ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : নীরার মুখ

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২৬

গত পর্বের পর

সান জুয়ানের চারিপাশে জলের অগভীর এলাকায় অনেকগুলি কোরাল রিফ আছে। জলের তলায় ডুব দিয়ে প্রবালের ভেতর প্রচুর বাহারি মাছ আর অন্যান্য জলজ প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়। Wayne McGee-এর দৌলতে একটা Catamaran ride and snorkeling ট্রিপে যাওয়ার সৌভাগ্য হল সান জুয়ান বন্দরে। Snorkeling করতে গেলে চোখে ওয়াটার-প্রুফ চশমা পরে আর মুখে নিঃশ্বাস নেওয়ার নল লাগিয়ে জলে ডুব দিতে হয়। এক ডুবেই পৌঁছে যাওয়া যায় জলের তলায় সেই আশ্চর্য সুন্দর প্রবাল দ্বীপে, যেখানে প্রবালের ফাঁকে ঘরকন্যা করে রং-বেরঙের মাছের দল। সাঁতারে কাঁচা বলে আর সাঁতারের পোশাকে ছাত্রদের সামনে যেতে সংকোচ বোধ করি বলে snorkeling না করলেও, প্রবল উৎসাহে সকলের সাথে বাসে চেপে আমিও পৌঁছে  গেছিলাম সান জুয়ানের পূর্বে অবস্থিত ফাজার্ড শহরে। সেখানে সমুদ্রের লাগোয়া মেরিনাতে ক্যাপ্টেন অরল্যান্ডো। আর টারটাক আমাদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেলেন ওঁর Catamaran-এ, যার নাম ‘স্প্রেড ঈগল-২’। ক্যাপ্টেনের পরনে ঘন নীল গেঞ্জি, সাদা হাফ প্যান্ট আর মাথায় সাদা টুপি। দুটো ডিঙি নৌকার মাঝখানে একটা পাটাতন বেঁধে দিয়ে, পাল আটকিয়ে সবকিছু সাদা রং করে দিলে যেমন দেখতে হবে, catamaran অনেকটা সেরকম দেখতে। পাটাতনের ওপরে বসবার সুবন্দোবস্ত আছে। ক্যাপ্টেন টারটাকের সহকারি একজন ভদ্রমহিলা একটা পিতলের ঘণ্টা বাজিয়ে আমাদের সব নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দিলেন। আমরা যেন catamaran-এর চালে উঠে না বসি, catamaran-এর ভেতরে গা গুলোলে যেন বমি না করি (বললেন যে, জলে বমি করতে পারো, ফিড দ্য ফিস, উই হ্যাভ নো প্রবলেম উইথ দ্যাট!), catamaran থেকে যেন হঠাৎ জলে ঝাঁপ না দিই ইত্যাদি। এইসব গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলী শুনে আমরা সকলে ভব্যিযুক্ত হয়ে যে যার আসনে বসলে, catamaran পাড়ি দিল খোলা সমুদ্রের দিকে।

বড়ো জাহাজে করে সমুদ্রে ভাসা আর খোলামকুচির মতো পালতোলা catamaran-এ চেপে আটলান্টিকের গভীর নীল ঢেউয়ের উথাল-পাতাল হজম করা যে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস তা একটুক্ষণের ভেতরেই মালুম হলো। এর মধ্যে জানা গেল যে এই ভ্রমণের টিকিটের দামে ধরা আছে পেটচুক্তি খানাপিনা। সহকারি ভদ্রমহিলা catamarane এর ছোটো কাঠের বারে কাগজের গ্লাসে ঢেলে দিচ্ছিলেন রাম মেশানো আনারস আর তরমুজের রস। সাথে পরিবেশন করছিলেন মুচমুচে কাঁচকলা ভাজা। পুয়ের্তোরিকানরা সব খাবারেই প্রায় কাঁচকলা ব্যবহার করে। ওদের ডালে থাকে কাঁচকলার বড়া। সবচেয়ে প্রিয় খাবার হল mofongo বা সেদ্ধ কাঁচকলা। Mofongo-তে থাকে নানারকম মশলা আর দারুণ সুস্বাদু একটা সস। এর ভেতরে মাংস বা মাছের টুকরো দিয়েও লোককে খেতে দেখেছি। আমরা যেমন আলুসিদ্ধ বা ভাত খাই, এখনকার মানুষ দেখেছি নানা কায়দায় mofongo খায়। এছাড়া ছিল নানারকম স্যান্ডউইচ, চিজ, স্যালাড, টাটকা ফল ইত্যাদি। পেটচুক্তি খাওয়া আর পানীয়ের ব্যবস্থা দেখে আমার সহযাত্রীরা কিছুক্ষণের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে স্যান্ডউইচ আর ফলের রস খেয়ে বেশ খোশমেজাজে রোদ পোয়াতে লাগলো catamaran-এর পাটাতনে। সমুদ্রের হাওয়া আমাদের পালে বাতাস দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেল একটা ছোটো দ্বীপের দিকে, যার নাম Icacos। Icacos দ্বীপ দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ১ মাইল। সেখানে কোনো মানুষ বাস করে না। বালির তীরভূমি অতিক্রম করে কেবল কিছু গাছপালা দেখা যাচ্ছিল। দ্বীপের চারিপাশে রয়েছে জলমগ্ন প্রবালের দেওয়াল, যেখানে এক আশ্চর্য রংবাহারি গালিচা পাতা আছে। ‘স্প্রেড ঈগল-২’ ধীরে ধীরে দ্বীপের বালিতে গিয়ে ঠেকলো আর চোখে চশমা আর মুখে শ্বাসবাহী নল লাগিয়ে সব ছাত্রছাত্রীরা ডুব দিল জলে।

আমি catamaran থেকে খালি পায়ে বালির তীরে নামলাম। যেদিকে দু-চোখ যায় কেবল সমুদ্র আর ঢেউ আর আকাশ। বালির ওপরে ছড়ানো রয়েছে নানারকম জলজ উদ্ভিদ, ঝিনুক, শঙ্খ, যা কুড়িয়ে নেবার জন্য কোনো মানুষ বাস করে না Icacos দ্বীপে। মাঝে মাঝে কয়েকটা গাছ জলের খুব কাছে ঝুঁকে পড়েছে আর তাদের শিকড় ধুয়ে যাচ্ছে আটলান্টিকের ঢেউ। বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই-এর ওপরে মস্ত বড়ো রংচঙে সব জীবন্ত শামুক। তাদের সুন্দর রঙের উপরে কে যেন তুলির টানে নানারকম নকশা এঁকে দিয়েছে। এদেরকে হাতের তালুতে তুলে আনতে বেশ চাপ দিতে হয়। প্রাণপণে পাথর আঁকড়ে নিঃসাড়ে পড়ে থাকতে পছন্দ করে শামুকগুলি। হাতের উপরে শামুকগুলি উল্টো করে ধরলেই তারা খোলসের ভেতর লুকিয়ে পড়ে। আমি তাদের আবার যথাস্থানে রেখে জলের ওপরে নুইয়ে থাকা একটা গাছের তলায় মস্ত পাথরের ওপরে বসলাম। পায়ের পাতা ধুয়ে দিচ্ছিল আটলান্টিকের জল। মেটে রঙের পেলিকান আমার থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ঢেউয়ের ওপরে ভাসছিল আর মাঝে মাঝে মস্ত ঠোঁট জলে চুবিয়ে কী যেন খোঁজাখুঁজি করছিল। যানবাহনহীন Icacos দ্বীপের পাথরের ওপরে শান্ত হয়ে একাকী বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল না যে এই পৃথিবীতে কেউ কারো সাথে ঝগড়া করে।

“এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ

আমি কি এ হাতে আর কোনোদিন

পাপ করতে পারি?”

___________

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia