১৯৯৭ সালের ১৯ মে গভীর রাতে প্রয়াত হন শম্ভু মিত্র
প্রথম পর্ব
মঞ্চ অন্ধকার
প্রেক্ষাগৃহও অন্ধকার হয়ে যায়
সেই অন্ধকারের মধ্যে অনেকের উল্লাস চিৎকার শোনা যায় যে,
‘হৈ-ঈ-ঈ-য়াঃ।’
সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বলে ওঠে
দেখা যায়, অতীত বাংলার গাঙুর নদীর তীরে চম্পক নগরী আর তারই যৌবনের প্রতীক সব লোকজন।
১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট অ্যাকাডেমিতে শম্ভু মিত্র পাঠ করেন ‘চাঁদ বণিকের পালা’। সেই নাটক ২০২১-এ যখন ইউটিউবে শুনছি, আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি কেন বাংলা নাট্য জগতে তিনি 'শম্ভু মিত্র'। তাঁর কণ্ঠস্বরই ছিল আস্ত একটা থিয়েটার। তিনি ‘অন্ধকার’ উচ্চারণ করলে সত্যি সত্যিই মঞ্চে অন্ধকার ঘনিয়ে আসত। আবার সজোরে ‘হৈ-ঈ-ঈ-য়াঃ’ ডাক ছেড়ে তৎক্ষণাৎ মুড বদলে শান্ত স্বরে ‘আলো জ্বলে ওঠে’ বলে মঞ্চে আলোও জ্বালিয়ে দিতে পারতেন। কণ্ঠাভিনয়ের মাধ্যমেই জ্যান্ত করে তুলতে পেরেছিলেন তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক ‘চাঁদ বণিকের পালা’ এবং তিনি নিজে হয়ে উঠতে পেরেছিলেন নাটকের প্রোটাগনিস্ট ‘চাঁদ’—চাঁদ সদাগর।
তাঁকে নিয়ে এত কথা থাকতে হঠাৎ ‘চাঁদ বণিকের পালা’ নিয়ে পড়লাম কেন? সেকথায় আসছি, তার আগে দু-চার কথা যা বলতে চাই-
কম-বেশি আমরা প্রত্যেকেই জানি, যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, মন্বন্তর, দাঙ্গা চল্লিশের দশককে উত্তাল করে তুলেছিল। এর কিছু আগে তৈরি হয়েছিল ‘অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’। যার থেকে পরে ‘গণনাট্য সংঘ’র জন্ম। এই সংগঠনের ছাতার তলায় বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও সাহিত্যিকরা সমবেত হতেন। ও দিকে যুদ্ধের বোমা পড়ার ভয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল কলকাতার নাগরিকরা। সেই সময়কে উদ্দেশ্য করে শম্ভু মিত্র লিখছেন, “তখন ১৯৪১ সাল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কাল। আমি শ্যামবাজারের থিয়েটার ছেড়ে দিয়েছি এবং ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সঙ্গে পরিচিত হইনি। কিন্তু সাধারণ নাগরিক হিসেবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আমাদের নিঃসহায়তায় কষ্ট পেয়েছি।”
২৬ বছরের যুবকের একাকিত্বের ভিতর হাঁটতে হাঁটতেই লিখেছিলেন তাঁর প্রথম নাটক ‘উলুখাগড়া’, শ্রীসঞ্জীব নামে। গল্পও লিখতে শুরু করেছিলেন, নাম ‘সংক্রমণ’। তবে তাঁর সেই অসহায় অবস্থা কেটে গিয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের ডাক পেয়ে। ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটের বাড়িতে পা রাখার পর জনপ্রিয় মানুষ ও নামডাকের কাছাকাছি পৌঁছে গেছিলেন। নামডাক বলতে যা বোঝায়, তা তিনি আজীবন তাঁর নাটকের মধ্য দিয়েই পাওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছেন। ‘গণনাট্য সংঘ’ শম্ভু মিত্রকে প্রথম সেই পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিল।
শাঁওলী মিত্রর বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘মা-বাবার বিয়ে হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ১০ ডিসেম্বর মুম্বই শহরে। ওদের বিয়ে হয়েছিল খাজা আহমদ আব্বাসের বাড়িতে। সে বাড়ির নাম ছিল ‘সমুদ্র তরঙ্গ’। আব্বাস সাহেবের স্ত্রী মুঝঝি ও শ্যালিকা ছাদি বিয়ের বিরিয়ানি রান্না করেছিলেন। বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা। কন্যাকর্তা হন মামুজান, তিনি ছিলেন আব্বাসের শ্বশুর এবং মামাও বটে। দস্তুরখান বিছিয়ে ইসলামি কায়দায় বিরিয়ানি খাওয়া হয়েছিল।’ ১৯৪৫ সালে শম্ভুত-তৃপ্তি'র বিয়ে ছিল ‘গ্র্যান্ড আই পি টি এ ইভেন্ট’, অথচ মাত্র তিন বছর পরে ১৯৪৮ সালে সেই শম্ভু মিত্রই গণনাট্য ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। সে দীর্ঘ ইতিহাস অনেকেরই জানা।
উৎপল দত্ত বলেছেন, “গণনাট্য আন্দোলন থেকে এলেই যে হল না, নাট্য প্রযোজনা বা অভিনয়ের ক্ষেত্রে পেশাদারি সূক্ষ্মতারও বিরাট প্রয়োজন আছে, এই সত্যটি তিনি-ই সকলের চোখের সামনে তুলে ধরলেন।” আর বিভাস চক্রবর্তীর কথায়, “এইভাবেই নবনাট্য আন্দোলন শম্ভু মিত্র ও বহুরূপীর হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল অনেকখানি। সেই আন্দোলনকেই আজ আমরা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন বলে জানি।”
‘চাঁদ বণিকের পালা’ নিয়ে কথা বলছিলাম কারণ-
…দেখা যায়। অতীত বাংলার গাঙুর নদীর তীরে চম্পক নগরী আর তারই যৌবনের প্রতীক সব লোকজন।
উচ্ছ্বল কোলাহল তাদের…একজন উঠে বলে যে,
“ভাইরে, আমরা সমুদ্দুরের বুকে পাড়ি দিবই দিব”
সকলে কোলাহল করে সমর্থন জানায়। অপরদিকে অপর একজন লাফিয়ে উঠে বলে,
“আমাদের পিতৃপুরুষেরা নাও ভাসাইয়া হৈ দুরান্তরের পথে পাড়ি দিয়া গেছে, সেই পূর্বপুরুষের মর্যাদা আমরা ফিরে ফির জয় করে নিবই নিব”
সকলে আবার সমর্থন জানায়। তৃতীয় একজন উঠে বলে,
“ভাই সব আমরা ভিতু না, আমরা অথব্য না, আমাদের অন্তরে জোর আছে, আমাদের শরীরে শক্তি আছে। আমরা হই জোয়ান। তাই তো আমাদের তরে ভাই ওই চাকুরির গদি নাই, আমাদের তরে তাই সাঁঝের বেলা দাওয়ার উপরে বসে চক্ষু মুদে তাম্বাকু টানা নাই।”
সকলে খুব হেসে উঠে সমর্থন জানায়। আরেকজন বলে,
“হাঁতো, আমরা না মাণ্ডলিক, না শৌল্কিক, না চট্ট, না ভট্ট।
অন্য একজন বলে,
“হাঁ-হাঁ—যারা নিজেদের শুল্ক ফাঁকি দিয়্যা অপরের শুল্ক আদায় কর্যে ফিরে আমরা সেই মহামান্য বামহস্তকুশল শৌকিক না”
সকলে হো হো হেসে ওঠে।
সকলের হৈ হৈ এর মাঝে চাঁদ সদাগর আসে, সঙ্গে এক-আধজন। সকলে জয়ধ্বনি দেয়। চাঁদ এসে সকলের সম্মুখে দাঁড়ায়। সকলে নিস্তব্ধ হয়ে প্রতীক্ষা করে। চাঁদ নিজেই সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে ওঠে-
“ভাইসব,–এট্টা কথা মনে রাখা চাই, যে, দিনেরেতে বুকে ভরসা রেখো, আমাদের জয় হবেই হবে।”
‘চাঁদ বণিকের পালা’ যাঁরা তলিয়ে পড়েছেন বা শুনেছেন, তাঁরা জানবেন, একদিকে বল্লভাচার্য ও বেণীমাধবের দল বিপরীতে ভৈরব করালীদের দল – উভয়েই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ ক্ষমতায়ন প্রভৃতির দিক থেকে চম্পক নগরীকে বিশ্লেষণ করতে চায় কিন্তু তার উন্নতির কথা ভাবে না, তাকে রক্ষা করতে চায় না। এই রাজনৈতিক মদতপুষ্ট নাগরিকদের পারস্পরিক দলাদলি, স্বার্থপরতা এক অন্ধকার আবর্তকে ঘনিয়ে তোলে। আর মনসামঙ্গল কাব্যের আত্মপ্রতিষ্ঠা পরায়ণ মনসাদেবী সেই অন্ধকারের অজ্ঞানতার প্রতীক। এই অন্ধকারময় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ সৎ মানুষের লড়াই – চাঁদ সদাগরের লড়াই। চাঁদ সদাগর তাই বলেছে – “শুধু বেঁচে থাকা বল্যে কোনো কথা নাইরে জীবনে” – সে বুঝেছিল আলোর তীব্রতা অন্ধকারের চেয়ে অনেক বেশি ; তাই নিঃসীম অন্ধকারের মধ্যেও পাড়ি দেবার কথা বলে, পাড়ি দেয়। যতদিন বাঁচবে প্রেতের মতো হলেও সে পাড়ি দেবে। এই ‘পাড়ি’ র মধ্যেই নিহিত আছে ‘চাঁদ বণিকের পালা’ নাটকের মূলসূত্র আর শম্ভু মিত্রের জীবন দর্শন। নাটকটি নিঃসন্দেহে কালজয়ী। শম্ভু মিত্র তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডিকে গেঁথে দিয়েছিলেন মানুষের চিরন্তন সংগ্রাম ও এগিয়ে চলার ঐকান্তিকতার সঙ্গে। মানুষের উপর বিশ্বাস না হারিয়ে বারবার ডাক দিয়েছেন, “প্রস্তুত সবাই? হৈ-ঈ-ঈ-য়াঃ। কতো বাঁও জল দেখ। তল নাই? পাড়ি দেও, এ আন্ধারে চম্পক নগরী তবু পাড়ি দেয় শিবের সন্ধানে। পাড়ি দেও, পাড়ি দেও” সত্যের সন্ধানে শম্ভু মিত্র সারা জীবন পাড়ি দিয়েছিলেন, কারণ চাঁদের মতোই তাঁর চোখেও স্বপ্ন ছিল—নিজের বিশ্বাস অটুট রেখে নতুন কিছু তৈরি করার।
জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও তিনি বলেছেন, ‘স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। স্বপ্নগুলো সব কাচের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আবার সেগুলো তো জড়ো করতে হবে’। সেই স্বপ্ন ব্যক্তিগত নয়, সকলে মিলে দেখার। তিনি নাটকের মাধ্যমে তাঁর স্বপ্ন পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন সমাজের সর্বস্তরে, নাটকের প্রকৃত ক্ষমতা দেখাতে পেরেছিলেন শম্ভু মিত্র।
১৯৯৭ সালের ১৯ মে গভীর রাতে প্রয়াত হন শম্ভু মিত্র। তার পর তাঁরই ইচ্ছে অনুযায়ী শাঁওলী মিত্র গভীর রাতেই সিরিটির শ্মশানে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে মৃতদেহ দাহ করে ফিরে তবেই বাবার মৃত্যুসংবাদ পাঁচকান করেছিলেন। শ্মশানের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি মধ্যরাতের শ্মশানযাত্রীদের দেখে ও মৃত মানুষটির নাম জেনে প্রশ্ন করেছিলেন, “ইনি কি সেই শম্ভু মিত্র? যিনি নাটক করেন?” উত্তর পাননি। পাওয়ার কথা নয়। কারণ, তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, “আমি সামান্য মানুষ, জীবনে অনেক জিনিস এড়িয়ে চলেছি। তাই মরবার পরেও আমার দেহটা যেন তেমনি নীরবে, একটু ভদ্রতার সঙ্গে, সামান্য বেশে, বেশ একটু নির্লিপ্তির সঙ্গে পুড়ে যেতে পারে।”