মিস শেফালি — ‘কাজের মেয়ে’ থেকে ক্যুইন অফ ক্যাবারে

পার্ক স্ট্রিটের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ ফারপোজে, ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল মিস শেফালির

আরতির বয়স তখন মাত্র ছয় মাস। দেশভাগের কয়েকবছর আগে বাবার কোলে ছয় মাসের সেই ছোট্ট আরতি চলে এসেছিল এপার বাংলায়। তারপর বড়ো হয়ে উঠল একরত্তি মেয়েটি। গান চললেই বিভিন্ন ছন্দে দুলে উঠত শরীর। কিন্তু আরতির চারপাশ জুড়ে শুধুই অর্থাভাব, অনটন। গল্পটা থেমে থাকার, নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর। বাবা শয্যাশায়ী। লোকের বাড়িতে কাজ না করলে খাবার জুটবে না। দেশে তখন স্বাধীনতা আসছে। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বড়ো বড়ো বন্দুকধারী পুলিশের দল। আরতি ভাবল তাকেই কিছু একটা করতে হবে। টাকা রোজগার করতে হবে।

‘ক্যুইন অফ ক্যাবারে’ মিস শেফালি

কলকাতা তখনও মত্ত পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে। ইংরেজ সাহেবদের বাড়িতে বাড়িতে রাতের আবহে জ্বলে উঠত টিমটিমে মৃদু আলো। কখনও মাঝরাতের হালকা ওয়েস্টার্ন ব্লুজে নেচে উঠত তাদের জীবন। আরতি দেখত সেসব। কোনো এক সন্ধেবেলা আরতির চোখ দেখা যেত অর্ধেক। লুকিয়ে লুকিয়ে সে তখন সাহেব-সুবোদের মত্ততা দেখছে। অবশেষে চৌরঙ্গির ফিরিঙ্গি বাড়িতে ‘কাজের মেয়ে’ হয়ে কাজ পেল। যেখানে সন্ধে হলেই পার্টিতে চলত রঙিন জলের ফোয়ারা। মেমসাহেবদের নাচ দেখত লুকিয়ে লুকিয়ে। আর তারপর আড়ালে চলত রিহার্সাল। পারছে, আরতি পারছে। অনেক ধরনের নাচে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে আরতি। সেই ফিরিঙ্গি বাড়িতে নিয়মিত আসতেন ভিভিয়েন হ্যানসেন সাহেব। এই সাহেবের আরতিকে বেশ পছন্দ হয়ে যায়। তিনিই নিয়ে গেলেন পার্ক স্ট্রিটের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ ফারপোজে। ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল অবশেষে। মাসিক ৭০০ টাকা বেতনে চাকরি পেলেন আরতি দাস। হয়ে উঠলেন মধ্যরাতের ‘মিস শেফালি’। দিনের আলোয় যিনি বাড়ির বড়ো মেয়ে আরতি, রাতের উদ্দামতায় তিনিই শেফালি। রাতের শেফালি ফুল ঝরে যায় ভোর হলেই। তখন আর কেউ তাঁকে মনে রাখে না। কিন্তু রাতের পাশ্চাত্য গানের ছন্দে মিস শেফালি হয়ে উঠলেন বাংলার প্রথম এবং একমাত্র ক্যাবারে ডান্সার। হেলেন তখন মুম্বাইয়ে। হেলেনের পাশে জুড়ে গেল শেফালির নাম। শরীরের উত্তাপে তখন ভিজে যাচ্ছেন কলকাতার সাহেব-সুবোরা। কেউ জানল না শেফালির আড়ালে রয়েছে ঘরোয়া একটা মেয়ে, আরতি।

বার-নর্তকী। নিরাবরণ হয়ে প্রতি রাতে নেচে ওঠার লড়াই। চোখে টানা কাজল, অল্প পোশাক, মুখে সাদা মেকআপ নিয়ে শেফালি হয়ে উঠেছিলেন ব্যাকরণহীন এক রহস্যময় নারী। শিখলেন ইংরেজি ও হিন্দি। জানলেন ক্যান ক্যান, চার্লসটন, টুইস্ট, হাওয়াইয়ান হুলা এবং বেলি ডান্স। ফারপোজের পর বিশাল অঙ্কের চাকরি নিয়ে চলে গেলেন ওবেরয় গ্র্যান্ডে। সতেরো বছর সেখানে তিনি ছিলেন ক্যাবারে-রানি হয়ে। বিংশ শতকের সাতের দশকে মিস শেফালি ওবেরয় গ্র্যান্ডের প্রিন্সেস ডিস্কোর একমাত্র স্টার ডান্সার। রাতের কলকাতা তাঁকে এক ডাকে চেনে। সুযোগ এল মঞ্চে অভিনয় করার। একমাত্র মিস শেফালিরই রোজগার ছিল কুড়ি থেকে বাইশ হাজার টাকা। তখনকার দিনে এ টাকা যেকোনো শিল্পীর কাছেই স্বপ্নের মতো। সুযোগ এল সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ও ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে কাজ করার। উত্তমকুমারের ভাই তরুণকুমার তাঁকে মঞ্চে সুযোগ করে দিলেন একের পর এক প্রযোজনায়। হু-হু করে টিকিট বিক্রি হত একমাত্র শেফালির জন্যই।

মিস শেফালির আত্মকথন

শেষ জীবনে বেশ অর্থাভাবেই ভুগছিলেন শেফালি। একথা বারবার বলেছেন। কিন্তু শেফালির যে বয়স বেড়ে গেছে। তাঁর অদ্ভুত আগুনের মতো লাস্যময়তার সময় পেরিয়ে গেছে বহু যুগ আগেই। অন্ধকার জীবন থেকে আলোর জীবনে ফিরে এলেও জীবনের শেষ পর্যায়ে আবার অন্ধকারে চলে গিয়েছিলেন। এই প্রজন্মের ক’জনই বা জানে মিস শেফালির নাম! রাতের আলোর ছটায় আর কি কেউ কখনও এমন উদ্দামতা দেখাতে পারবেন? ফিরে যেতে পারবেন মাঝরাতের ওয়েস্টার্ন ব্লুজের দেশে? শেফালিরা মারা যান শারীরিকভাবে। কিন্তু কখনও হারিয়ে যান না। শহর কলকাতার প্রতিটি রাতের উদ্দামতা আর রঙিন জল বারবার ফিরে যাবে স্মৃতিচারণার দেশে। যেখানে শেফালিদের থাকবে একটা ভিন্ন দেশ, ভিন্ন রাষ্ট্র। একটা আলাদা পোশাক, চোখের চাহনি। অপলক হবে সেই দৃষ্টি। মুহূর্তে কলকাতা আবার ভিজে যাবে শেফালির শরীরের জাদুতে আর নাচের ছন্দে।
 

Developed by DXDasia