ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : দেওয়াল-ঘড়ি

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২০

গত পর্বের পর

লম্বিয়া নামটা শুনলেই যে দুটো ছবি পষ্টাপষ্টি চোখের সামনে দেখতে পাই তা হলো বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় জলপ্রপাতের মতো উচ্ছ্বসিত এক মেয়ে অথবা কুখ্যাত মাদক চোরাচালানকারী, যার একহাতে পিস্তল আর অন্য হাতে জলপ্রপাতের মতো উচ্ছসিত এক মেয়ে। আমাদের জাহাজ টি.এস. কেনেডি এবার কলম্বিয়া যাবে শোনা ইস্তক মাথার ভেতরে এই দুটো ছবি রোজ প্রাতঃভ্রমণে যেত। বন্দরের নাম কারটাজেনা, কিন্তু স্প্যানিশ কায়দায় উচ্চারণ হলো কার্তাহেনা। তা সেই কার্তাহেনা যাওয়ার প্রাক্কালে জাহাজের কর্তাদের নানান সাবধানবাণী শুনতে শুনতে আমরা একেবারে জেরবার। সেখানে একা একা বাসে চেপে ঘুরে বেড়ালে আমার কী কী রকম বিপদ ঘটতে পারে সেই আলোচনায় খাবার টেবিলে কান পাতার জো নেই। বন্দরে পৌঁছবার আগের রাতে জাহাজের ডেকে বিশাল ছাত্র-শিক্ষক সমাবেশ। সেখানে কাপ্তেন বুশি ও অন্যান্য গন্য মান্যেরা আমাদের পাখিপড়া করে বলে দিলেন—

— ‘কিছুতেই একা একা ঘুরে বেড়াবে না।’
— ‘সর্বদা যুথবদ্ধ হয়ে বিচরণ করবে।’
— ‘অচেনা কারো সঙ্গে কথা কইবে না।’
— ‘জাহাজ থেকে পুরোনো শহর কার্তাহেনায় যাবার বাস ব্যবস্থা থাকবে। সেখানে দেওয়াল-ঘড়ির সামনে জাহাজের বাস স্টপ। সেই দেওয়াল-ঘড়ির সামনে থেকেই আবার একই বাসে চেপে জাহাজে ফিরবে। একা অন্য বাস বা অন্য ট্যাক্সিতে চাপবে না।’
— ‘কার্তাহেনায় দেওয়াল ঘেরা পুরোনো শহরের ভেতরেই থাকবে। খবরদার দেওয়ালের সীমানা পেরিয়ে বাইরে বেরোবে না।’
— ‘মদ খেয়ে বিলকুল বেসামাল হবে না।’
— ‘কেউ যদি মাদক বেচতে আসে তাদের সাথে কথা কইবে না বা কিনবার আগ্রহ দেখাবে না। অনেক সময় কলম্বিয়ার পুলিশ ছদ্মবেশে ঘোরাঘুরি করে। মনে রাখবে, কলম্বিয়ায় যে একবার জেলের অন্দরমহল দেখে সে আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরে না।’
— ‘অন্যান্য নারীঘটিত প্রলোভনে সাড়া দেবে না। যদি অপারগ হয়ে সাড়া দিয়ে ফেল তাহলে জন্ম নিরোধক ব্যবহার করতে ভুলবে না।’

এইসব রক্ত হিম করা কথা শুনে তো ছাত্রছাত্রীদের মুখ চুন। আমার মনশ্চক্ষে তখন কুখ্যাত মাদক চোরাচালানকারীর একহাতে পিস্তল আর অন্য হাতে ভোজালি আর পেটের ভেতর গুড়গুড় আওআজ!

পরদিন সকালে কার্তাহেনার সাথে প্রথম চোখাচোখি। নীল জল ঠেলে জাহাজ চলেছে বন্দর অভিমুখে। নীল যেখানে সবুজে গিয়ে ঠেকেছে ঠিক সেইখানে সাদা ধবধবে অনেকগুলি আকাশছোঁয়া বাড়ির ছাদে তুলোর মতো মেঘ।

১৫৩৩ সালে মাত্র ২০০ মানুষ নিয়ে এই শহরের পত্তন করেছিলেন স্প্যানিশ কমান্ডার পেদ্রো দে হেরেদিয়া। স্পেনের প্রিয় শহর কার্তাহেনার নামে এই শহরের নামকরণ করেন হেরেদিয়া৷ সোনার খনির দেশ কলম্বিয়া৷ হেরেদিয়া এসেছিলেন জাহাজে সোনা বোঝাই করে নিয়ে যেতে। সেই সোনার হদিশ পেয়ে বহু শতাব্দী জুড়ে রক্তারক্তি করেছে ঔপনিবেশিকের দল। ১৫৮৬-এ স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক মারকাটারি  যুদ্ধ করে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন কার্তাহেনা শহর। কড়ায় গন্ডায় ১০৭,০০০ পেসো আদায় করে তবে রেহাই দিয়েছিলেন ড্রেক সাহেব৷ এর পর টনক নড়ে স্পেনের রাজামশাইয়ের শুরু হয় শহর ঘিরে বিশাল এক দেওয়াল তৈরির কাজ। এমন শক্তপোক্ত দেওয়াল যা কামান দাগলেও এতটুকু টসকাবে না৷ ২০০ বছর ধরে ক্রীতদাসের পরিশ্রমে তৈরি হলো ১১ কিমি লম্বা দেওয়াল আর কাস্তিলো সান ফেলিপে দুর্গ। এখন ইউনেস্কোর কল্যাণে এটি একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ১৮২১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্পেনকে পরাজিত করেন সিমন বলিভার। যুদ্ধ ছাড়াও এ শহরে বহুবার মৃত্যু এনেছে সিফিলিস, কলেরা আর মাদক। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের অনেকগুলি লেখার পটভূমি এই শহর কার্তাহেনা… যা কখনো স্বর্গের মতো সুন্দর আবার কখনো নরকের মতো পৈশাচিক।

জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম এক আকাশচুম্বী অট্টালিকার দেয়াল। এ এক নতুন শহর। ইতিহাসকে বহু পেছনে ফেলে এক অত্যাধুনিক সম্পন্নতার প্রাচীর। পাশের ডকে মস্ত মস্ত ক্রেন খাটিয়ে চলছে জাহাজে মাল ওঠানোর কর্মযজ্ঞ। লোক লস্কর মাঝি মাল্লার ভিড়। সেই কর্মকাণ্ডের ওপর নিরাসক্ত নজরদারি করছে জেটিতে বসে থাকা একদল পেলিক্যান্।

ঠিক সময়ে আমাদের নির্ধারিত বাস এসে দাঁড়ালো বন্দরের গেটে। চোখে রোদ চশমা, কাঁধে ঝোলা… কোনো বাক্যব্যয় না করে আমি বাসের সামনের সিটে। বন্দর পেরিয়ে বড়ো রাস্তা, সেখানে অনেক মানুষ, পথে অনেক গাড়ি, রংচঙে বাসে ঠাসা ভিড়, খাবার দোকান, ওষুধের দোকান… এমনি সব শহুরে দৃশ্য পেরিয়ে বাস থামল দেওয়াল ঘেরা পুরোনো শহরের দেওয়াল-ঘড়ির সামনে৷ এইখান থেকেই প্রতি ঘণ্টায় ফিরতি বাস পাওয়া যাবে এইমতো কথা রইলো।

জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম এক আকাশচুম্বী অট্টালিকার দেয়াল। এ এক নতুন শহর। ইতিহাসকে বহু পেছনে ফেলে এক অত্যাধুনিক সম্পন্নতার প্রাচীর। পাশের ডকে মস্ত মস্ত ক্রেন খাটিয়ে চলছে জাহাজে মাল ওঠানোর কর্মযজ্ঞ।

হলুদ রঙের মস্ত উঁচু দেওয়াল… ১১ কিমি ব্যাপী এক নিশ্ছিদ্র বর্ম৷ দেওয়াল-ঘড়ির তলায় এক তোরণ আর দেওয়ালের পেছনে ১৮০০ শতাব্দী। চকমেলানো অট্টালিকা, ঝুলবারান্দায় লতানে ফুলগাছ, পাথুরে রাস্তায় ঘোড়ার খুড়ের শব্দ। মনে হচ্ছিল পরের মোড় পেরলেই ঝট করে সিমন বলিভারের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। কিছুই বলা যায় না!

ঝুল বারান্দার তলায় নানারকম পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানীরা। সাদা সোলার টুপি তাতে কালো ফিতে দেওয়া…পরলেই মনে হবে একটা সিগার ধরানো যাক…. লেসের ঝালর দেওয়া স্কার্ট… পরেছ কি সালসা নাচ শুরু… সুগন্ধি কলম্বিয়ান কফি… এক চুমুক দিলেই মনে হবে বাকি জীবনটা রবিবার…. এই সব নানান জিনিস দু-চোখ ভরে দেখতে দেখতে এসে পৌঁছলাম এক গির্জার সামনে৷ সান পেদ্রো ক্লেভারের গির্জা। গির্জার সামনে এক বিশাল চত্বর। সেখানে নানা বয়েসের মানুষের ভিড়। অনেকগুলি চেয়ার পাতা। শ্রান্ত মানুষেরা সেখানে বসে একটু জিরিয়ে নিতে পারে। খুব রংচঙে পোশাক পরা মহিলারা ফল বিক্রি করছেন… তরমুজ, আনারস, আম টুকরো করে কাটা। অনেক পায়রা চারপাশে। ছোটো ছেলেমেয়েরা মহাখুশি হয়ে তাদের দানা খাওয়াচ্ছে। পায়রার পাখার শব্দ, বাচ্চাদের হট্টগোল, ফেরিওয়ালার ডাক… এই সব আওয়াজগুলি অনেকদিন মহাসমুদ্রে ভেসে থাকা একটা মানুষের কাছে আসছিল ঠিক ঢেউয়ের মতন। দুপুরের রোদে, সান পেদ্রো ক্লেভারের গির্জার সামনে একটা চেয়ারে বসে আমি সমুদ্রস্নান সারলাম।

গির্জার দরজাটি কাঠের… তাতে কী সুন্দর খোদাইয়ের কাজ… দরজা পেরিয়ে মখমলের লাল কার্পেট পাতা। যেন কেউ অভ্যর্থনা করে বলছে… এস ভেতরে এস… গুটি গুটি পায়ে সেই লাল কার্পেটের পথ ধরে গির্জার ভেতর গিয়ে বসলাম। একটা বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সাদা লেসের গাউন পড়া বউ… তার পাশে মেঘলা রঙের সুট পরে তার বর। বিশাল ফুলদানিতে সাদা ফুল সাজানো… অর্গ্যান বাজছে আর স্প্যানিশ ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ করছেন পাদ্রী মশাই। কাউকে চিনি না শুনি না তবু সেখানে বসে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতে খুব ভালো লাগছিল। অচেনা মানুষের মাঝখানেও কেমন যেন মনে হচ্ছিল আমি একটা পরিবারভুক্ত। বিয়ে শেষ হলো… খুব খানিক চুমু খেয়ে মেঘলা সুট আর সাদা লেস চলে গেল তাদের ভবিষ্যতের দিকে… আমি আবার বাইরের চত্তরে এসে দাঁড়ালাম।

তিনটি মেয়ের সাথে দেখা হলো সেখানে। তারা আমার পাশ দিয়ে হাসতে হাসতে গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছিল। কুড়ির কোঠায় বয়েস ওদের। লজ্জার মাথা খেয়ে বললাম…

‘আমি ভিনদেশী (এটা না বললেও চলত)। এই গির্জার সামনে আমার একটা ছবি তুলে দেবে?’
একগাল হেসে ‘নিশ্চই দেব!’
ছবি তোলা হলো। ক্যামেরা ফেরত দেবার আগে একজন বলল, ‘আমরা তোমার সাথে ছবি তুলতে পারি?’
একগাল হেসে ‘নিশ্চই পারো!’

ছবি তুলে, ক্যামেরা ফেরত দিয়ে বিদায় জানিয়ে মেয়ে তিনটি চলে গেল… আমি চত্তরের মাঝখানে একটা চেয়ারে বসে ছিলাম৷ একটু পরে ওদের মধ্যে দুটি মেয়ে ফিরে এলো। একজনের কিছু বক্তব্য আছে তবে সে শুধু স্প্যানিশ ভাষা জানে। তার সঙ্গের অন্য মেয়েটি ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলে। সে এসেছে অনুবাদকের ভূমিকা পালন করতে৷ কথোপকথন এগোলো দোভাষীর সাহায্যে…

— ‘তোমাকে কিছু বলার ছিল’
— ‘নিশ্চই! বলো…’
— ‘তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? যিশু খ্রিষ্টের নাম জানো?’
— ‘বিশ্বাস করি। নাম শুনেছি। আমি ভারতবর্ষ থেকে এসেছি। সেখানে অনেক মানুষ খ্রীষ্টান।’
— ‘ভারতবর্ষ? কোন শহর?’
— ‘আমার শহরের নাম কলকাতা। সেখানে মাদার টেরেসা থাকতেন।’
— ‘ওহ! তুমি তাঁর শহর থেকে এসেছ? জানো আমরা মানুষকে যিশু খ্রিষ্টের কথা শোনাই। আমরা ধর্মযাজিকা।’

অল্পবয়েসী জিন্স টি-শার্ট পরা মেয়ে দুটির মুখে এই কথা শুনে বেশ অবাক হলাম। একটু পরে মনের ভেতরে এক টুকরো কালো মেঘের মতো একটা চিন্তা এলো… ভাবলাম এখন বোধহয় ওরা আমার কাছে কোনোরকম আর্থিক সাহায্য চাইবে অথবা ধর্ম পরিবর্তন করতে বলবে…

তারা বলল, ‘তোমাকে একটা কথা বলতে এলাম। কোনদিন নিজেকে একা মনে কোরো না। কোনোদিন ভেবো না যে তোমার কেউ নেই। উনি সবসময় তোমার সঙ্গে থাকেন… তোমার সঙ্গে পথ চলেন… তোমাকে ভালবাসেন… তোমাকে আগলে রাখেন৷ এ কথা কোনো দিন ভুলোনা… আজ আমরা আসি… তুমি খুব ভালো থেক…’

এই বলে আমার সন্তানের বয়েসী মেয়ে দুটি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল… আর আমার চোখের সামনে মানুষজন, গির্জার কাঠের দরজা, লাল কার্পেট সব… সব ঝাপসা হয়ে এলো…

ক্যাপ্টেনের কথামতো যথাসময়ে সেই নির্দিষ্ট দেওয়াল-ঘড়ির সামনে থেকে সুরক্ষিত বাসে চেপে জাহাজে ফিরলাম৷ কার্তাহেনা শহরে রাত নেমেছে তার নিজস্ব চেহারা নিয়ে… সাগরের তীর ঘেষে বাস চলেছে বন্দরের দিকে… পথের পাশে নানারকম দোকান পসার… ছাপোষা মানুষেরা বাজার করে ঘরে ফিরছে… একবারও মনে হল না এখানে দেয়ালের প্রয়োজন আছে… ঘড়ি ধরে ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করবার প্রয়োজন আছে… দেওয়াল-ঘড়ির সামনে থেকে সুনির্দিষ্ট বাস ধরবার প্রয়োজন আছে। বাসের জানালা দিয়ে চেয়ে কোথাও সেই কুখ্যাত মাদক চোরাচালানকারীকে দেখতে পেলাম না, যার একহাতে পিস্তল আর অন্য হাতে ভোজালি… যাকে দেখতে পেলাম তার কুড়ির কোঠায় বয়েস… মুখে একগাল হাসি… হাতে ক্যামেরা আর জলের বোতল… একজন দোভাষীর সাহায্যে সে আমাকে ভালোবাসার কথা বলে গেল…

চলবে…

___________________

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia