ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : নিশ্চিন্দিপুরের মুখোশ

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২৪

গত পর্বের পর

জাহাজ চলছে মিসিসিপি নদী বেয়ে উত্তর পানে। আটলান্টিকের ঘন নীল রঙে সয়ে যাওয়া চোখে এখন ঘোলাটে বাদামী রঙের ঢেউ। জাহাজের চারপাশে উড়ছে গাংচিল। অদূরে তীর ঘেঁষে কয়লার বার্জ যায় কলকারখানার উদ্দ্যেশে। আমরা চলেছি নিউ অর্লিনস-এর অভিমুখে। এই শহরের নামকরণ হয়েছিল ফ্রান্সের লোয়ার নদীর তীরে অবস্থিত অর্লিনস শহরকে মাথায় রেখে। ১৭১৮ সালে ফ্রেঞ্চ মিসিসিপি কোম্পানি এই শহরের পত্তন করে। ফিলিপাইড অর্লিনস, ডিউক অফ অর্লিনস ছিলেন ফ্রান্সের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রিজেন্ট। তাঁর সম্মানেই এই নামকরণ। অনেকে একে ‘The Crescent City’ বলে জানে কারণ মিসিসিপি নদী যেন বাঁকা চাঁদের মতো এই শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে। কেউ ডাকে ‘The Big Easy’ বলে। কারণ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে গাইয়ে-বাজিয়েরা এই শহরে খুব সহজেই কাজের সন্ধান পেত। অনেকে বলে নিষিদ্ধ জমানায় এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেশাভাং করার সামগ্রী পাওয়া যেত। তাই নাকি এমনধারা নামকরণ। কারো মতে আমেরিকার অন্যান্য শহরের তুলনায় এই শহরে জিনিসপত্রের দাম কম। জীবনধারণ সহজতর। তাই এমনটি ডাকা হয়। আবার অনেকে নিউ অর্লিনসকে বলে ‘The City that Care Forgot’। কারণ এই শহরের বাসিন্দারা নাকি বেশ খোশমেজাজে গানবাজনা করে। দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করে। যেন তাদের কোনো কিছুতেই কোনো চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, গ্লানি নেই, দুর্ভোগ নেই। আমাদের জাহাজের এবারের গন্তব্যস্থল হল সেই নিশ্চিন্দিপুর।

জাহাজ নোঙর ফেললো শনিবার বিকেল নাগাদ। তারপরে মাঝিমাল্লারা দড়ি বেঁধে গ্যাংওয়ে নামাতে নামাতে প্রায় সন্ধে। চাপা কানাঘুষে জানতে পেরেছি আর কয়েক ঘণ্টা পরেই Mardi Gras উপলক্ষ্যে একটা মিছিল বেরোবে। যদিও আসল বড়ো মিছিলের এখনো হপ্তা দুয়েক বাকি আছে তবু নিশ্চিন্দিপুরে নাকি এখন থেকেই উৎসবের তোড়জোড়। বাইরে যদিও বস্টনের তুলনায় ঠান্ডা অনেক কম তবু রাত বিরেতে মিছিল দেখতে যাবো। সাবধানের মার নেই। গত কদিন গলা ব্যথা আর কাশি বেশ জ্বালিয়েছে। এইসব সাত পাঁচ ভেবে পরনে একটা জাম্বুবান মার্কা সাদা আর ভুষো রঙের সোয়েটার চাপিয়েছি। আমাকে দেখে বোঝবার জো নেই আমি Mardi Gras দেখতে যাচ্ছি নাকি কৈলাস পর্বত!

এই শহরের বাসিন্দারা নাকি বেশ খোশমেজাজে গানবাজনা করে। দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করে। যেন তাদের কোনো কিছুতেই কোনো চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, গ্লানি নেই, দুর্ভোগ নেই।

জাহাজ থেকে নেমে পথে বেরিয়ে দেখি রাস্তায় লোকজন উপচে পড়ছে। মিছিল বেরোনোর অনেক আগেই রাস্তার ধারে সার দিয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ। চারদিকে ভাজাভুজির গন্ধ, বাজনার আওয়াজ, হাসি গল্পের রেশ। মনে হল নির্বান্ধব, নিঃসীম অকূল সমুদ্রের থেকে এক লাফে রথের মেলায় পৌঁছে গেছি। আমি আর আমার তিনজন সহকর্মী ভিড় ঠেলে ফুটপাথে নিজেদের জন্য খানিকটা জায়গা করে বসে পড়লাম। কথায় কথায় জানলাম যে, আসল Mardi Gras মিছিল বেরোবে ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে। কিন্তু জানুয়ারির গোড়া থেকে শহরে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। আজকে যে মিছিল বেরোবে তার নাম Krewe du Vieux। এটা নাকি একটু আদিরসাত্মক পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট মিছিল যাতে ছানাপোনা নিয়ে আসা নিষেধ। রাস্তায় যে সব মানুষেরা ভিড় করেছিল তাদের প্রায় প্রত্যেকের হাতেই মদের গেলাস, মুখে রকমারি রঙচঙে মুখোশ। যাকে বলে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। এই শহরে প্রথম Mardi Gras মিছিল বেরিয়েছিল ১৮৫৭ সালে। সেই ঐতিহ্য এখনও চলছে। এই উৎসবের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঘিরে রয়েছে তিনটি রং। ন্যায়ের প্রতীক বেগুনি রং, বিশ্বাসের প্রতীক সবুজ, আর শক্তির প্রতীক সোনালি রং। পথ চলতি মানুষের পোশাকে, মুখোশে, বাড়িগুলির গৃহসজ্জায় এই তিনটি রং বারবার চোখে পড়ছিল।

একটু পরে জগঝম্প বাজনার সঙ্গে মিছিল শুরু হলো। একের পর এক প্রাপ্তবয়স্ক বিষয় ব্যাঙ্গাত্মক ফ্লোট, সঙ্গে চলছে বাজনদারেরা আর কুম্ভ মেলার সাধু সন্ন্যাসীদের মত কৌপিন পরিহিত মুখোশ পরা মানুষের দল। মাথায় মস্ত মস্ত পালকের মুকুট, গলায় রংচঙে পুতির মালা। বাজনার সঙ্গে নাচতে নাচতে মহানন্দে পথ বেয়ে চলছে নিশ্চিন্দিপুরের মিছিলের মুখ। এহেন পরিবেশে আমার কৈলাস পর্বত মার্কা, সাদাভুশো গলাবন্ধ সোয়েটার যে একেবারেই বেমানান ছিল তা বলাই বাহুল্য। তবু মিছিলের কৌপিনধারী সন্ন্যাসীরা দয়াপ্রবণ হয়ে আমার গলায় কয়েকটা রঙচঙে পুতির মালা পরিয়ে দেওয়ায় কিছুটা রক্ষে। নিশ্চিন্দিপুরের বাজনদারেরা যেন জাদু জানে। জ্যাজ, রিদিম অ্যান্ড ব্লুজ, ব্রাস ব্যান্ডের মৌতাতে বুঁদ হয়ে রয়েছে মানুষগুলো। তবে মিছিলের বিষয়বস্তু উপস্থাপনায়, কথায় কথায়, গানে বাজনায়, যৌনতার আতিশয্যে সহকর্মীদের সামনে ভেতর ভেতর Mardi Gras-এর রং মিলিয়ে ন্যায়ের প্রতীক বেগুনি মার্কা হলেও বাইরে ভাবলেশহীন মুখ করে ছিলাম। যেন সত্যনারায়ণের পাঁচালি শুনছি।

এই শহরে প্রথম Mardi Gras মিছিল বেরিয়েছিল ১৮৫৭ সালে। সেই ঐতিহ্য এখনও চলছে। এই উৎসবের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঘিরে রয়েছে তিনটি রং। ন্যায়ের প্রতীক বেগুনি রং, বিশ্বাসের প্রতীক সবুজ, আর শক্তির প্রতীক সোনালি রং। পথ চলতি মানুষের পোশাকে, মুখোশে, বাড়িগুলির গৃহসজ্জায় এই তিনটি রং বারবার চোখে পড়ছিল।

ফুটপাথে বসে মুখোশধারী হাসিখুশি মানুষগুলিকে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম কয়েক বছর আগের কথা। ২০০৫ সাল। ঘূর্ণিঝড় ক্যাটরিনার প্রকোপে ভেঙে গেছে বাঁধগুলি। মিসিসিপি নদীর জল তীর ভেঙে ভাসিয়ে দিয়েছে নিউ অর্লিনস শহর। বন্যায় মৃত্যু হয়েছে ১৮৩৬ জন মানুষের। ক্ষয়ক্ষতির পরিণাম আকাশ ছোঁয়া। সকলে ভেবেছিল ২০০৬ সালে বুঝি Mardi Gras বন্ধ হয়ে যাবে। সেই বছর ছিল মিছিলের ১৫০তম বর্ষপূর্তি উৎসব। তখনও চলছে উদ্ধার কাজ। তখনও পথে পথে মিসিসিপি নদীর দগদগে ক্ষতচিহ্ন। বহু বাড়িঘর মাটিতে মিশে গেছে। তবুও সে বছর হার মানেনি নিশ্চিন্দিপুরের মানুষ। ব্রাস ব্যান্ডের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে পথে নেমেছিল নিশ্চিন্দিপুরের বাসিন্দারা। চোখের জল মুছে, ভেতরের ক্ষতগুলো আড়াল করে, খুশির মুখোশ পরেছিল তারা এক রাত্তিরের জন্য। মুখোশের রংগুলিও চেনা। ন্যায়ের প্রতীক বেগুনি, বিশ্বাসের প্রতীক সবুজ, আর শক্তির প্রতীক সোনালি।

 

“দূরকে আমি ছুঁয়ে আছি অকূল জলের
কানায় কানায়
বিরাম-হীন তরল তান চিরকালের
মন্ত্র শোনায়
……
দেখছি এক সাগর তাতে ইন্দ্র-ধনু
দহন-হীন আগুন দিয়ে সাজায় তনু
জেনেছি তার আলোয় ভরা শান্তি কোথায়
রইলো জমা;
আবার আমায় ডুবতে হবে তোমার গাঙে
প্রিয়তমা”

চলবে…

________________

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia