বাংলা নাট্যজগতে ভাগ্যিস মোহিত চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন!

ইংরেজি অনুবাদের বাইরে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক ছিল অন্য ভুবন

বাংলা থিয়েটারের এক ‘অবর্ণনীয়’ নায়ক মোহিত চট্টোপাধ্যায়। বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটারকে নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন। বাংলা থিয়েটার যখন শিকড়ের বাইরে নতুনভাবে মুক্তির পথ খুঁজছে, বিশ্বের নানান প্রান্তের নাটকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছে বাংলার রঙ্গালয়, ঠিক সেই সময় মোহিত আসেন খানিক রাজার বেশে। মনে করেছিলেন বাংলা থিয়েটার বিশ্বের মাটিতে পৌঁছে যাবে দেশীয় মেজাজেই। মোহিত চট্টোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছিলেন, সিনেমার চিত্রনাট্য যদি সাহিত্য না হয়, তাহলে নাটক কেন টেক্সট হিসেবে সাহিত্য বলে গণ্য হবে? এমন কথা যিনি বলেছিলেন, তাঁর লেখা নাটক এবং চিত্রনাট্যগুলিও যে সাহিত্যগুণে অনন্য, কাব্যিক পেলবতায় মধুর, সে কথা রসজ্ঞজনেরা অস্বীকার করতে পারেন না আজও।

ওপার বাংলার বরিশাল শহর ছেড়ে ঠিক স্বাধীনতার বছরেই কলকাতায় চলে আসেন এক চোদ্দো বছরের রোগা লাজুক বই-পড়ুয়া ছেলে। বোঝা যায়নি যে, এই ছেলেটি বাংলা সাহিত্যের জন্য বলিপ্রদত্ত। সারা জীবন যিনি বাংলা সাহিত্যের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারবেন না এবং বন্ধুদেরও বেরোতে দেবেন না। মোহিতের ঘনিষ্ঠ কবিবন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন, “ছাত্রজীবন শেষ করার পর কবিদের কোনও না কোনও জীবিকা নিতেই হয়। দায়িত্ব নিতে হয় সংসারের। অধিকাংশ কবিই স্কুল বা কলেজে পড়াবার খোঁজে, কেউ বা ঢুকে পড়ে সংবাদপত্রের অলিন্দে। সংবাদপত্র অনেক সময় গিলে ফেলে কবিকে। শিক্ষকতা বা অধ্যাপনাও অনেক সময় কবিকে করে তোলে গদ্যময়। সারা জীবন সাহিত্যকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা খুব শক্ত ব্যাপার। কিন্তু মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের তো উপায়ও নেই, ইচ্ছে করলেও সে সাহিত্য থেকে সরে যেতে পারবে না।”একরোখা আর জেদি মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের লেখা প্রথম নাটক ‘কণ্ঠনালিতে সূর্য’ (প্রথম মঞ্চায়ন ১৯৬৩ সালে)। উদ্ভট বা অ্যাবসার্ড নাটকের ধারায় যুক্ত হল এক নতুন যাত্রা। তারপর বহু পূর্ণাঙ্গ ও একাঙ্ক নাটক, টিভি ধারাবাহিক এবং চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন মোহিত। গত শতকের ষাট-সত্তরের দশকে বাংলা থিয়েটারের অবস্থা বেশ করুণ ছিল। উত্তর কলকাতার পেশাদারি নাট্যদলগুলো তখন টিমটিম করছে। আর অন্যদিকে, বিপুল উদ্দীপনায় শুরু হচ্ছে গ্রুপ থিয়েটার, তাকে ঘিরে আন্দোলনও। নতুন আঙ্গিক, আধুনিক চিন্তাধারা, বিষয় অনুযায়ী মঞ্চসজ্জা, অতি-নাটকীয় কিংবা গলাকাঁপানো অভিনয় ধারার বিপরীতে হাঁটছে গ্রুপ থিয়েটার। কিন্তু নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে সেই রবীন্দ্রনাথ কিংবা উপন্যাসের নাট্যরূপ। অথবা কোনও বিদেশি নাটকের ভাবানুবাদ। মোহিত চট্টোপাধ্যায়, বাদল সরকারেরা সেই সময় এসেছিলেন খানিক জেদ নিয়ে। হলও তাই।

সে সময় প্রচুর মঞ্চসফল মৌলিক নাটক লিখে বাংলা থিয়েটারকে বিদেশি নাটকের ওপর নির্ভরতা থেকে বের করে আনলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে। এ প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “বিদেশি নাটককে বাংলার ঘরে আনা দোষের কিছু নয়। তাতে আমাদের নাট্যজগৎই সমৃদ্ধ হয়। তবে একটাও মৌলিক নাটকের দেখা নেই। শুধু নির্ভর করতে হবে বিদেশি নাটকের উপর? এ রকম অবস্থা লজ্জাজনক নয়? এই সময় মোহিত চট্টোপাধ্যায় একটার পর একটা নাটক লিখতে শুরু করে। তার প্রথম দিকের কয়েকটি নাটকের সংলাপে একটু বেশি বেশি কাব্যিক ভাব থাকলেও অচিরেই সে নতুন ভাষা আয়ত্ত করে। তার নাটকগুলো মঞ্চে সাফল্য পায়। নাট্যকার হিসেবে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের সাফল্য যত না ব্যক্তিগত, তার চেয়েও বেশি ছিল বাংলার নাট্যজগতে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন যোগ্য নাট্যকারকে পাওয়া।”

মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের অন্যান্য নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য– ‘রাজরক্ত’ (১৯৭০), ‘ক্যাপ্টেন হুররা’ (১৯৭০), ‘রাক্ষস’ (১৯৭৬)। কবিতায় তিনি লিখেছেন, “হে কঠিন সিংহাসন, তুমি এ পৃথিবীর তিনভাগ নিও/ বালকের জন্য কিছু দ্বিধাহীন ক্রীড়াভূমি রেখো।”

আজ মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের ৮৭তম জন্মদিন।

তথ্যসূত্রঃ

১) ‘কবিতা থেকে নাটক, এক সুদীর্ঘ যাত্রা’ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (আনন্দবাজার পত্রিকা/ ২১ মার্চ, ২০১২)

২) মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ‘বুদ্ধির জগৎ থেকে’

৩) বঙ্গদর্শন আর্কাইভ

Developed by DXDasia