“বই ওষুধের মতো কাজ করে, সব অসুস্থতা চলে যায়” – ডঃ ইছামুদ্দিন সরকার

তাঁর বাড়ি যেন আস্ত এক লাইব্রেরি, বই পড়তে উৎসাহ দেন নতুন প্রজন্মকেও

তাঁর একটি ঘরে শুধু বই আর বই। আরেকটি ঘরে চারটে বড়ো আলমারি বোঝাই বই। ঘর থেকে ওপরে, মানে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির সর্বত্র বই। ঘরের মধ্যে বই রাখার আর জায়গা নেই। তাই বইয়েরা সব সিঁড়ির মধ্যে গাদাগাদি করে জায়গা করে নিয়েছে। এই বাড়িতে মোটামুটি এক কোটি টাকার ওপর বই রয়েছে। আর প্রতিমাসে যে টাকা তিনি পেনশন পান, তার থেকে দশ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায় বই কিনতে। তিনি মনে করেন, বইয়ের মতো বন্ধু ইহ জগতে আর কিচ্ছুটি নেই।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া শিবমন্দিরে বাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃ ইছামুদ্দিন সরকারের। তাঁর সে বাড়িটাই যেন একটা লাইব্রেরি। করোনা পর্বে এই বইয়ের নেশা যেন আরও বেড়েছে। শুধু বই সংগ্রহ, বই পড়ার নেশাই নয় – পাশাপাশি সমান গতিতে এগোয় লেখালেখিও। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অনবরত লিখছেন আর পড়ছেন। করোনা পর্বেই তাঁর চারটে বই প্রকাশিত হয়েছে। শীঘ্রই আরও সাতটা বই প্রকাশিত হতে চলেছে। চারটে বাংলায়, তিনটি ইংরেজিতে। স্বামী বিবেকানন্দের সমন্বয় ভাবনার ওপরও তাঁর আরও একটি ৪৬০ পৃষ্ঠার বই প্রকাশিত হতে চলেছে আগামী বছর। করোনা লকডাউন পর্বকে তিনি পুরোপুরি আরও বেশি করে লেখালেখি এবং পড়াশোনার ওপর কাজে লাগিয়েছেন।

১৯৭৭ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন ইছামুদ্দিনবাবু। তারপর ১৯৮৩ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডক্টরেট করেন হিস্টরিক্যাল জিওগ্রাফি অফ প্রাগজ্যোতিষ কামরুপা এনসিয়েন্ট অসম। ১৯৮৩ সালে প্রথমে কালিম্পং কলেজে অধ্যাপনা করেন। তারপর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৪ সালে ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা শুরু। ২০০০-২০০২ সালে ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। আবার ২০০৭-২০০৯ পর্যন্ত ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। শেষে ২০১৮ সালে অবসরগ্রহণ। ‘ঐতিহ্যে ও ইতিহাসে উত্তরবঙ্গ’, ‘দার্জিলিংয়ের ইতিহাস’, ‘ওম্যান ইন চেঞ্জিং সোসাইটি’, ‘হিস্টরিকাল স্টাডি অফ দ্য বাউলস এন্ড ইটস সিনক্রেটিক এটিটিউড টুয়ার্ডস মেন এন্ড সোসাইটি ইন রুরাল বেঙ্গল’ এইসব বই তাঁরই লেখা। কিছু বইয়ে কন্যা অঞ্জসি সরকারও লেখায় সহায়তা করেছেন তাঁকে। ইংল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া-সহ পৃথিবীর ৩৭টি দেশের লাইব্রেরিতে তাঁর লেখা বই ঠাঁই পেয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় তাঁর লেখা বই থেকে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনাও করেন।

ইতিহাস বিষয়ে বক্তব্য রাখতে বহুবার গিয়েছেন ঢাকা, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর-সহ অন্যান্য দেশে। তাঁর কথায়, “অনেকে টাকা দিয়ে সোনা-গয়না তৈরি করেন। আর আমি বই কিনি। কারণ আমার মতে, বই সোনার চেয়েও মূল্যবান।”

যখন করোনা পর্বে অনলাইনে সর্বত্র পড়াশোনা শুরু হয়েছে, যখন বইয়ের দিন গেলো গেলো বলে একটা হাওয়া উঠেছে, ঠিক সেই সময় এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বিশ্বাস করেন, বইয়ের কোনও বিকল্প হয় না। একইসঙ্গে তাঁর আক্ষেপ, ইতিহাস সংরক্ষণের কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে না। বহু ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসকে ধরে রাখার কাজ মন দিয়ে না করা হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেমন অন্ধকারে চলে যাবে, তেমনই আমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। ডঃ সরকার আরও বলেছেন, “বইয়ের মধ্যে আমাদের জ্ঞানকে খুঁজতে হবে। বই আমার কাছে ওষুধের মতো কাজ করে। আমি শারীরিকভাবে বয়সের কারণে কিছুটা অসুস্থ হলেও বইয়ের নেশায় আমার সব অসুস্থতা চলে যায়।”

Developed by DXDasia