
বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক হয়ে আছে বহু-নিন্দিত এবং বহু-প্রশংসিত সেকালের ‘শনিবারের চিঠি’
হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল কেউই রক্ষা পাননি ত্রিশ-চল্লিশ দশকে ‘শনিবারের চিঠি’র ব্যঙ্গ-শেল থেকে। শুধু তাঁরা নন, ব্রিটিশ রাজশক্তির দমননীতি ও অত্যাচারের ব্যপকতা, বিবিধ কুসংস্কারের প্রসার, ধর্মের নামে উগ্রপন্থা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টির সমালোচনা থেকে শুরু করে ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’ ইত্যাদি পত্রিকার বহু নামজাদা লেখক, নব্য লেখক গোষ্ঠী এবং তাঁদের লেখালিখিই ছিল এই পত্রিকার টার্গেট। প্রধানত সাহিত্যসমাজ-রাষ্ট্রের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বর্ষণের উদ্দেশ্য নিয়েই পত্রিকাটির সূচনা। ছাপা হত বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গচিত্র—কার্টুন। আর এভাবেই ‘কাউন্টার লিটারেচার’-এর ভাষায় ব্যতিক্রমধর্মী সমালোচনামূলক সাময়িকী পত্রিকা হিসেবে বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক হয়ে আছে বহু-নিন্দিত এবং বহু-প্রশংসিত সেকালের ‘শনিবারের চিঠি’।
যোগানন্দ দাসের সম্পাদনায় ১৯২৪ সালে সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসাবে ‘শনিবারের চিঠি’র আত্মপ্রকাশ। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত লেখক ও সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পুত্র অশোক চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’র অন্যতম সংগঠক। অশোক চট্টোপাধ্যায় নিজেও ব্যঙ্গরচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর লেখা ‘আনন্দবাজার’ গল্পসংগ্রহটি এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। ‘শনিবারের চিঠি’তে যে-সব বেনামী ব্যঙ্গ রচনা প্রকাশিত হত, তাদের অন্যতম লেখক ছিলেন অশোক চট্টোপাধ্যায়। পত্রিকার মূল্য ছিল সংখ্যা প্রতি এক আনা, বার্ষিক ডাকমাশুলসহ তিন টাকা।
প্রথমাবস্থায় মাত্র সাতাশটি সংখ্যা প্রকাশের পর ‘শনিবারের চিঠি’র প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেলেও ১৯২৮ সালে নীরদ সি চৌধুরীর (যিনি পরবর্তীকালে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় ব্যতিক্রমধর্মী লেখক হিসেবে বিশেষভাবে নন্দিত ও নিন্দিত হন) সম্পাদনায় মাসিক হিসাবে ‘শনিবারের চিঠি’ আবার বের হয়। ওই সালেই ‘শনিবারের চিঠি’ সম্পাদনার দায়িত্ব, সজনীকান্ত দাশের ওপর অর্পিত হয়। প্রথম পর্যায়ে এই দায়িত্ব তিনি ১৯৩১ সাল পর্যন্ত পালন করেন। ১৯৩২ সালে সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামী সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদক হয়ে একটানা ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বহাল থাকেন। ১৯৩৮ সালে সজনীকান্ত পুনরায় মাসিক ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদকের দায়িত্ব নেন এবং একটানা ওই দায়িত্বে ব্রতী থাকেন। ১৩৩৯-এর শেষ দিকে এ পত্রিকার বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। নজরুলকে নিয়ে ঠাট্টার সূত্রে ‘কল্লোল’ এবং ‘কালিকলমে’র সঙ্গে শনিবারের চিঠি’র সাহিত্যিক দ্বন্দ্ব এবং সাহিত্য-সৃষ্টির ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিতর্ক হওয়ার পরে সজনীকান্তের বোধোদয় হয়। অবশেষে, পত্রিকার ফোকাস-এ শুধুমাত্র ব্যঙ্গ না রেখে বিভিন্ন ধরনের লেখা প্রকাশ করতে শুরু করেন।
‘শনিবারের চিঠি’-তে লেখার নাম থেকে শুরু করে লেখকের নাম সবটাই যেন ব্যঙ্গরসে টইটুম্বুর। এক্ষেত্রে কয়েকটি উদাহরণ না দিলেই নয়-
‘নতুন বনাম পুরোনো’ লিখেছেন শ্রী অজ্ঞাত (আসল নাম জানা যায়নি), ‘প্রসঙ্গ-কথা’ লিখেছেন বলাহক নন্দী (নীরদ চন্দ্র চৌধুরী), ‘নব-রুবাইয়ত’ লিখেছেন চামার খায়-আম (মোহিতলাল মজুমদার), ‘তামাক ও বড় তামাক’ লিখেছিলেন পরশুরাম (সকলেই জানে তিনি কে), ‘কামস্কাটকীয় ছন্দ’ লিখেছেন ভাবকুমার প্রধান (সজনীকান্ত দাস), ছদ্মনাম নয় আসল নামেই ‘মাইকেলবধ-কাব্য’ও লিখেছিলেন সজনীকান্ত, ‘পুরোনো খাতার পাতা’ লিখেছেন শ্রী বাঙালীর মেয়ে (শান্তা দেবী), ‘নেতা’ লিখেছেন বঙ্গচন্দ্র সিদ্ধান্ত (যোগানন্দ দাস), ‘চিপোর্ট’ লিখেছিলেন সজনীকান্ত দাস ও এই লেখার অলংকরণ করেছিলেন হরিপদ রায়, ‘বুড়োদের বিয়ে’ লিখেছেন সুধাকান্ত রায়চৌধুরী ও এই লেখার প্রাসঙ্গিক ছবি এঁকেছিলেন নন্দলাল বসু।
বাঁ-দিকে শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা, ডান-দিকে সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর লেখা ‘বুড়োদের বিয়ে’-তে নন্দলাল বসুর আঁকা
‘বিজ্ঞাপনী সাহিত্য’ লিখেছেন মৌলা দোপেঁয়াজী (হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়), ‘তন্দ্রাহরণ’ লিখেছেন চন্দ্রহাস (শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), ‘গেঁড়াতলা সাহিত্য’ লিখেছেন দিবাকর শর্মা (রবীন্দ্রনাথ মৈত্র), ‘শালা’ লিখেছেন বনফুল, ‘যদি গদি পাই’ লিখেছেন কুমারেশ ঘোষ, ‘—ট্রিটি’ লিখেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বোমার হিড়িক’ ‘যোগাযোগ!’ লিখেছেন শিবরাম চক্রবর্তী, ‘ছবিতা’ লিখেছিলেন সজনীকান্ত দাস ও এঁকেছিলেন হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়।
সজনীকান্ত দাসের লেখায় ও হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়ের রেখায় ‘ছবিতা’
সব উল্লেখ করা না গেলেও, এবার বলবো সেই লেখাপত্তরগুলো নিয়ে, যা বিদ্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে। প্রথমেই বলবো কাজী নজরুল ইসলামের কথা। ১৩৩৩ সালের আষাঢ় থেকে ১৩৩৪ সালের কার্তিক পর্যন্ত ‘শনিবারের চিঠি’র বিভিন্ন সংখ্যায় নজরুলের বিভিন্ন রচনা ব্যঙ্গ করে অনেকগুলো প্যারোডি ছাপা হয়েছিল। ভাদ্র সংখ্যায় নজরুলকে ‘বাংলার আধুনিক বরপুত্র নবযুগ ধুরন্ধর সাহিত্য সারথি’ আখ্যা দিয়ে তাঁর ‘অনামিকা’ কবিতার একটি প্যারোডি ছাপা হয় ‘বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ’ নামে, রচয়িতা গাজী আব্বাস বিটকেল। মাসিক ‘শনিবারের চিঠি’র প্রথম সংখ্যায় মধুকর কাঞ্জিলাল রচিত, ‘তোমাদের প্রতি’ নামে যে কবিতাটি ছাপা হয় সেটিও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে ব্যঙ্গ করে লেখা:
ওগো বীর
ফেলে দিয়ে কাঁথা আর খাটিয়া তাকিয়া
ওঠো, জাগ, গা ঝাড়িয়া, চুল রগড়িয়া
তবু উচ্চ শির…
হে সাহিত্য শিরোরত্ন আনিয়াছ টানি
মগজের কোন কেন্দ্র হতে? বল বীর,
কোন ব্যাধি তোমারে করেছে আজ এমন অস্থির?
হে কবি ‘কেমিস্ট’
প্রেম রসায়নে পকস্ফ পণ্ডিত ‘প্রেমিস্ট’
তব্য কাব্য ‘রি-এজেন্ট’ রসে
সর্ব প্রেম মূর্ত হয় সর্ব হুরী আসে তব বশে। …
‘শনিবারের চিঠি’র এসব ব্যঙ্গ রচনার উদ্দেশ্য ছিল নজরুলের চরিত্র হনন, প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করার পর থেকে যার শুরু। শুধু কবিতায় নয়, ১৩৩৪-এর ভাদ্র থেকে পৌষ, পাঁচটি সংখ্যায় ‘গণবাণী’ পত্রিকাকে ব্যঙ্গ করে ‘কচি ও কাঁচা’ নামে একটি পঞ্চাঙ্ক নাটক ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। নাটকে উল্লিখিত পাত্র-পাত্রিগণ ছিলেন সম্পাদক, কার্ল মার্কস, শেলি, লেনিন, ট্রটস্কি, হুইটম্যান, প্রলেতারিয়েত বায়রন, বৌদি, খেঁদি, ছেঁড়া নেকড়া, ভাঙা চুড়ি, ছেঁড়া চুল ইত্যাদি। চরিত্রগুলির প্রকৃত পরিচয়, কার্ল মার্কস (মুজফ্ফর আহমেদ), ট্রটস্কি (সৌমেন ঠাকুর), প্রলেতারিয়েত বায়রন (নজরুল ইসলাম)। এ নাটকের সময় খ্রিস্টীয় বিংশ শতাব্দী, স্থান কলকাতা মহানগরী। নাটকে ‘ঢেঁকীর গান’, ‘কুলোর গান’, ‘চায়ের গান’, অর্থাৎ নজরুলের ‘কৃষাণের গান’, ‘জেলেদের গান’-এর প্যারোডি সংযোজিত হয়েছিল ‘যুগ লক্ষ্মণগুলি’ প্রকাশ পাবে বলে। নাটকটির সূচনা ‘ঢেঁকী ও কুলোর গান’ দিয়ে। মাসিক ‘শনিবারের চিঠি’র আশ্বিন সংখ্যায় নাটকটির দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যের পরিচয়লিপিটি ছিল আসলে ‘গণবাণী’ অফিসের ব্যঙ্গচিত্র :
‘হ্যারিসন রোডের ওপরে একটি গৃহের দ্বিতলে সাপ্তাহিক বোলশেভিকী কার্যালয়। গেরুয়া খদ্দর পরিহিত সৌম্যদর্শন সুশ্রী একটি ছোকরা সেই চাদরের উপর বসিয়া নিবিষ্ট চিত্তে প্রুফ দেখিতেছেন, তাঁহার আকৃতি ও সাজসজ্জার সহিত এই ঘরের কিছুই ভাল খাপ খায় না, ইনি ট্রটস্কি (সৌমেন ঠাকুর)। পশ্চাতের অন্ধকার দরজা দিয়া ‘আর পারি না সাধুতে লো সই’ এই গাহিতে গাহিতে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা ঘাড়ে গর্দানে এক হৃষ্টপুষ্ট কৃষ্ণকায় যুবকের প্রবেশ, ইনি প্রলেতারিয়েত বাইরন (নজরুল)। ইহার পিছনে কার্ল মার্কস (মুজফ্ফর আহমদ) লেনিন প্রভৃতি গণতন্ত্র দরদীদের প্রবেশ। বাইরন সজোরে ট্রটস্কির পিঠে এক থাবা মরিয়া চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন হুররে থ্রি চিয়ার্স ফর ‘বোলশিভিকী’ …।
এবার আসি রবীন্দ্রনাথের কথায়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা একাধিক বিদ্রূপের মধ্যে আমি বেছে নিয়েছি নলিনীকান্ত সরকারের ‘জয়জয়ন্তী’। দেশের জাতীয় সঙ্গীত জন-গণ-মন’র একখান প্যারোডি লিখে ফেলেছিলেন তিনি!
ঘন ঘন ধনমপি নায়ক জয় হে জয়ন্তিভাগ্যবিধাতা!
ইংলণ্ড-ফ্রান্স-সুইডেন-ইটালী-আরব-তুর্কী-কঙ্গো-আল্পস-ককেশস-দনিয়ুব-ভলগা-নাইল-মিসিসিপি-হংহো
তব ফরমাসে আসে বাংলা কবিতা চাষে
পূরিল কৃষ্টির খাতা।
ঘন ঘন লাঙল-দায়ক জয় হে, জয়ন্তিভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় জয় হে!
(মূল লেখা বানান অপরিবর্তিত রেখে শুধুমাত্র প্রথম ছত্রটি তুলে দেওয়া হল)
ভাবা যায়! ভাগ্যিস সময়টা ‘তখনকার’ ছিল—লিবারাল ছিল। এখন এসব ব্যাপার ঘটলে না জানি কী হত! এখন তো আবার ‘দ্বেষদ্রোহী’দের যুগ। সে যাই হোক, যা বলছিলাম…
শনিবারের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কম ব্যঙ্গ তো হয়নি! অথচ ব্যঙ্গ-সাহিত্য এবং সেই পত্রিকাটি সম্বন্ধেই সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন-
‘শনিবারের চিঠি : ব্যঙ্গ সংকলন’ থেকে নেওয়া রবীন্দ্রনাথের চিঠির অংশ
এমনকি তিনি নিজে বেশ কিছু টিপ্পনী-মার্কা লেখাও প্রকাশ করেছিলেন ‘শনিবারের চিঠি’-তে। সচেতন থেকে অসংলগ্ন কথা বলাটা মুশকিলের। কিন্তু অবচেতন মনেরও তো অনেক কথা থাকে, সেগুলোর কি হবে? রবীন্দ্রনাথ ঠিক করলেন অবচেতন মনের কাব্য অভ্যাস করবেন। তার একটি নমুনা ‘অবচেতনার অবদান’। লিখেছিলেন ১৯৩৯-এর ১৯ নভেম্বর পুনশ্চ-তে বসে। লেখাটির শেষাংশ এইরকম-
সিরাজগঞ্জে বিরাট মিটিং,
তুলো বের করা বালিশ।
বংশু ফকির ভাঙা চৌকির
পায়াতে লাগায় পালিশ।
রাবণের দশ মুণ্ডে নেমেছে,
বকুনি ছাড়ায়ে মাত্রা।
ন্যাড়ান্যাড়ি দলে হরি হরি বলে,
শেষ হল রামযাত্রা।
কিছু বুঝলেন? অবশ্য না বুঝলেও ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। রবীন্দ্রনাথ নিজের এই লেখা শুরুর আগে বলে নিয়েছিলেন, ‘কেউ কিছুই বুঝতে যদি না পারেন, তা হলেই আশাজনক হবে।’
সেইসব ঐতিহাসিক ‘শনিবারের চিঠি’গুলো গেল কোথায়?
‘শনিবারের চিঠি’র অধিকাংশ সংখ্যা এখন পড়ে রয়েছে শহরেরই এক নিলাম ঘরে৷ পার্ক স্ট্রিটের রাসেল এক্সচেঞ্জ-এ৷ নিলামের জন্য নয়, পত্রিকাগুলি রাখা রয়েছে ভাড়ায় দেওয়ার জন্য! হ্যাঁ, নিলামঘরের কর্তার কথা অনুযায়ী, টিভি সিরিয়াল কিংবা সিনেমার শুটিং-এ পুরোনো বইয়ের দরকার পড়লে তাঁরা এই ‘শনিবারের চিঠি’ বাঁধানো সংখ্যাগুলি ভাড়া দেবেন৷ দিয়েছেন আগেও৷ তবে ধুলোয় দেরাজবন্দি হয়ে পড়ে থেকে থেকে সময়ের কোপে অনেক পাতাই বিবর্ণ, হলুদ৷ কোথাও খুলে গিয়েছে বাঁধাই৷ কোথাও পাতা মোচড়ানো৷ সাবধানে ব্যবহার না করলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে প্রায় শতাব্দী প্রাচীন দুর্লভ পত্রিকার সংখ্যাগুলি।
