
যাঁদের ভালবাসতেন তাঁদেরকে অদ্ভুত সব নামে ডাকতেন স্বামীজি
স্বামী বিবেকানন্দের রসবোধ এবং প্রসন্ন মেজাজের অজস্র গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ‘স্বামী তুরীয়ানন্দ’ (হরি মহারাজ) ছিলেন তাঁর প্রিয় গুরুভাই, স্বামীজির দেহাবসানের অল্প দিন পরে তাঁর সঙ্গে হরিদ্বারে এক সাধুর দেখা হয়। সাধুটি তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন – “এত সাধুর সঙ্গে মিশেছি কিন্তু তাঁর মতো সাধু কখনও দেখিনি। হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা করে দিতেন, আর হাসির সঙ্গে এমন কথা বলতেন যে একেবারে বৈরাগ্য যেন আবার জেগে উঠত। অমন ইয়ার সাধু জীবনে কখনো আর দেখিনি।”
স্বামীজিকে কেউ সহজে রাগাতে পারতেন না। হয়ত কেউ তাঁর সামনেই তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললো, নিন্দা করল, নানারকম প্রশ্ন করতে আরম্ভ করল, স্বামীজি রাগ তো করতেনই না, উল্টে মুচকি হেসে তাঁর প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতেন, এই মন্তব্য করেছিলেন স্বয়ং স্বামী অখণ্ডানন্দ, যাঁকে স্বামীজি রসিকতা করে ‘গ্যাঞ্জেস’ বলে ডাকতেন। স্বামীজি যাঁদের ভালবাসতেন তাঁদেরকে অদ্ভুত সব নামে ডাকতেন। যেমন-
স্বামীজি সাগ্রহে পড়ি/পুঁথি শিরে রাখে ধরি/সাবাস শাঁকচুন্নি মাস্টার।/জননী সারদামণি/অক্ষয়ে ডাকাইয়া আনি/ আশীর্বাণী কহিলা তাহার।।/নবভাগবত কথা/গাহিলেন বসি যেথা/ নৈমিষারণ্য সম খনি।/রামকৃষ্ণ তীর্থমালা/বঙ্গভূমে সমুজ্জ্বলা।/ময়নাপুর তার মাঝে মণি।।
বাঁকুড়ার গ্রাম ময়নাপুর। সেখানে গেলেই দেখা মেলে এই স্মারকলিপির। কিন্তু, কে এই ‘শাঁকচুন্নি মাস্টার’? তিনি ‘শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি’ রচয়িতা অক্ষয়কুমার সেন। কিংবদন্তি লাউসেন বা মধ্যযুগের রামাই পণ্ডিত নয়, আজকের ময়নাপুর বেশি বিখ্যাত অক্ষয়কুমার সেনের জন্য। ময়নাপুর গ্রাম তাঁর জন্মভিটে। জন্মভিটের সামনেই রয়েছে এই স্মারকলিপি, যাতে অক্ষয়কুমারকে ‘শাঁকচুন্নি মাস্টার’ বলে সম্বোধন করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ। কেন এই অদ্ভুত নাম?
আসলে অক্ষয়কুমার সেনের বেঁটে, কালো, রুগ্ন শরীর, অযত্নে বর্ধিত দাঁড়িগোঁফ, মাথায় বিরাট পাগড়ি, মোটা ফ্রেমের চশমা—সব মিলিয়ে এমন একটা চেহারা যা দেখে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে এই নাম দিয়েছিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও বাণী চার খণ্ডে লিখেছিলেন অক্ষয়কুমার সেন। ১৯০১ সালে সেই চার খণ্ডকে এক করে প্রকাশিত হয় শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি। বই পড়ে স্বামী বিবেকানন্দ এক চিঠিতে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লিখলেন, ‘এই মাত্র অক্ষয়ের বই পড়লাম। আমার তরফে তাকে হাজার হাজার আলিঙ্গন দিও। তার কলমের মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেকেই প্রকাশ করেছেন। অক্ষয় তুমি ধন্য! এই বই পড়ে আমার যে কী আনন্দ হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। প্রিয় অক্ষয়, আমার ভাই, প্রিয় ভাই, তোমাকে আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে আশীর্বাদ করি।’
তথ্যসূত্রঃ
মেঘ ও রোদের খেলায় স্বামীজি, রানা চক্রবর্তী
বর্তমান পত্রিকা
