
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২৭
আমার কেবিনটা জাহাজের এক্কেবারে সামনের দিকে আর এক্কেবারে ডানদিকে। আমার বাঁ পাশের কেবিনে থাকে পোলিশ প্রিন্স আর ডানদিকে কেবল এক চিলতে বারান্দা আর তারপরেই মহাসমুদ্র। অনেক সময় আমি আমার স্টাডি টেবিলের লাগোয়া চেয়ারটা টেনে নিয়ে সেই ছোট্ট বারান্দায় বসি। কলকাতায় যেমন মানুষ বারান্দায় বসে নিচে গাড়ি-ঘোড়া, রিক্সা, অটো, বাস, পথ চলতি মানুষ ইত্যাদি দেখতে পায়… আমি আমার বারান্দায় বসে দেখি কেবল জল, ঢেউ, আকাশ, সোনার রেকাবিতে সাজানো সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত। আজ সকালে সেই এক চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল… একঝাঁক গাংচিলের মতো দেখতে পাখি আমাদের জাহাজের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম এদের নাম বুবি, আর এরা মাছ খেয়ে জীবনধারণ করে থাকে।
বুবি পাখি
একটা ঝকঝকে রোদ ভরা দিন উপহার পেলাম… যেদিকে দুচোখ যায় কেবল ঘন নীল আর তার ভেতরে উড়ছে সাদায় কালোয় সাজানো কয়েকটা পাখি। বুঝলাম আমরা নিশ্চয়ই এখন স্থলের কাছাকাছি আছি। দূরে ঠাহর করে দেখলাম জলের ওপরে… দিকচক্রবালের গা ছুঁয়ে কোনো দ্বীপের উপরে মাথা উঁচু করে থাকা উদ্ধত পাহাড়ের চূড়ো। বুঝলাম যে পাখিগুলি নিশ্চয়ই ওই পাহাড়ি দ্বীপ থেকে উড়ে এসেছে জাহাজের কাছাকাছি কিছু খাবারের সন্ধানে। জাহাজের চলনে ব্যতিব্যস্ত উড়ুক্কু মাছেদের খুব ক্ষিপ্র গতিতে টরপেডোর মতো জলে ডুব দিয়ে ধরছিল পাখিগুলি।
Mona Passage
মেরিন ট্রান্সপোর্টেশন দপ্তরের অধ্যাপক Patric Modic-কে জিজ্ঞেস করে জানলাম যে আমরা এখন Mona Passage দিয়ে চলেছি। Puerto Rico আর Hispanioalar মাঝখানে ৭৮ মাইল চওড়া এই জলপথ Panama Canal অভিমুখী জাহাজগুলি প্রায়শই ব্যবহার করে থাকে। স্থলভূমি ও সেখানকার বার্তাবাহী পাখি দেখে ব্যক্তিগত বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছিলাম।
কেপ কডে ভয়ংকর শীতে বরফের ভেতরে খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে এই ড্রিল অভ্যাস করতে প্রাণ বেরিয়ে যেত। আজকে Mona Passage-এর উষ্ণ নীল জল, সুদূর পাহাড়ি দ্বীপ, মাথার ওপরে ঘূর্ণায়মান পাখির ঝাঁক দেখতে দেখতে ফায়ার অ্যান্ড বোট ড্রিল করতে গিয়ে মনে হল পুরী বেড়াতে এসেছি বুঝি।
আজকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ফায়ার অ্যান্ড বোট ড্রিল। আমি লাইফ বোট #1-এর Mustering Officer. জাহাজ কোন দূর্বিপাকে পড়লে আমার দায়িত্ব হল লিস্ট মিলিয়ে নাম দেখে আমার বোটের সব যাত্রীকে বোটে তোলা। যদি কেউ আহত বা মৃত হয় তাহলে সেটা ক্যাপ্টেনকে জানানো ইত্যাদি। কেপ কডে ভয়ংকর শীতে বরফের ভেতরে খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে এই ড্রিল অভ্যাস করতে প্রাণ বেরিয়ে যেত। আজকে Mona Passager-এর উষ্ণ নীল জল, সুদূর পাহাড়ি দ্বীপ, মাথার ওপরে ঘূর্ণায়মান পাখির ঝাঁক দেখতে দেখতে ফায়ার অ্যান্ড বোট ড্রিল করতে গিয়ে মনে হল পুরী বেড়াতে এসেছি বুঝি।
আরও পড়ুন: ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : তামা তুলসী
এক্ষুণি জাহাজের লাউড স্পিকারে প্রতি সন্ধের মতো ঘোষিত হল “নাউ হিয়ার দিস, দ্যা টাইম ইজ সানসেট সিকিউর অল লাইটস ফরওয়ার্ড অফ দ্যা ভেসেল”। সন্ধে ঘনালে জাহাজের নিয়ম অনুযায়ী কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটা আলো জ্বলবে, যা বাইরে থেকে দেখা যায়। এর ফলে অন্যান্য জাহাজ আমাদের অবস্থান সম্বন্ধে একটা সঠিক ধারণা করতে পারে। তাই নিয়ম অনুযায়ী অন্ধকার হলে জাহাজের সামনের দিকে সব আলো নিভিয়ে ফেলতে হয়। যেহেতু আমার কেবিন একেবারে সামনের দিকে, তাই ঘোষণা শোনা মাত্র আমাকে পোর্ট হোলের জানালার পর্দা টেনে দিতে হয় যাতে কেবিনের আলো বাইরে কারো চোখে না পড়ে।
এই সময় আমি রোজ গিয়ে দাঁড়াই আমার ব্যক্তিগত এক চিলতে বারান্দায়। প্রতিদিনের সূর্যাস্তই অভিনব… মনে হয় এমনটি তো আগে দেখিনি। আজ কিছুটা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আড়ালে ছিলেন সূর্যদেব। মেঘগুলোকে কিশোরীর মত লজ্জায় রাঙিয়ে ধীরে ধীরে Mona Passage-এর গভীর জলে ডুব দিলেন তিনি আর তার স্পর্শে রক্তের মত রাঙা হয়ে রইলো জল। এক আশ্চর্য কমলা আভা ছড়িয়ে রইল পশ্চিমদিকের আকাশে আর আমি… আর একবার… মুগ্ধ হলাম… প্রতিদিনের মতো মুগ্ধ হলাম… আবহমান কাল ধরে মুগ্ধ হলাম…
ব্যক্তিগত এক চিলতে বারান্দা
‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, রক্তে জল চলাচল করে
নৌকোর গোলুই ভেঙে উঠে আসে কৃষ্ণা প্রতিপদ
জলজ গুল্মের ভারে ভরে আছে সমস্ত শরীর
আমার অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই কোনোখানে…’
___________________
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে।
আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
