙ্কর ছিলেন প্রধানতম, তবে তিনি ছিলেন গ্রুপের আমন্ত্রিত সদস্য।
মুম্বইয়ে প্রথম একক প্রদর্শনীর পর উদ্বুদ্ধ হন হুসেন ও সহমর্মী তরুণেরা। সাতচল্লিশ-এ গড়ে তোলেন ‘বোম্বে প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপ’। ১৯৫০-এ কলকাতায় ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’ ও ‘বোম্বে প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপ’-এর যৌথ প্রদর্শনী হয়। মকবুল ফিদা হুসেন নামক কিংবদন্তীর উত্থানের সেই শুরু। তবে, সে-সময়কার বাংলার সবচেয়ে খ্যাতিমান শিল্প-সমালোচক ও সি গাঙ্গুলি তাঁর কাজের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘বিট্রেয়াল অব যামিনী রায়’ অর্থাৎ যামিনী রায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। কলকাতায় তাঁর একটি ছবিও বিক্রি হয়নি। কলকাতা ফিরতি টিকিট কিনে বোম্বেতে ফিরে যাওয়ার মতো পয়সাও তাঁর হাতে ছিল না।
এভাবেই হুসেন নামী মহীরুহটির শিকড়ের একটি অংশ হয়ে আছে কলকাতা—এই বঙ্গভূমি। তাঁর কাছে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ ছিল সেই বঙ্গভূমিরই আত্মপ্রতিকৃতি। শিল্পী হিসেবে তাঁকে ছুঁয়ে গিয়েছিল অপর শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার অনুরাগী আমি। ওঁর পরিচালিত ছবিগুলোর মধ্যে প্রথম যেটা দেখি, তার নাম ‘পথের পাঁচালি’। ছবিটা আমাকে এতটাই ভাবিয়েছিল যে বেশ কয়েকটা ছবি এঁকে ফেলি। গ্রামবাংলার পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় আমার।”

জল রং-এ আঁকা অপু-দুর্গা

ইন্দির ঠাকরুণ

অয়েল ক্রেয়নে আঁকা ‘অপু অ্যান্ড দ্য ট্রেন’
১৯৮৬ সালের ‘গীতাঞ্জলী থেকে পথের পাঁচালি’ (From Gitanjali to Pather Panchali) শীর্ষক প্রদর্শনীটি ছিল সত্যজিতের চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলি। অয়েল ক্রেয়নে আঁকা ‘অপু অ্যান্ড দ্য ট্রেন’, জল রং-এ আঁকা দুর্গা বা ইন্দির ঠাকরুণ -এই সিরিজের ছবিগুলো দেখলে বোঝা যাবে পথের পাঁচালি-র দৃশ্যভাবনা, সত্যজিৎ রায়ের চোখে ধরা পড়া নব্য বাস্তববাদের ভিতর দিয়ে বাংলার রূপ প্রভাবিত করেছিল কিছু ক্যানভাস, মকবুল ফিদা হুসেনকে। ছবিগুলোতে আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হল বাংলায় ‘হুসেন’ সই।
জল রং-এ আঁকা দুর্গা
সুন্দরম পত্রিকায় প্রকাশিত খবর
এবার আসা যাক, পিকাসোর কথায়। একটি পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, সত্যজিতের চোখে বাংলার মুখ দেখেছিলেন তিনি। সুভো ঠাকুর সম্পাদিত শিল্প বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘সুন্দরম’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রাবণ মাসে, বাংলার ১৩৬৩ সনে (ইংরেজি ১৯৫৬ সাল)। পত্রিকাটির প্রচ্ছদসজ্জা ও লিখন-এ নাম থাকত সত্যজিৎ রায়ের। প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যার ‘খবরাখবর’ বিভাগে বেরিয়েছিল, “সম্প্রতি সত্যজিৎ রায়ের নিজের তোলা ‘পথের পাঁচালী’র কয়েকটি স্টিল ছবি দৈবক্রমে বিখ্যাত ফরাসী শিল্পী প্যাব্লো পিকাসোর নজরেতে পড়ে। পিকাসো ছবিগুলি দেখে কম্পোজিসন প্রভৃতির বিশেষ প্রশংসা করেন এবং ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন।” (পত্রিকায় প্রকাশিত বানান অপরিবর্তিত রাখা হল)
পরিশেষে পাঠকদের জানাই, স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষে সিমা গ্যালারি-তে ‘কালার্স অফ ফ্রিডম’ নামে একটি প্রদর্শনী চলছে। সেখানে দেখে আসতে পারেন হুসেনের আঁকা পথের পাঁচালি সিরিজের কিছু ছবি। ২০ মে শুরু হয়েছে প্রদর্শনী। চলবে জুলাই মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত।
তথ্যসূত্রঃ
দেশ পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা, সুন্দরম পত্রিকা, চতুরঙ্গ পত্রিকা, দ্য কুইন্ট
