ডিপ্রেশন কাটিয়ে মাত্র দেড় বছরে সফল ব্যবসায়ী, স্বপ্ন বুনছেন শিলিগুড়ির দেবাশিস কুণ্ডু

বাঁশের সামগ্রী নির্মাণ করে সাড়া ফেলেছেন উত্তরবঙ্গে

করোনা এসে অনেকের জীবনের বহু স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। অনেকেরই চাকরি চলে গিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই বহু মানুষ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। ঠিক যেমন শিলিগুড়ি এনজেপি গেটবাজারের নর্থ কলোনি নিবাসী দেবাশিস কুণ্ডু। যিনি এই করোনার দুঃসময়ে পরিবেশের জন্য উপযোগী ইকো-ফ্রেন্ডলি কিছু সামগ্রী তৈরি করে নতুন এক বার্তা দিচ্ছেন। বাঁশ দিয়ে তৈরি করছেন বোতল, ফ্লাস্ক, মগ-সহ আরও অন্যান্য সামগ্রী। আর সেই সব সামগ্রীর চাহিদা তৈরি হয়ে গিয়েছে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও।

করোনা শুরু হওয়ার আগে প্রায় দেড় বছর ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা ছিল দেবাসিসবাবুর। একা হাতে সংসার চালাতেন। কিন্তু লকডাউন শুরু হওয়ার পর তাঁর ক্যাটারিং ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে। কীভাবে সংসার চলবে! কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয় দেবাশিসবাবুর। তখনই নতুন এক ভাবনা গ্রাস করে তাঁকে, যা ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখাতে পারে। ছোটোবেলায় ফিরে যান। মনে পড়ে তখন বাঁশের কোনও কাজ হলে খুব মন দিয়ে দেখতেন। সেই আইডিয়াকেই এবার কাজে লাগালেন।

ভাবনা মাত্র সামান্য কিছু বাঁশ নিয়ে কাজ শুরু করেন দেবাশিসবাবু। প্রথমে একটা এসট্রে। তারপর ফুলদানি। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। প্রশংসা আসে প্রতিবেশী মহল থেকে। মনের জোর দৃঢ় হয়। এই মানসিকতা নিয়েই চলতে থাকে পুরো উদ্যমে কাজ। বাঁশের মগ, বাঁশের বোতল, বাঁশের কন্টেনার, ফ্লাস্ক, ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প। তিনি ভাবেন, এমন কিছু নিত্য ব্যবহার করার সামগ্রী বাঁশ দিয়ে তৈরি করতে হবে, যাতে কম খরচে মানুষ সেসব কিনতে পারেন। সকলের মধ্যে বার্তা ছড়িয়ে দিতে থাকেন, প্লাস্টিকের সামগ্রী বর্জন করতে হবে, ব্যবহার করতে হবে পরিবেশ বান্ধব কিছু সামগ্রী; যাতে পরিবেশকে প্লাস্টিকের দূষণ থেকে বাঁচানো যায়। তাঁর বার্তা বহু মানুষের মধ্যে দাগ কাটে। দু’জন কর্মচারীও তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। এই মুহূর্তে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে শুরু করে স্থানীয়ভাবেও তাঁর হাতে তৈরি পরিবেশ বান্ধব বাঁশের বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা তৈরি হয়েছে।


 দেবাশিস কুণ্ডু ‘বঙ্গদর্শন’-কে জানিয়েছেন, “উত্তরবঙ্গের সম্ভাবনাময় শিল্প হল বাঁশ। শহর এলাকা থেকে বহু তলের চাপে সবুজ বাঁশ বন হারিয়ে যেতে থাকলেও গ্রামে কিন্তু বাঁশবন রয়েছে। সেই সব বাঁশ দিয়ে দূষণ ঠেকাতে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসাবে অনেক সামগ্রী তৈরি করা যেতে পারে।”

বাঁশ দিয়ে আরও নতুন নতুন সামগ্রী দেবাশিসবাবু আগামীদিনে বাজারে নিয়ে আসতে চলেছেন। তিনি জানান, “তেরো থেকে চৌদ্দরকম প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। এর মধ্যে চার-পাঁচরকম প্রজাতির বাঁশ ব্যবহার করে আমি কাজ করছি।” বাঁশ দিয়ে তিনি তৈরি করছেন তিন রকমের বোতল। বাঁশের তৈরি সাধারণ বোতলের দাম তিনি রেখেছেন ৩৫০ টাকা যা তাঁর কথায়, পাঁচ-দশ বছর টেকসই হবে বোতলগুলি।

আবার বাঁশের মধ্যে মেটাল দিয়ে বোতল তৈরি করছেন, তাতে এক লিটার জল রাখা যায়, দাম ৬০০ টাকা। হাফ লিটারের একটি বাঁশ ফ্লাস্কের দাম তিনি রেখেছেন ৬৫০ টাকা। বাঁশের মগের দাম তাঁর কাছে ৪৫০ টাকা। প্রথমে বাঁশ সংগ্রহ, তারপর সেগুলো ঠিকমতো কেটে নিতে হয়। এরপর ঘুণপোকার সমস্যা আটকাতে বাঁশগুলোকে দু-মাস ধরে ট্রিটমেন্ট করে নিতে হয়। ট্রিটমেন্টের পর বাঁশগুলোকে ড্রাই করে হিট দিয়ে তারপর স্মোক ট্রিটমেন্ট। যাতে ভবিষ্যতে সেসব বাঁশে ফাটল না ধরে। এতগুলো পদ্ধতি অবলম্বনের পর বাঁশগুলোকে নিয়ে শুরু হয় ওইসব সামগ্রী তৈরির কাজ।

দেবাশিসবাবু বলছেন, এই শিল্পকে আরও বড়ো করতে চান। যাতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। আর তাই স্বল্প পরিসরে তাঁর পক্ষে ভালো ভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। এজন্য রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের সহযোগিতা চান তিনি। শিলিগুড়ি শিবমন্দিরের প্রয়াস ফাউন্ডেশনের তরফে পরিবেশপ্রেমী প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য দেবাশিসবাবুর এই কাজের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা বিভিন্ন এলাকায় দেবাশিসবাবুর পরিবেশবান্ধব এইসব সামগ্রীর জন্য মার্কেটিংও শুরু করেছেন। প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “প্লাস্টিকের দূষণ থেকে পৃথিবী বাঁচাতে এই ধরনের পরিবেশবান্ধব কাজের পাশে সকলকে এসে দাঁড়াতে হবে। তবেই পৃথিবী একদিন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।”

Developed by DXDasia